Skip to content

দেনমোহর ও ভরণপোষণ আইন বাংলাদেশে: আপনার অধিকার ও দাবি করার উপায়

দেনমোহর হলো বিয়ের চুক্তিতে স্বামীর ওপর থাকা একটি ঋণ। ভরণপোষণ হলো খরচ বহনের চলমান দায়িত্ব। দুটি আলাদা অধিকার, মানুষ প্রায়ই গুলিয়ে ফেলেন, আর দুটো নিয়েই আত্মবিশ্বাসী ভুল পরামর্শ ঘুরে বেড়ায়। এই গাইডে আছে কী পাওনা, কখন পাওনা, আর কীভাবে আদায় করবেন।

মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১, ধারা ৯ ও ১০পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩তামাদি আইন ১৯০৮, অনুচ্ছেদ ১০৩ ও ১০৪
শেয়ার করুন
সোনার চুড়ি, মুদ্রা ও সিলমোহর করা দলিলের পাশে দাঁড়িপাল্লা — বাংলাদেশে দেনমোহর ও ভরণপোষণ
এক নজরে
  • দেনমোহর একটি ঋণ; তালাক বা মৃত্যুতেও তা শেষ হয় না
  • শুধু খুলায়, সমঝোতার ভিত্তিতে, দেনমোহর কমতে পারে
  • স্ত্রী: বিয়ে ও ইদ্দতকালে ভরণপোষণ পান, পরে নয়
  • বাবা: সন্তান যার কাছেই থাকুক, ভরণপোষণ দেন

এই গাইডে: দেনমোহর একটি ঋণ · স্ত্রীর ভরণপোষণ · সন্তানের ভরণপোষণ · দাবি যেভাবে করবেন · সময়সীমা

সংক্ষেপে উত্তর

দেনমোহর কাবিননামায় লেখা থাকে এবং তা স্ত্রীর পাওনা। বিয়ে ভেঙে গেলে, বহু বছর কেটে গেলে, কিংবা স্ত্রী নিজে তালাক চাইলেও তা বাতিল হয় না। ভরণপোষণ আলাদা দায়িত্ব: বিয়ে চলাকালে এবং তালাকের পর ইদ্দতকাল পর্যন্ত স্বামীকে স্ত্রীর খরচ দিতে হয়, আর সন্তান যার কাছেই থাকুক বাবাকে সন্তানের খরচ দিতে হয়। দুটো দাবিই পারিবারিক আদালতে করা হয়।

দেনমোহরের হিসাব করুন: বাকি দেনমোহর, ইদ্দতের ভরণপোষণ ও সন্তানের বকেয়া খরচ এবং মামলার শেষ তারিখ জানতে আমাদের দেনমোহর ও ভরণপোষণ হিসাব ব্যবহার করুন।

দেনমোহর একটি ঋণ

তাৎক্ষণিক ও বিলম্বিত

কাবিননামায় সাধারণত দেনমোহর দুই ভাগে লেখা থাকে। তাৎক্ষণিক বা মু’আজ্জল দেনমোহর বিয়ে চলাকালে যেকোনো সময় চাইলেই দিতে হয়। বিলম্বিত বা মুওয়াজ্জল দেনমোহর পাওনা হয় বিয়ে শেষ হলে, তালাক বা মৃত্যুতে। কাবিননামায় ভাগ লেখা না থাকলে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ১০ ধারা অনুযায়ী পুরো দেনমোহরই চাওয়ামাত্র পরিশোধযোগ্য।

কী পরিশোধিত বলে ধরা হয়

অনেক কাবিননামায় দেনমোহরের একটি অংশ “গহনায় পরিশোধিত” লেখা থাকে। কথাটি সত্য হলে ওই অংশ পরিশোধিত। সত্য না হলে স্ত্রী আপত্তি করতে পারেন, তবে তা মিথ্যা প্রমাণের দায় তাঁর ওপরই পড়ে। তাই সই করার আগে কাবিননামা পড়ুন।

স্বামীর মৃত্যুর পর

অপরিশোধিত দেনমোহর স্বামীর সম্পত্তির ওপর ঋণ, ওয়ারিশরা সম্পত্তি ভাগের আগে তা পরিশোধ করতে হয়। এর বাইরে বিধবা স্ত্রী তাঁর উত্তরাধিকারের অংশও পান।

সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, স্ত্রী তালাক চাইলে দেনমোহর হারান। হারান না। শুধু খুলায়, যেখানে দেনমোহর ছেড়ে দেওয়াই তালাকের বিনিময়, আর সেটাও যতটুকু স্পষ্টভাবে ছাড়েন ততটুকুই। তালাক-এ-তৌফিজ বা মুসলিম বিবাহবিচ্ছেদ আইন ১৯৩৯ অনুযায়ী আদালতের ডিক্রিতে তালাক হলে পুরো দেনমোহর পাওনা থাকে।

স্ত্রীর ভরণপোষণ

বিয়ে চলাকালে স্বামীকে তাঁর সামর্থ্য অনুযায়ী স্ত্রীর খাবার, পোশাক, বাসস্থান ও চিকিৎসার খরচ দিতে হয়। না দিলে স্ত্রী মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৯ ধারায় চেয়ারম্যানের কাছে ভরণপোষণের সনদের জন্য আবেদন করতে পারেন, অথবা পারিবারিক আদালতে মামলা করতে পারেন। যে সময় খরচ দেওয়া হয়নি, সেই বকেয়া ভরণপোষণও দাবি করা যায়, তাই না পাওয়া মাসগুলো হারিয়ে গেছে ধরে নেবেন না।

তালাকের পর স্বামীকে ইদ্দতকাল পর্যন্ত স্ত্রীর ভরণপোষণ দিতে হয়, যা সাধারণত তিন মাস, আর গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত। হেফজুর রহমান বনাম শামসুন নাহার বেগম মামলায় (৫১ ডিএলআর (এডি) ১৭২) আপিল বিভাগ বলেছে, ইদ্দতের পরে ভরণপোষণের দাবি চলে না। কেউ যদি সাবেক স্বামীর কাছ থেকে আজীবন ভরণপোষণের আশ্বাস দেন, তিনি ভুল বলছেন।

সন্তানের ভরণপোষণ

সন্তান যার কাছেই থাকুক, বাবাকে তার খাবার, পোশাক, বাসস্থান, পড়াশোনা ও চিকিৎসার খরচ দিতে হবে। ছেলের ক্ষেত্রে নিজে উপার্জনক্ষম হওয়া পর্যন্ত, মেয়ের ক্ষেত্রে বিয়ে পর্যন্ত এই দায়িত্ব চলে। হেফাজত আর ভরণপোষণ আলাদাভাবে ঠিক হয়। হেফাজতের মামলায় হেরে গেলে বাবা আইনত খরচ বন্ধ করতে পারেন না, আবার খরচ দেরিতে এলে মা আইনত দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধ করতে পারেন না। দুটোই আদালতের বিষয়।

দাবি যেভাবে করবেন

  • আগে লিখিত দাবি। রেজিস্টার্ড ডাকে বা আইনজীবীর মাধ্যমে দেনমোহর বা ভরণপোষণ চেয়ে লিখিত নোটিশ দিন। এতে একটি তারিখ ঠিক হয়, আর অনেক সময় এতেই কাজ হয়।
  • মধ্যস্থতা। যেসব জেলায় মামলার আগে বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা চালু, সেখানে দাবি আগে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে যায়।
  • পারিবারিক আদালত। দেনমোহর ও ভরণপোষণের মামলা পারিবারিক আদালতে করা হয়, সাধারণত স্ত্রী যেখানে থাকেন। আদালত বিচারের আগে ও পরে আপসের চেষ্টা করে, অনেক দাবি সেখানেই মেটে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মামলায় সাধারণত কয়েক মাস থেকে প্রায় এক বছর লাগে।
  • ডিক্রি কার্যকর। স্বামীর সম্পত্তি ও বেতন থেকে ডিক্রির টাকা আদায় করা যায়, আদালত কিস্তিতে পরিশোধের অনুমতিও দিতে পারে। ভরণপোষণের ডিক্রি না মানলে আটকাদেশ হতে পারে।

সময়সীমা

তামাদি আইন ১৯০৮ অনুযায়ী তাৎক্ষণিক দেনমোহরের দাবি করতে হয় তা চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার তারিখ থেকে তিন বছরের মধ্যে। বিলম্বিত দেনমোহরের দাবি করতে হয় মৃত্যু বা তালাকে বিয়ে শেষ হওয়ার তিন বছরের মধ্যে। অনেক নারী ধরে নেন সময় পার হয়ে গেছে, অথচ হয়নি, কারণ বিলম্বিত দেনমোহরের সময় গোনা শুরু হয় বিয়ে শেষ হওয়ার পর। আবার অনেকে তালাকের পর বেশি দেরি করে ফেলেন। তালাকের দুই বছরের বেশি পার হয়ে থাকলে এখনই পরামর্শ নিন।

এটি সাধারণ তথ্য, আপনার মামলার পরামর্শ নয়। এখানে আইন ও প্রচলিত প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আপনার কাগজপত্র, ঘটনা ও সংশ্লিষ্ট জেলার চর্চাই ঠিক করবে আপনার ক্ষেত্রে কী প্রযোজ্য।
দাবি কীভাবে এগোয়
১

কাবিননামা পড়ুন

তাৎক্ষণিক ও বিলম্বিত দেনমোহর আলাদা করুন, কতটা পরিশোধিত লেখা আছে দেখুন, আজ কত পাওনা হিসাব করুন।

২

লিখিত দাবি

তারিখসহ লিখিত দাবি পরিস্থিতি পরিষ্কার করে, অনেক দাবি মামলা ছাড়াই মেটে।

৩

মধ্যস্থতা বা মামলা

প্রয়োজনে লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতা, তারপর স্ত্রীর এলাকার পারিবারিক আদালতে মামলা।

৪

ডিক্রি কার্যকর

বেতন বা সম্পত্তি থেকে আদায়, আদালত অনুমতি দিলে কিস্তিতে।

তালাক বা মৃত্যুর দিন বিলম্বিত দেনমোহর পাওনা হয়। সেদিন থেকে আপনার হাতে তিন বছর।পরামর্শের সময় নিন

সাধারণ জিজ্ঞাসা

আমি তালাক চাইলে কি দেনমোহর হারাব?

না। শুধু খুলায়, যেখানে দেনমোহর ছেড়ে দেওয়াই বিনিময়, তা কমে, আর সেটাও যতটুকু স্পষ্টভাবে ছাড়েন ততটুকু। তালাক-এ-তৌফিজ বা আদালতের মাধ্যমে তালাকে পুরো দেনমোহর পাওনা থাকে।

ইদ্দতের পরে কি ভরণপোষণ দাবি করা যায়?

নিজের জন্য না। আপিল বিভাগ বলেছে, তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর ভরণপোষণ ইদ্দতের সঙ্গে শেষ হয়। সন্তানের ভরণপোষণ চলতে থাকে।

অপরিশোধিত দেনমোহর কীভাবে আদায় করব?

লিখিত দাবি পাঠান। না দিলে পারিবারিক আদালতে মামলা করুন। ডিক্রির টাকা স্বামীর সম্পত্তি ও বেতন থেকে আদায় করা যায়।

তালাকের পর কি দেনমোহর দাবি করা যায়?

হ্যাঁ। তালাক হলে বিলম্বিত দেনমোহর পাওনা হয়, আর অপরিশোধিত তাৎক্ষণিক দেনমোহরও পাওনা থাকে। তালাক এই ঋণ বাতিল করে না।

তাৎক্ষণিক ও বিলম্বিত দেনমোহরের পার্থক্য কী?

তাৎক্ষণিক দেনমোহর বিয়ে চলাকালে চাইলেই দিতে হয়। বিলম্বিত দেনমোহর বিয়ে শেষ হলে দিতে হয়। কাবিননামায় ভাগ লেখা না থাকলে পুরোটাই চাওয়ামাত্র পরিশোধযোগ্য।

স্ত্রী বা সন্তান কত টাকা ভরণপোষণ পাবেন?

নির্দিষ্ট অঙ্ক নেই। আদালত স্বামীর আয় আর স্ত্রী ও সন্তানের যুক্তিসংগত প্রয়োজন, যেমন স্কুল ও চিকিৎসার খরচ, দেখে ঠিক করে।

দেনমোহর দাবির কি কোনো সময়সীমা আছে?

হ্যাঁ। তাৎক্ষণিক দেনমোহরের জন্য চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার তিন বছর, আর বিলম্বিত দেনমোহরের জন্য বিয়ে শেষ হওয়ার তিন বছর।

স্বামী মারা গেছেন। দেনমোহর কি পাব?

হ্যাঁ। অপরিশোধিত দেনমোহর তাঁর সম্পত্তির ওপর ঋণ, ওয়ারিশরা ভাগের আগে তা পরিশোধ করতে হয়। এর বাইরে আপনি উত্তরাধিকারের অংশও পাবেন।

তিনি বলছেন সময় হলে দেবেন। অপেক্ষা করব?

টাকার অঙ্কসহ তারিখ দেওয়া লিখিত স্বীকারোক্তি নিন। মুখের প্রতিশ্রুতিতে সময় নষ্ট হয়, আর সময়সীমার হিসাবে সময় গুরুত্বপূর্ণ।

দেনমোহর কি?

দেনমোহর হলো বিয়ের শর্ত হিসেবে স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীর প্রাপ্য অর্থ বা সম্পদ। এটি স্ত্রীর নিজস্ব সম্পত্তি, কাবিননামায় লেখা থাকে এবং তিনি পারিবারিক আদালতে তা দাবি করতে পারেন।

দেনমোহর সর্বনিম্ন কত টাকা?

বাংলাদেশের আইনে দেনমোহরের সর্বনিম্ন বা সর্বোচ্চ কোনো সীমা নেই। দুই পক্ষ যে অঙ্কে রাজি হয়ে কাবিননামায় লেখেন, সেটিই দেনমোহর। কোনো কোনো আলেম ধর্মীয়ভাবে ১০ দিরহামকে সর্বনিম্ন বলেন, তবে আদালত কাবিননামায় লেখা অঙ্কই কার্যকর করেন।

দেনমোহর আর কাবিন কি এক?

না। কাবিননামা হলো বিয়ের নিবন্ধনের দলিল; দেনমোহর তার একটি অংশ। অনেকে মুখে “কাবিন” বলতে কাবিননামায় লেখা দেনমোহরকেই বোঝান।

কিস্তিতে দেনমোহর পরিশোধ করা যায় কি?

স্ত্রী রাজি থাকলে যায়, আর বিলম্বিত মোহর অনেক সময় কিস্তিতেই দেওয়া হয়। প্রতিটি কিস্তির জন্য স্ত্রীর সই করা রসিদ রাখুন; প্রমাণ না থাকলে আদালত অঙ্কটিকে অনাদায়ী ধরবেন।

খোরপোষ কি এবং এর নির্দিষ্ট অঙ্ক আছে কি?

খোরপোষ মানে ভরণপোষণ: খাবার, কাপড়, বাসস্থান ও অন্যান্য প্রয়োজন। বিয়ে চলাকালে ও ইদ্দতকালে স্বামী স্ত্রীকে এবং বাবা সন্তানকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য। নির্দিষ্ট অঙ্ক নেই; আয় ও প্রয়োজন দেখে পারিবারিক আদালত ঠিক করেন।

আইন লাইব্রেরি

এই গাইডের পেছনের আইন ও ফরম

বিডি অ্যাডভোকেসিতে সংরক্ষিত প্রামাণিক পাঠ। ধারা নম্বরগুলো এই গাইডে ব্যবহৃত।

পরিবার ও বিয়ে বিষয়ে আরও পড়ুন

তালাক, বিয়ে, সন্তানের হেফাজত, দেনমোহর ও ভরণপোষণ।

এই বিষয়ের সব লেখা →
শেয়ার করুন

মন্তব্য

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।

মন্তব্য লিখুন

সব মন্তব্য প্রকাশের আগে চেম্বার থেকে যাচাই করা হয়। মামলার গোপন তথ্য, ফোন নম্বর বা লিংক দেবেন না। এখানে দেওয়া উত্তর সাধারণ তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়; নির্দিষ্ট বিষয়ে পরামর্শের জন্য চেম্বারে যোগাযোগ করুন।

কাবিননামা নিয়ে আসুন, আমরা জানিয়ে দেব আপনার অবস্থান কী

লিখিত প্রাথমিক মূল্যায়ন বিনামূল্যে, কোনো বাধ্যবাধকতাও নেই।