সাকসেশন সার্টিফিকেট: খরচ, প্রক্রিয়া ও প্রোবেটের সঙ্গে পার্থক্য
সাকসেশন সার্টিফিকেট, ওয়ারিশ সনদ আর প্রোবেট তিনটি আলাদা জিনিস, অথচ মানুষ প্রায়ই ভুলটার জন্য আবেদন করেন। সাকসেশন সার্টিফিকেট দিয়ে ওয়ারিশরা মৃত ব্যক্তির ব্যাংক ও কোম্পানিতে থাকা টাকা তোলেন। এটি জমি হস্তান্তর করে না। এই পার্থক্যটা ঠিক বুঝলে কয়েক মাস বাঁচে।
- ঋণ ও সিকিউরিটিজের জন্য: ব্যাংকের টাকা, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার
- জমি হস্তান্তর করে না
- কোর্ট ফি: ২০,০০০ টাকার ওপর ১%, ১ লাখের ওপর ২%
- আপত্তি না থাকলে সাধারণত কয়েক মাস লাগে
এই গাইডে: তিনটি কাগজ, তিন কাজ · নমিনি থাকলে · আবেদনের নিয়ম · কাগজপত্র · খরচ ও সময় · কোনো ওয়ারিশকে বাদ দিলে
সংক্ষেপে উত্তর
সাকসেশন সার্টিফিকেট দেন জেলা জজ আদালত, উত্তরাধিকার আইন ১৯২৫-এর দশম খণ্ড অনুযায়ী। এটি নির্দিষ্ট ওয়ারিশকে মৃত ব্যক্তির নির্দিষ্ট পাওনা ও সিকিউরিটিজ তোলার ক্ষমতা দেয়: ব্যাংক ব্যালান্স, স্থায়ী আমানত, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার, বন্ড, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও বিমার টাকা। ব্যাংক ও কোম্পানি এটি চায় কারণ এতে টাকা দেওয়ার সময় তারা সুরক্ষিত থাকে। জমির সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই; জমি উত্তরাধিকারসূত্রে ওয়ারিশদের কাছে যায় এবং নামজারির মাধ্যমে রেকর্ড হয়।
তিনটি কাগজ, তিন কাজ
- ওয়ারিশ সনদ। দেন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর। এতে ওয়ারিশদের তালিকা থাকে। জমির নামজারি ও অনেক দাপ্তরিক কাজে লাগে।
- সাকসেশন সার্টিফিকেট। দেন আদালত। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট পাওনা ও সিকিউরিটিজ তোলা যায়।
- প্রোবেট বা লেটার্স অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। উইল থাকলে প্রোবেট, আর সম্পত্তি পরিচালনার প্রয়োজন হলে লেটার্স অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, দুটোই আদালত দেন। মুসলিমদের সাধারণত প্রোবেট লাগে না, কারণ তাঁদের সম্পত্তি ফারায়েজ অনুযায়ী ভাগ হয় আর উইল এক-তৃতীয়াংশে সীমিত।
নমিনি থাকলে
অ্যাকাউন্ট, সঞ্চয়পত্র বা বিমা পলিসিতে নমিনি থাকলে প্রতিষ্ঠান সাধারণত সাকসেশন সার্টিফিকেট ছাড়াই নমিনিকে টাকা দেয়; ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১-এর ১০৩ ধারা তা অনুমোদন করে। কিন্তু নমিনি মালিক হয়ে যান না। হাইকোর্ট বিভাগ বলেছে, নমিনি টাকা গ্রহণ করেন ট্রাস্টি হিসেবে, আর তা আইনগত ওয়ারিশদের মধ্যে তাঁদের অংশ অনুযায়ী ভাগ করে দিতে হবে। নমিনি সব টাকা নিজে রেখে দিলে অন্য ওয়ারিশরা নিজেদের অংশ আদায়ে মামলা করতে পারেন।
আবেদনের নিয়ম
- মৃত ব্যক্তি যেখানে সাধারণত বসবাস করতেন, সেখানকার জেলা জজ আদালতে আবেদন করুন; দেশে স্থায়ী বাসস্থান না থাকলে সম্পদ যেখানে আছে সেখানে।
- মৃত্যুর তারিখ ও স্থান, প্রত্যেক ওয়ারিশের সম্পর্ক ও ঠিকানা, আর প্রতিটি পাওনা বা সিকিউরিটির অ্যাকাউন্ট বা সনদ নম্বর ও পরিমাণ লিখুন।
- আদালত ওয়ারিশদের নোটিশ দেন এবং তা প্রকাশ করেন, যাতে কারও দাবি থাকলে আপত্তি জানাতে পারেন।
- আপত্তি না থাকলে কোর্ট ফি জমা দেওয়ার পর সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। আপত্তি এলে মামলাটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে যায়।
কাগজপত্র
- মৃত্যুসনদ।
- ওয়ারিশ সনদ এবং সব ওয়ারিশের এনআইডি বা জন্মসনদ।
- প্রতিটি সম্পদ ও তার মূল্য দেখানো স্টেটমেন্ট, সনদ বা চিঠি।
- একজন আবেদন করলে বাকি ওয়ারিশদের সম্মতি বা অনাপত্তিপত্র।
ছাপার উপযোগী তালিকা পাবেন আমাদের সাকসেশন সার্টিফিকেটের কাগজপত্র চেকলিস্টে।
খরচ ও সময়
কোর্ট ফি ধরা হয় সার্টিফিকেটে অন্তর্ভুক্ত পাওনা ও সিকিউরিটিজের মূল্যের ওপর: ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত কিছু নয়, ২০,০০০ থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ১ শতাংশ, আর ১ লাখ টাকার ওপরে ২ শতাংশ, কোনো সর্বোচ্চ সীমা নেই। তাই যে সম্পদ আসলে তুলতে হবে, শুধু সেগুলোই অন্তর্ভুক্ত করুন। আপত্তি না থাকলে দাখিল থেকে সাধারণত তিন থেকে ছয় মাস লাগে, আদালতভেদে কম-বেশি হয়। আপত্তি থাকলে অনেক বেশি সময় লাগে।
কোনো ওয়ারিশকে বাদ দিলে
প্রত্যেক ওয়ারিশের নাম দিতে হবে এবং তাঁকে নোটিশ দিতে হবে। কোনো ওয়ারিশকে গোপন করে নেওয়া সার্টিফিকেট বাতিল হতে পারে, আর যিনি টাকা তুলেছেন তাঁকে তার হিসাব দিতে হবে। পরিবারকে মামলার পক্ষ বানানোর এটিই সবচেয়ে দ্রুত পথ।
প্রতিষ্ঠানকে জিজ্ঞেস করুন
ব্যাংক বা কোম্পানি কোন কাগজ চায় লিখিতভাবে জানুন, আর প্রতিটি সম্পদের সঠিক তালিকা করুন।
প্রস্তুত করে দাখিল
সব ওয়ারিশ, সম্পদ ও সহায়ক কাগজসহ জেলা জজ আদালতে আবেদন।
নোটিশ ও শুনানি
আদালত নোটিশ জারি ও প্রকাশ করেন; আপত্তি থাকলে শুনানি হয়।
সার্টিফিকেট ও টাকা তোলা
কোর্ট ফি দিয়ে সার্টিফিকেট নিন, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে জমা দিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সাকসেশন সার্টিফিকেট দিয়ে কি বাবার জমি নিজের নামে হবে?
না। এটি শুধু পাওনা ও সিকিউরিটিজের জন্য। জমি উত্তরাধিকারসূত্রে আসে এবং ওয়ারিশ সনদ দিয়ে নামজারির মাধ্যমে রেকর্ড হয়।
ওয়ারিশ সনদ আর সাকসেশন সার্টিফিকেটের পার্থক্য কী?
ওয়ারিশ সনদ স্থানীয় সরকার দেয়, এতে ওয়ারিশদের তালিকা থাকে। সাকসেশন সার্টিফিকেট আদালত দেন, এটি দিয়ে নির্দিষ্ট ব্যাংকের টাকা, সঞ্চয়পত্র ও শেয়ার তোলা যায়।
মৃত ব্যক্তির ব্যাংকের টাকা তুলতে কি সাকসেশন সার্টিফিকেট লাগে?
সাধারণত লাগে, যদি নমিনি না থাকে। নমিনি থাকলে ব্যাংক নমিনিকে টাকা দেয়, আর নমিনিকে তা ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ করে দিতে হয়।
নমিনি কি টাকার মালিক?
না। হাইকোর্ট বিভাগ বলেছে, নমিনি আইনগত ওয়ারিশদের পক্ষে ট্রাস্টি হিসেবে টাকা রাখেন।
সাকসেশন সার্টিফিকেটে কত খরচ?
কোর্ট ফি ২০,০০০ থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত মূল্যের ১ শতাংশ, আর ১ লাখের ওপরে ২ শতাংশ, কোনো সর্বোচ্চ সীমা নেই। এর সঙ্গে আইনজীবীর ফি।
কত দিন লাগে?
আপত্তি না থাকলে সাধারণত তিন থেকে ছয় মাস। আপত্তি থাকলে অনেক বেশি।
কোন আদালত সাকসেশন সার্টিফিকেট দেন?
মৃত ব্যক্তি যেখানে সাধারণত থাকতেন, বা সম্পদ যেখানে আছে, সেখানকার জেলা জজ আদালত।
একজন ওয়ারিশ কি সবার পক্ষে আবেদন করতে পারেন?
হ্যাঁ, অন্যদের সম্মতিতে, তবে সব ওয়ারিশের নাম দিতে ও নোটিশ দিতে হবে। সার্টিফিকেটধারীকে অন্যদের কাছে হিসাব দিতে হবে।
সাকসেশন সার্টিফিকেট কি বাতিল হতে পারে?
হ্যাঁ, যেমন কোনো ওয়ারিশকে গোপন করে বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে নেওয়া হলে।
ওয়ারিশ সনদ করতে কি কি লাগে?
ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কার্যালয়ে আবেদন, মৃত্যু সনদ, সব ওয়ারিশের জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন সনদ এবং সাধারণত স্থানীয় জনপ্রতিনিধির যাচাই। কার্যালয়ভেদে চাহিদা কিছুটা ভিন্ন হয়।
ওয়ারিশ সনদ কি অনলাইনে আবেদন করা যায়?
অনেক ইউনিয়ন পরিষদ ও সিটি করপোরেশন এখন ডিজিটাল সেন্টার বা অনলাইন পোর্টালে আবেদন নেয়, তবে সনদ সাধারণত কার্যালয় থেকে সংগ্রহ বা যাচাই করতে হয়। আবেদনের আগে স্থানীয় কার্যালয়ের নিয়ম জেনে নিন।
ওয়ারিশ সনদ আসল কি না কিভাবে যাচাই করব?
যে কার্যালয় সনদ দিয়েছে, তাদের রেজিস্টারের সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত হতে বলুন, অথবা সনদে কিউআর কোড থাকলে তা স্ক্যান করুন। ব্যাংক ও ভূমি অফিস প্রায়ই সরাসরি ইস্যুকারী কার্যালয়ে যাচাই করে।
এই গাইডের পেছনের আইন ও ফরম
বিডি অ্যাডভোকেসিতে সংরক্ষিত প্রামাণিক পাঠ। ধারা নম্বরগুলো এই গাইডে ব্যবহৃত।
উত্তরাধিকার ও ওয়ারিশ বিষয়ে আরও পড়ুন
কে কত অংশ পাবেন, সাকসেশন সার্টিফিকেট ও ওয়ারিশি জমি বণ্টন।
ওয়ারিশি সম্পত্তির আইন: স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ের অংশ কে কত পাবেন
ওয়ারিশি জমি বণ্টন: বণ্টননামা দলিল ও বাটোয়ারা মামলার নিয়ম
সাকসেশন সার্টিফিকেটের কাগজপত্র: সম্পূর্ণ চেকলিস্ট
ওয়ারিশ সনদ: অনলাইন আবেদন, কি কি লাগে ও যাচাই (২০২৬)
হেবা দলিল: নিয়ম, খরচ, কাগজপত্র ও বাতিল (২০২৬)
মায়ের সম্পত্তি ভাগের নিয়ম: ছেলে, মেয়ে ও স্বামী কে কত পাবেন (২০২৬)
ফারায়েজ ক্যালকুলেটর: মুসলিম উত্তরাধিকারের অংশ হিসাব
কোন অনুমতিপত্র লাগবে বুঝতে পারছেন না?
প্রতিষ্ঠানের চিঠিটি নিয়ে আসুন, একটি আলোচনাতেই আমরা বলে দেব। লিখিত প্রাথমিক মূল্যায়ন বিনামূল্যে।

মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।