জিডি নাকি এজাহার নাকি নালিশি মামলা: মামলা করার সঠিক পথ ও পুলিশ না নিলে করণীয়
ভুল জিনিস দায়ের করে মানুষ মাসের পর মাস হারান: যেখানে মামলা দরকার ছিল সেখানে জিডি, পুলিশ তদন্তই করবে না এমন থানার মামলা, কিংবা এত দুর্বল নালিশি আবেদন যে প্রথম দিনেই খারিজ। সঠিক শুরুর জায়গা বেছে নেওয়াই মামলার অর্ধেক কাজ। এই গাইড বলে দেবে আপনার কোনটি দরকার আর কীভাবে ঠিকমতো দায়ের করবেন।
- জিডি তথ্য রেকর্ড করে; এজাহার থানায় মামলা শুরু করে
- পুলিশ মামলা না নিলে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নালিশি মামলা (ধারা ২০০)
- হারানো জিনিস ও কাগজের জন্য অনলাইন জিডি
- জরুরি অবস্থায় ৯৯৯-এ কল করুন
এই গাইডে: জিডি করা · এজাহার দায়ের · পুলিশ মামলা না নিলে · টিকে থাকার মতো নালিশি আবেদন · দায়েরের আগে দুটি সতর্কতা
সংক্ষেপে উত্তর
- জিডি (সাধারণ ডায়েরি)। তথ্য রেকর্ডের জন্য: হারানো জিনিস, হুমকি, বা আমলঅযোগ্য অপরাধ। এটি রেকর্ড, মামলা নয়।
- এজাহার (থানায় মামলা)। চুরি, জখমসহ মারধর, প্রতারণা, অপহরণ বা খুনের মতো আমলযোগ্য অপরাধের জন্য। পুলিশ মামলা নিয়ে তদন্ত করে।
- নালিশি মামলা। সরাসরি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন। পুলিশ ব্যবস্থা না নিলে, আদালতের নিয়ন্ত্রণে মামলা চাইলে, বা আইনে এটি লাগলে।
জিডি করা
ঘটনা যে এলাকায় ঘটেছে সেখানকার থানায় আপনার নাম, এনআইডি ও ফোন নম্বরসহ একটি সংক্ষিপ্ত লিখিত আবেদন নিয়ে যান, আর জিডি নম্বর ও ডিউটি অফিসারের সই করা কপি চেয়ে নিন। এনআইডি, পাসপোর্ট, ফোন বা সনদের মতো হারানো কাগজ ও জিনিসের জন্য বাংলাদেশ পুলিশের পোর্টাল বা অ্যাপে অনলাইন জিডি করা যায়।
হুমকির জিডি পরে কিছু ঘটলে কাজের প্রমাণ। কিন্তু আমলঅযোগ্য অপরাধে শুধু জিডির ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত করতে পারে না; ১৫৫ ধারায় ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি লাগে।
এজাহার দায়ের
আমলযোগ্য অপরাধে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ১৫৪ ধারায় তথ্য লিপিবদ্ধ করতে বাধ্য। পরিষ্কার লিখিত এজাহার দিন: কে কী করেছে, কখন, কোথায়, কারা দেখেছে, আর কী আঘাত বা ক্ষতি হয়েছে। সই করুন, মামলা নম্বর নিন, আর এজাহারের কপি চান। আঘাত থাকলে যত দ্রুত সম্ভব সরকারি হাসপাতালের মেডিকেল সার্টিফিকেট নিন; দেরিতে নেওয়া সার্টিফিকেট বিচারে প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
২০২৬ সালের সংশোধনী অনুযায়ী তদন্ত সাধারণত ৬০ কর্মদিবসের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা, ম্যাজিস্ট্রেট সময় বাড়াতে পারেন।
পুলিশ মামলা না নিলে
জমির বিরোধ, পারিবারিক বিরোধ আর প্রভাবশালী কারও বিরুদ্ধে মামলায় এটা প্রায়ই ঘটে। আমলযোগ্য অপরাধের মামলা না নেওয়ার এখতিয়ার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নেই, তবু এমন হয়। আপনার পথগুলো:
- পুলিশ সুপার, অথবা মেট্রোপলিটন এলাকায় উপ-পুলিশ কমিশনার বা পুলিশ কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিন, রিসিভ কপি রাখুন।
- চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ২০০ ধারায় নালিশি আবেদন করুন। ম্যাজিস্ট্রেট শপথ নিয়ে আপনাকে জিজ্ঞাসা করবেন, তারপর আমলে নিতে, তদন্তের আদেশ দিতে, ১৫৬(৩) ধারায় পুলিশকে তদন্তের নির্দেশ দিতে, বা অপরাধ না থাকলে খারিজ করতে পারেন।
- বিশেষ আইনের নিজস্ব পথ আছে। পুলিশ মামলা না নিলে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে, আর সাইবার অপরাধ সাইবার ট্রাইব্যুনালে করা যায়।
মামলা না নেওয়ার বিষয়টি রেকর্ডে রাখুন। এটি আদালতে আপনার আবেদনকে শক্তিশালী করে।
টিকে থাকার মতো নালিশি আবেদন
- তারিখ ধরে ঘটনা লিখুন। সিদ্ধান্ত নয়, ঘটনা।
- প্রত্যেক আসামির নাম দিন এবং কে ঠিক কী করেছে লিখুন।
- ঠিকানাসহ সাক্ষীদের তালিকা আর কে কী দেখেছে দিন।
- কাগজ সংযুক্ত করুন: দলিল, মেসেজ, মেডিকেল সার্টিফিকেট, আগের জিডির কপি।
- সঠিক ধারা বেছে নিন। ভুল ধারায় খারিজ বা দেরি হয়।
দায়েরের আগে দুটি সতর্কতা
জেনেশুনে মিথ্যা মামলা করলে মামলাকারীকে ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে এবং তাঁর বিচারও হতে পারে। আর কিছু বিরোধ ফৌজদারি মনে হলেও আসলে দেওয়ানি: জমি বুঝিয়ে না দেওয়া ক্রেতা, টাকা না দেওয়া ব্যবসায়িক অংশীদার। এগুলো ফৌজদারি মামলা হিসেবে করলে প্রায়ই ব্যর্থ হয় এবং বাতিল হতে পারে। যেসব জেলায় চালু, সেখানে কিছু পারিবারিক ও আর্থিক বিরোধে মামলার আগে মধ্যস্থতাও এখন বাধ্যতামূলক। আগে সঠিক জায়গা নিয়ে পরামর্শ নিন।
পথ ঠিক করুন
অপরাধ ও পুলিশের সাড়া দেখে জিডি, এজাহার বা নালিশি আবেদন।
ঘটনা গুছিয়ে নিন
তারিখসহ ঘটনার বিবরণ, সাক্ষী, কাগজ, আর প্রয়োজনে মেডিকেল সার্টিফিকেট।
দায়ের ও প্রমাণ
জিডি বা মামলা নম্বর, এজাহারের কপি, বা আদালতের দাখিলের সিল।
তদারকি
তদন্তের খোঁজ রাখুন, লিখিত প্রমাণ দিন, কাজ না এগোলে ওপরে জানান।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
জিডি আর এজাহারের পার্থক্য কী?
জিডি তথ্য বা আমলঅযোগ্য বিষয় রেকর্ড করে, এতে নিজে থেকে তদন্ত শুরু হয় না। এজাহার আমলযোগ্য অপরাধকে থানার মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করে, যার তদন্ত পুলিশকে করতেই হয়।
অনলাইনে জিডি কীভাবে করব?
বাংলাদেশ পুলিশের অনলাইন জিডি পোর্টাল বা অ্যাপে। অনলাইন জিডি সাধারণত হারানো জিনিস ও কাগজের জন্য; অন্য বিষয় থানায় গিয়ে করতে হয়।
পুলিশ মামলা না নিলে কী করব?
পুলিশ সুপার বা পুলিশ কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিন, আর ২০০ ধারায় চিফ জুডিশিয়াল বা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নালিশি আবেদন করুন।
থানায় মামলা করতে কি টাকা লাগে?
জিডি বা এজাহারে কোনো সরকারি ফি নেই। আদালতে নালিশি আবেদনে সামান্য কোর্ট ফি লাগে; আইনজীবীর ফি আলাদা।
পুলিশের তদন্তে কত সময় লাগে?
২০২৬ সালের সংশোধনী অনুযায়ী সাধারণত ৬০ কর্মদিবস, ম্যাজিস্ট্রেট সময় বাড়াতে পারেন।
সরাসরি কি আদালতে মামলা করা যায়?
হ্যাঁ। ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নালিশি আবেদন করা যায়, তিনি শপথ নিয়ে জিজ্ঞাসা করে মামলা চালাবেন, তদন্তের আদেশ দেবেন, নাকি খারিজ করবেন তা ঠিক করেন।
অন্য জেলায় ঘটা অপরাধের মামলা কোথায় করব?
সাধারণত যেখানে অপরাধ ঘটেছে, সেখানকার থানা বা এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতে।
কেউ হুমকি দিলে কি জিডিই যথেষ্ট?
জিডি হুমকিটি রেকর্ড করে এবং মূল্যবান প্রমাণ। সত্যিই অপরাধ ঘটলে এজাহার বা নালিশি মামলা লাগবে।
জিডি প্রত্যাহার করার নিয়ম কী?
আর এগোতে চান না জানিয়ে থানার ওসির কাছে লিখিত আবেদন দিন; সেটি জিডির সঙ্গে লিপিবদ্ধ হয়। জিডি থেকে ইতিমধ্যে তদন্ত বা আদালতে মামলা শুরু হলে শুধু আদালতই তা শেষ করতে পারেন।
এই গাইডের পেছনের আইন ও ফরম
বিডি অ্যাডভোকেসিতে সংরক্ষিত প্রামাণিক পাঠ। ধারা নম্বরগুলো এই গাইডে ব্যবহৃত।
ফৌজদারি, পুলিশ ও সাইবার বিষয়ে আরও পড়ুন
গ্রেপ্তার ও জামিন, জিডি ও এজাহার, মিথ্যা মামলা ও সাইবার হয়রানি।
সাইবার হয়রানি ও ফেক ফেসবুক আইডি: অভিযোগ করার সঠিক নিয়ম (২০২৬)
মিথ্যা মামলা হলে করণীয়: আগাম জামিন, খারিজ ও শাস্তি (২০২৬)
গ্রেপ্তারের পর প্রথম ২৪ ঘণ্টা: অধিকার, রিমান্ড ও জামিন
জামিনযোগ্য ও জামিন অযোগ্য ধারা: তালিকা ও ব্যাখ্যা
আগাম জামিন কিভাবে নিতে হয়: নিয়ম, কাগজ ও খরচ
ওয়ারেন্ট হলে করণীয়: আত্মসমর্পণ, জামিন ও রিকল
প্রতারণা মামলা (৪২০ ও ৪০৬ ধারা): করার নিয়ম ও প্রতিরক্ষা
চার্জশিট, ফাইনাল রিপোর্ট ও নারাজি পিটিশন
মানহানি মামলা করার নিয়ম: ফৌজদারি ও দেওয়ানি
মামলা আপোষের নিয়ম ও আপোষনামা
গ্রেপ্তার হলে: জামিনের জন্য কী নোট করবেন ও আনবেন
সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬: জুনের সংশোধনী ও নতুন খসড়া
সিআরপিসি সংশোধন ২০২৬: গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নতুন সুরক্ষা
কোন মামলা করবেন বুঝতে পারছেন না?
আমরা এমনভাবে এজাহার ও নালিশি দরখাস্ত তৈরি করি যা যাচাইয়ে টিকে যায়, এবং পুলিশ ব্যবস্থা না নিলে আদালতে যাই। লিখিত প্রাথমিক মূল্যায়ন বিনামূল্যে।

মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।