কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি: আপনার অধিকার, অভিযোগ কমিটি ও পরবর্তী পথ
২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশের প্রতিটি কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও অভিযোগ কমিটি চালাতে হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনায় বাধ্য। ২০২৬ সালে সরকার এই দায়গুলো আইনে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। এই গাইডে ধাপে ধাপে করণীয় বলা হয়েছে।
- শারীরিক, মৌখিক, অমৌখিক ও অনলাইন আচরণ অন্তর্ভুক্ত
- প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে অভিযোগ কমিটি থাকতে হবে, অধিকাংশ নারী
- ২০২৬ সালের অধ্যাদেশ: ৯০ দিনে তদন্ত শেষ
- শ্রম আইনের ২০২৬ সংশোধনী যৌন হয়রানির সংজ্ঞা দিয়েছে (আইএলও সি১৯০)
- গুরুতর আচরণে একসাথে ফৌজদারি মামলা সম্ভব
এই গাইডে: কী হয়রানি হিসেবে গণ্য · অভিযোগ যেভাবে করবেন · ফৌজদারি ও অনলাইন পথ · অভিযোগের জন্য শাস্তি পেলে · নিয়োগকর্তাদের জন্য
সংক্ষেপে উত্তর
কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির মধ্যে আছে অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক স্পর্শ, যৌন মন্তব্য বা দাবি, যৌন উপকরণ দেখানো, যৌন সুবিধার সাথে যুক্ত হুমকি বা প্রতিশ্রুতি, এবং ফোন, মেসেজ বা সামাজিক মাধ্যমে একই আচরণ। বিএনডব্লিউএলএ বনাম বাংলাদেশ মামলায় হাইকোর্ট বিভাগের ২০০৯ সালের নির্দেশনায় প্রতিটি নিয়োগকর্তা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে এবং অন্তত পাঁচ সদস্যের, অধিকাংশ নারী ও সম্ভব হলে নারী প্রধানের নেতৃত্বে অভিযোগ কমিটি চালাতে হয়। ২০২৬ সালে উপদেষ্টা পরিষদ কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে, যাতে অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি, না থাকলে ডিসি ও ইউএনওর মাধ্যমে স্থানীয় কমিটি এবং ৯০ দিনে তদন্ত শেষ করার বিধান আছে, আর সংসদ আইএলও কনভেনশন ১৯০-এর সাথে মিলিয়ে যৌন হয়রানির সংজ্ঞাসহ শ্রম আইন সংশোধন পাস করেছে। শ্রমিক প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ করতে পারেন এবং গুরুতর আচরণে একই সাথে ফৌজদারি মামলাও করতে পারেন।
কী হয়রানি হিসেবে গণ্য
- অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ, পথ আটকানো, অনুসরণ বা শারীরিক ভয় দেখানো।
- যৌন মন্তব্য, চেহারা নিয়ে কৌতুক, ডেট বা যৌন সুবিধার অনুরোধ।
- যৌন আচরণের সাথে পদোন্নতির প্রতিশ্রুতি বা চাকরিচ্যুতির হুমকি।
- হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার বা ইমেইলসহ যৌন ছবি, বার্তা বা ভিডিও দেখানো বা পাঠানো।
- পিছু নেওয়া, বারবার ফোন করা বা যৌন গুজব ছড়ানো।
মাপকাঠি হলো আচরণটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও যৌন প্রকৃতির কি না, হয়রানিকারীর উদ্দেশ্য নয়।
অভিযোগ যেভাবে করবেন
- তারিখ, সময়, ব্যবহৃত শব্দ, সাক্ষী লিখে রাখুন এবং প্রেরকের নম্বর বা প্রোফাইল দেখা যায় এমন স্ক্রিনশট রাখুন।
- প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ কমিটিতে লিখিত অভিযোগ দিন; প্রাপ্তিস্বীকারসহ কপি রাখুন। কমিটি মৌখিক বা অনলাইন অভিযোগও নিতে পারে।
- প্রয়োজনে অন্তর্বর্তী সুরক্ষা চান: রিপোর্টিং লাইন, শিফট বা ডেস্ক বদল, বা বেতনসহ ছুটি।
- কমিটি গোপনে দুই পক্ষকে শুনে সতর্কতা থেকে বরখাস্ত পর্যন্ত ব্যবস্থার সুপারিশ করে।
- কমিটি না থাকলে বা ব্যবস্থা না নিলে ডিসি বা ইউএনওর মাধ্যমে স্থানীয় কমিটি, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, বা আইনজীবীর কাছে যান।
ফৌজদারি ও অনলাইন পথ
গুরুতর আচরণ অপরাধও। নারীর শালীনতার অবমাননার উদ্দেশ্যে কথা বা অঙ্গভঙ্গি দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারায়; যৌন নিপীড়ন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এ; অনলাইন হয়রানি ও অন্তরঙ্গ ছবি ছড়ানো সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬-এ পড়ে। প্রতিষ্ঠানের প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ফৌজদারি অভিযোগ চলতে পারে; একটির জন্য অন্যটি অপেক্ষা করে না। কোথায় দাখিল করবেন তা আমাদের জিডি, এজাহার না নালিশি মামলা গাইডে আছে।
অভিযোগের জন্য শাস্তি পেলে
অভিযোগের কারণে চাকরিচ্যুতি, পদাবনতি বা বদলি প্রতিশোধমূলক। শ্রম আইনের আওতাভুক্ত শ্রমিক ৩০ দিনের মধ্যে নিয়োগকর্তার কাছে অভিযোগ এবং তারপর ৩৩ ধারায় শ্রম আদালতে যেতে পারেন (সময়সীমার জন্য তামাদি লুকআপ দেখুন)। সরকারি কর্মচারীরা শৃঙ্খলা বিধিমালা এবং প্রয়োজনে রিট ব্যবহার করতে পারেন। অভিযোগের দিন থেকে প্রতিটি চিঠি ও বার্তা রাখুন।
নিয়োগকর্তাদের জন্য
কমিটি গঠন করুন, বাংলা ও ইংরেজিতে নীতিমালা প্রকাশ করুন, ব্যবস্থাপকদের প্রশিক্ষণ দিন, অভিযোগ গোপন রাখুন এবং সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নিন। না করলে হাইকোর্টের নির্দেশনা এবং নতুন আইনে আইনি দায় লঙ্ঘিত হয়, এবং মামলা আদালতে বা গণমাধ্যমে গেলে প্রতিষ্ঠান দায়ের মুখে পড়ে।
লিখে রাখুন
তারিখ, শব্দ, সাক্ষী, স্ক্রিনশট।
লিখিত অভিযোগ
কমিটিতে; প্রাপ্তিস্বীকারসহ কপি রাখুন।
সুরক্ষা চান
তদন্ত চলাকালে লাইন, শিফট বা ডেস্ক বদল।
এগিয়ে যান
স্থানীয় কমিটি, ডাইফ, ফৌজদারি মামলা বা শ্রম আদালত।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বাংলাদেশের আইনে কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি কী?
যৌন প্রকৃতির অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ, শারীরিক, মৌখিক, অমৌখিক বা অনলাইন, যার মধ্যে যৌন সুবিধার দাবি, যৌন মন্তব্য, যৌন উপকরণ দেখানো এবং যৌন আচরণের সাথে যুক্ত হুমকি বা প্রতিশ্রুতি।
প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে কি অভিযোগ কমিটি থাকা বাধ্যতামূলক?
হ্যাঁ। ২০০৯ সালের হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনায় প্রতিটি কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক, আর ২০২৬ সালের অধ্যাদেশ অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটিকে আইনি দায় করেছে।
অভিযোগ কমিটিতে কারা থাকেন?
অন্তত পাঁচজন সদস্য, অধিকাংশ নারী এবং সম্ভব হলে নারী প্রধান। অভিজ্ঞ বাইরের সদস্য প্রত্যাশিত; ২০২৬ সালের অধ্যাদেশে প্রাপ্যতা সাপেক্ষে তাদের নিয়োগের কথা আছে।
কমিটির সিদ্ধান্তে কত সময় লাগে?
২০২৬ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী অভিযোগের ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে।
আমার প্রতিষ্ঠানে কমিটি না থাকলে?
ডেপুটি কমিশনার বা ইউএনওর মাধ্যমে স্থানীয় কমিটি, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে অভিযোগ করুন, বা ফৌজদারি মামলা করুন।
প্রতিষ্ঠানে অভিযোগের পাশাপাশি কি থানায় মামলা করা যায়?
হ্যাঁ। গুরুতর আচরণ দণ্ডবিধি, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন বা সাইবার সুরক্ষা আইনে অপরাধ, এবং ফৌজদারি মামলা একই সাথে চলতে পারে।
সহকর্মীর অনলাইন হয়রানি কি অন্তর্ভুক্ত?
হ্যাঁ। সামাজিক মাধ্যম, ইমেইল বা মেসেজিং অ্যাপে বার্তা, ছবি ও কল নির্দেশনা ও ২০২৬ সালের অধ্যাদেশে অন্তর্ভুক্ত, আর সাইবার অপরাধও হতে পারে।
অভিযোগের পর চাকরিচ্যুত হলে?
এটি প্রতিশোধমূলক। ৩০ দিনের মধ্যে অভিযোগ দিন এবং নিয়োগকর্তা প্রত্যাহার না করলে শ্রম আইনের ৩৩ ধারায় শ্রম আদালতে যান।
চাকরি ও ভোক্তা অধিকার বিষয়ে আরও পড়ুন
বেতন, চাকরির অবসান, গ্র্যাচুইটি ও ভোক্তার অভিযোগ।
কর্মক্ষেত্রে হয়রানির শিকার?
গোপনে কথা বলুন। আমরা প্রমাণ গোছাতে, কমিটিতে দাখিল করতে এবং প্রয়োজনে থানা বা শ্রম আদালতে যেতে সাহায্য করি। লিখিত প্রাথমিক মূল্যায়ন বিনামূল্যে।

মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।