নামজারি (ই-নামজারি) প্রক্রিয়া, ফি ও অনলাইনে স্ট্যাটাস চেক করার নিয়ম
দলিল রেজিস্ট্রি আর নামজারি দুটি আলাদা ধাপ। ক্রেতা ও ওয়ারিশরা প্রায়ই প্রথমটা করে দ্বিতীয়টা ভুলে যান, তারপর কয়েক বছর পর দেখেন ভূমি অফিসে এখনো অন্য কেউ মালিক, আর নিজের নামে বিক্রি, বন্ধক বা খাজনা দেওয়া যাচ্ছে না।
- রেজিস্ট্রি বিক্রির রেকর্ড রাখে; নামজারি ভূমি রেকর্ড হালনাগাদ করে
- ই-নামজারিতে অনলাইনে আবেদন করুন
- সরকারি ফি মোট ১,১৭০ টাকা
- কাগজ ঠিক থাকলে লক্ষ্য প্রায় ২৮ কর্মদিবস
এই গাইডে: রেজিস্ট্রি আর নামজারি আলাদা · ই-নামজারি যেভাবে কাজ করে · নামজারি করতে কি কি কাগজ লাগে? · ওয়ারিশি জমির নামজারি · অবস্থা দেখা ও ডিসিআর ডাউনলোড · আবেদন নামঞ্জুর হলে, বা অন্য কারও নামে ভুল নামজারি হলে
সংক্ষেপে উত্তর
কেনা, দান, উত্তরাধিকার বা আদালতের ডিক্রির পর খতিয়ানে আপনার নাম তোলাই নামজারি বা খারিজ। এটি করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি), অনলাইন ই-নামজারি ব্যবস্থায়। সরকারি ফি ১,১৭০ টাকা, আর কাগজ ঠিক থাকলে প্রায় ২৮ কর্মদিবসে নিষ্পত্তির লক্ষ্য। আপনি নতুন খতিয়ান ও ডিসিআর পান, আর তখন থেকে নিজের নামে ভূমি উন্নয়ন কর দেন।
রেজিস্ট্রি আর নামজারি আলাদা
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রি হস্তান্তরের রেকর্ড রাখে। এসি ল্যান্ড অফিসে নামজারি ঠিক করে ভূমি রেকর্ডে মালিক কে। দুটোই লাগবে। নামজারি মালিকানা তৈরি করে না: দলিলে ত্রুটি থাকলে আপনার নামে নামজারি তা বাঁচাবে না। কিন্তু নামজারি ছাড়া আপনি বিক্রি করতে পারবেন না (সাব-রেজিস্ট্রার সর্বশেষ রেকর্ডে আপনার নাম খুঁজবেন), ব্যাংক জমি বন্ধক রাখবে না, আর রেকর্ডে থাকা বিক্রেতা বা শরিক ঝামেলা করতে পারেন।
ই-নামজারি যেভাবে কাজ করে
- ই-নামজারি পোর্টালে, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে বা এসি ল্যান্ড অফিসে আবেদন করে কাগজ আপলোড করুন।
- অনলাইনে ২০ টাকা আবেদন কোর্ট ফি ও ৫০ টাকা নোটিশ ফি দিন।
- ইউনিয়ন ভূমি অফিস সরেজমিন দেখে প্রতিবেদন দেয়। এসি ল্যান্ড শুনানির তারিখ ঠিক করে নোটিশ দেন।
- মূল কাগজ নিয়ে শুনানিতে যান। কেউ আপত্তি করলে তা শোনা হয়।
- মঞ্জুর হলে রেকর্ড সংশোধন ফি ১,০০০ টাকা ও ডিসিআর ফি ১০০ টাকা দিন। নতুন খতিয়ান ও ডিসিআর অনলাইনে পাওয়া যায়।
নামজারি করতে কি কি কাগজ লাগে?
- আপনার নামে রেজিস্ট্রিকৃত দলিল (কেনা বা দানের ক্ষেত্রে), অথবা আদালতের ডিক্রি।
- উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে: মৃত্যুসনদ, ওয়ারিশ সনদ ও সব ওয়ারিশের নাম।
- বর্তমান খতিয়ান বা পর্চা, আর পাওয়া গেলে বিক্রেতা বা মৃত ব্যক্তির নামজারির রেকর্ড।
- সর্বশেষ ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিশোধের রসিদ।
- আপনার এনআইডি ও ছবি।
- বিক্রেতার নাম খতিয়ানে না থাকলে, বিক্রেতাকে রেকর্ডের সঙ্গে যুক্ত করে এমন দলিল।
- ই-নামজারির ওটিপি ও অবস্থা জানার বার্তার জন্য একটি মোবাইল নম্বর।
ওয়ারিশি জমির নামজারি
ওয়ারিশরা একসঙ্গে সবার নামে যার যার অংশসহ নামজারি করতে পারেন, অথবা একজন শুধু নিজের অংশ নামজারি করতে পারেন। একজন ওয়ারিশ অন্যদের বাদ দিয়ে পুরো জমি নিজের নামে নামজারি করতে পারেন না। এমন হয়ে থাকলে বাকিরা তা সংশোধনের আবেদন করতে পারেন।
অবস্থা দেখা ও ডিসিআর ডাউনলোড
আবেদন নম্বর ও মোবাইল নম্বর দিয়ে ই-নামজারি পোর্টালে অবস্থা দেখুন। মঞ্জুর হলে খতিয়ান ও ডিসিআর ডাউনলোড করা যায় এবং রেকর্ড অনলাইনে যাচাই করা যায়। নতুন হোল্ডিং খোলা হলেই অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর দিন।
আবেদন নামঞ্জুর হলে, বা অন্য কারও নামে ভুল নামজারি হলে
নামঞ্জুরের আদেশে কারণ লেখা থাকে। প্রায়ই তা সংশোধনযোগ্য: কাগজ বাদ পড়া, নামের অমিল, ধারাবাহিকতায় ফাঁক। ঠিক করে আবার আবেদন করুন। সিদ্ধান্ত ভুল মনে হলে এসি ল্যান্ডের কাছে পুনর্বিবেচনা চাইতে পারেন, যা সাধারণত সরেজমিন তদন্তসহ মিস কেস হিসেবে চলে, আর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)-এর কাছে আপিল করতে পারেন, তারপর বিভাগীয় কমিশনার ও ভূমি আপিল বোর্ড পর্যন্ত যাওয়া যায়। সময়সীমা কম, তাই কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পদক্ষেপ নিন। আসল বিরোধ মালিকানা নিয়ে হলে রাজস্ব কর্তৃপক্ষ তা মেটাতে পারে না; তার জন্য দেওয়ানি মামলা লাগে।
অনলাইনে আবেদন
দলিল বা ওয়ারিশ সনদ, খতিয়ান, খাজনার রসিদ ও এনআইডি দিয়ে ই-নামজারিতে আবেদন; ৭০ টাকা ফি।
শুনানিতে যান
মূল কাগজ নিয়ে এসি ল্যান্ডের শুনানিতে যান, আপত্তি থাকলে সেখানেই জবাব দিন।
ফি দিয়ে গ্রহণ
মঞ্জুর হলে ১,১০০ টাকা দিন; নতুন খতিয়ান ও ডিসিআর ডাউনলোড করুন।
খাজনা হালনাগাদ
প্রতি বছর নিজের নামে অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর দিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
দলিল রেজিস্ট্রি করেছি। নামজারি কি তবুও লাগবে?
হ্যাঁ। রেজিস্ট্রি আর নামজারি আলাদা। নামজারি ছাড়া নিজের নামে বিক্রি, বন্ধক বা খাজনা দেওয়া কঠিন।
নামজারিতে কত টাকা লাগে?
সরকারি ফি মোট ১,১৭০ টাকা: ২০ টাকা কোর্ট ফি, ৫০ টাকা নোটিশ ফি, ১,০০০ টাকা রেকর্ড সংশোধন ফি আর ১০০ টাকা ডিসিআর ফি। আইনজীবী বা এজেন্টের ফি আলাদা।
ই-নামজারিতে কত দিন লাগে?
কাগজ ঠিক থাকলে লক্ষ্য প্রায় ২৮ কর্মদিবস। আপত্তি, কাগজের ঘাটতি বা অফিসের চাপে বেশি লাগে।
নামজারির অবস্থা অনলাইনে কীভাবে দেখব?
ই-নামজারি পোর্টালে আবেদন নম্বর ও মোবাইল নম্বর দিয়ে। মঞ্জুরের পর খতিয়ান ও ডিসিআর ডাউনলোড করা যায়।
ডিসিআর কী?
নামজারির পর দেওয়া ডুপ্লিকেট কার্বন রসিদ। নতুন খতিয়ানের সঙ্গে এটি দেখায় যে রেকর্ড আপনার নামে।
একজন ওয়ারিশ কি ওয়ারিশি জমির নামজারি করতে পারেন?
নিজের অংশের নামজারি করতে পারেন, অথবা সব ওয়ারিশ একসঙ্গে করতে পারেন। একজন পুরো জমি নিজের নামে নিতে পারেন না।
নামজারি নামঞ্জুর হয়েছে। এখন কী করব?
কারণ পড়ুন। ত্রুটি ঠিক করে আবার আবেদন করুন, এসি ল্যান্ডের কাছে পুনর্বিবেচনা চান, অথবা নির্ধারিত অল্প সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)-এর কাছে আপিল করুন।
নামজারি কি মালিকানার প্রমাণ?
না। এটি রেকর্ড ও দখলের শক্ত প্রমাণ, কিন্তু মালিকানা আসে দলিল বা উত্তরাধিকার থেকে। ত্রুটিপূর্ণ দলিলে হওয়া নামজারি আদালত বাতিল করতে পারে।
খারিজ বাতিলের নিয়ম কী?
জাল বা ভুল দলিলে হওয়া খারিজ এসি ল্যান্ডের কাছে মিস কেস বা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (রাজস্ব) কাছে আপিলের মাধ্যমে বাতিল চাওয়া যায়। মালিকানা নিয়েই বিরোধ থাকলে দেওয়ানি আদালত সিদ্ধান্ত দেয়।
এই গাইডের পেছনের আইন ও ফরম
বিডি অ্যাডভোকেসিতে সংরক্ষিত প্রামাণিক পাঠ। ধারা নম্বরগুলো এই গাইডে ব্যবহৃত।
জমি ও সম্পত্তি বিষয়ে আরও পড়ুন
নিরাপদে জমি কেনা, নামজারি ও বেদখল জমি উদ্ধার।
জমি নিজের নামে রেকর্ড করান
প্রথমে রেজিস্ট্রি, তারপর নামজারি – দুটোই আমরা করে দিই। লিখিত প্রাথমিক মূল্যায়ন বিনামূল্যে।

মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।