সন্তানের হেফাজত ও অভিভাবকত্ব
হেফাজত মানে সন্তান প্রতিদিন কার সঙ্গে থাকবে সেই প্রশ্ন। অভিভাবকত্ব মানে সন্তানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ও তার বিষয়াদি দেখাশোনা করার আইনি ক্ষমতা। এই দুটি ভিন্ন বিষয়, ভিন্ন মানুষের কাছে থাকতে পারে, আর প্রতিটি ক্ষেত্রেই এখন আদালত কোনো বাঁধাধরা নিয়ম নয়, সন্তানের কল্যাণকেই নির্ধারক বিবেচনা করে।
এই সেবায় যা আছে
মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী ছোট সন্তানের শারীরিক হেফাজতের (হিজানত) প্রথম অধিকার মায়ের: ছেলের ক্ষেত্রে প্রায় সাত বছর বয়স পর্যন্ত, মেয়ের ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধি পর্যন্ত। বাবা স্বাভাবিক আইনি অভিভাবক। কিন্তু এগুলো শুরুর বিন্দু মাত্র, চূড়ান্ত ফলাফল নয়। পারিবারিক আদালত সন্তানের জন্য প্রকৃতপক্ষে কী ভালো তা দেখে হেফাজত ও দেখাসাক্ষাতের সিদ্ধান্ত নেয়, আর সন্তানের কল্যাণের প্রয়োজনে প্রথাগত বয়সসীমা থেকে সরে আসতেও পারে, এবং প্রায়ই আসে।
হেফাজত ও দেখাসাক্ষাৎ
বাবা-মা আলাদা হয়ে গেলে, সন্তান কার সঙ্গে থাকবে এবং অন্য বাবা বা মা কীভাবে দেখাসাক্ষাতের মাধ্যমে প্রকৃত সম্পর্ক বজায় রাখবেন, তা আমরা দেখি। সন্তান বাস্তবে মানিয়ে নিতে পারবে এমন ব্যবস্থার জন্য আমরা চেষ্টা করি, আর সমঝোতা সম্ভব না হলে আদালতে যাই।
আইনি অভিভাবকত্ব
বেশিরভাগ মানুষ যতটা ভাবেন, অভিভাবকত্ব তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নাবালকের ব্যাংক হিসাব চালাতে, সন্তানের নামে রেখে যাওয়া সম্পত্তি নিয়ে কাজ করতে, পাসপোর্টের আবেদন করতে বা সন্তানকে বিদেশে নিয়ে যেতে এটি লাগে। আমরা অভিভাবকত্ব ও ওয়ার্ডস আইন, ১৮৯০-এর অধীনে অভিভাবকত্বের সনদের জন্য আবেদন করি, মায়েদের আবেদনসহ, যা আদালত এখন ক্রমশ সন্তানের কল্যাণের ভিত্তিতে মঞ্জুর করছে।
যখন প্রথাগত নিয়ম উত্তর নয়
মায়ের পুনর্বিবাহ, বাবার অনুপস্থিতি, নিরাপত্তা বা লেখাপড়ার প্রশ্ন—এগুলোর প্রতিটিই বদলে দেয় কল্যাণের জন্য কী প্রয়োজন। আমরা কোনো স্লোগান নয়, সন্তানের প্রকৃত পরিস্থিতির ভিত্তিতে মামলা সাজাই, আর আদালতের দেখা প্রয়োজন এমন প্রমাণ হাজির করি।
যেসব কাগজপত্র লাগবে
- সন্তানের জন্মসনদ
- উভয় বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র
- বিয়ে ও থাকলে তালাকের কাগজপত্র
- সন্তানের লেখাপড়া, বাসস্থান ও দৈনন্দিন দেখাশোনার প্রমাণ
- অভিভাবকত্বের ক্ষেত্রে, সন্তানের নামে থাকা কোনো সম্পত্তি বা হিসাবের বিবরণ
কোথায় হয়, কত সময় লাগে
হেফাজত ও অভিভাবকত্বের সিদ্ধান্ত পারিবারিক আদালত নেয়, আর অভিভাবকত্বের আবেদন চলে অভিভাবকত্ব ও ওয়ার্ডস আইন, ১৮৯০-এর অধীনে। সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে জরুরি প্রশ্ন দ্রুত তোলা যায়। বিতর্কিত হেফাজত বা অভিভাবকত্বের মামলা সাধারণত কয়েক মাস সময় নেয়, আর তথ্য নিয়ে বেশি বিরোধ থাকলে আরও বেশি।
সন্তানের পরিস্থিতি বোঝা
সন্তান এখন কোথায় আছে, বর্তমানে কে তার দেখাশোনা করছে এবং বাস্তবে কার্যকর একটি ব্যবস্থা আসলে কেমন হবে, সেখান থেকেই আমরা শুরু করি।
সমঝোতার চেষ্টা
বাবা-মা একমত হলে সন্তানের জন্য ভালো হয়। আমরা প্রথমে হেফাজত ও দেখাসাক্ষাৎ নিয়ে আলোচনা করি এবং যেকোনো সমঝোতা এমন লিখিত রূপ দিই যা টিকে থাকে।
পারিবারিক আদালতে আবেদন
সমঝোতা ব্যর্থ হলে, আমরা হেফাজত, দেখাসাক্ষাৎ বা অভিভাবকত্বের সনদের জন্য আবেদন করি এবং প্রমাণসহ কল্যাণের যুক্তি আদালতে তুলে ধরি।
আদেশ ও বাস্তবায়ন
আমরা আদেশ জোগাড় করি এবং তা প্রদত্ত দেখাসাক্ষাৎ বা অভিভাবকত্বের ক্ষমতা কার্যকর করতে সাহায্য করি।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
মা-ই কি সবসময় সন্তানের হেফাজত পান?
না। ছোট সন্তানের হেফাজতের প্রথম অধিকার মায়ের, কিন্তু তা স্বয়ংক্রিয় বা স্থায়ী কিছু নয়। আদালত সন্তানের কল্যাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়, আর সন্তানের পরিস্থিতি যদি তা দাবি করে তাহলে বাবাও হেফাজত পান।
আমি বাবা-মা হয়েও কেন অভিভাবকত্বের সনদ লাগবে?
কারণ ব্যাংক, ভূমি অফিস ও পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষ নাবালকের বিষয় নিয়ে কাজ করতে আইনি অভিভাবকত্ব দাবি করে। শুধু বাবা-মা হওয়াই কাগজে-কলমে সবসময় যথেষ্ট নয়, আর একটি সনদ সেই সমস্যা মিটিয়ে দেয়।
আমি কি আমার সন্তানকে বিদেশে নিয়ে যেতে পারি?
সন্তানকে দেশের বাইরে নিতে সাধারণত অন্য বাবা বা মায়ের সম্মতি বা আদালতের অনুমতি লাগে, বিশেষ করে হেফাজত নিয়ে বিরোধ থাকলে। ভ্রমণের আগে পরামর্শ নিন, পরে নয়।
হেফাজত বা অভিভাবকত্ব নিয়ে একজন আইনজীবীর সাথে কথা বলুন
প্রথম পরামর্শ একটি আলোচনা মাত্র, কোনো প্রতিশ্রুতি নয়।
