অর্থঋণ মামলা: ঋণগ্রহীতা ও জামিনদারের যা জানা দরকার
ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণ আদায়ে মামলা করলে তা যায় অর্থঋণ আদালতে। প্রক্রিয়া দ্রুত এবং ঋণদাতার অনুকূলে, তাই শুরুর ধাপগুলোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কীভাবে চলে, এখানে।
- ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণ আদায়ের মামলা করে অর্থঋণ আদালতে, সাধারণ দেওয়ানি আদালতে নয়।
- ঋণগ্রহীতার সঙ্গে জামিনদার ও তৃতীয় পক্ষের বন্ধকদাতাকেও বিবাদী করা হয়; দায় যৌথ ও পৃথক (ধারা ৬(৫))।
- লিখিত জবাবের পর মধ্যস্থতা: ৬০ দিন, সর্বোচ্চ ৩০ দিন বাড়ানো যায় (ধারা ২২)।
- একতরফা ডিক্রি রদে ১০% (ধারা ১৯) আর আপিলে ডিক্রির টাকার ৫০% জমা লাগে (ধারা ৪১)।
এই গাইডে: ধাপে ধাপে · আপনি যদি জামিনদার হন · ডিক্রির পর প্রতিকার
সংক্ষেপে উত্তর
অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ আদায়ের জন্য বিশেষ আদালত তৈরি করেছে। ব্যাংক বকেয়া টাকার জন্য মামলা করে; ঋণগ্রহীতা, জামিনদার ও তৃতীয় পক্ষের বন্ধকদাতাকে বিবাদী করা হয়। লিখিত জবাবের পর মীমাংসার ধাপ আসে। তা ব্যর্থ হলে বিচার ও ডিক্রি, তারপর ডিক্রি জারি, যাতে বন্ধকি সম্পত্তি নিলামও হতে পারে।
সময়সীমা ছোট আর ডিক্রির পরের প্রতিকারে নগদ জমা লাগে, তাই সমনের জবাব সময়মতো দিন।
ধাপে ধাপে
| ধাপ | কী হয় | আপনার করণীয় |
|---|---|---|
| মামলার আগে | জামানতের ধরন ও বিক্রির ক্ষমতা অনুযায়ী প্রযোজ্য হলে মামলার আগে ব্যাংককে জামানত বিক্রি করতে, বা বিক্রির চেষ্টা করে ব্যর্থ হতে হয় (ধারা ১২) | লিখিত জবাব দিন, হিসাব বিবরণী চান, পুনঃতফসিলের সুযোগ দেখুন |
| সমন | ঋণগ্রহীতা, জামিনদার ও তৃতীয় পক্ষের বন্ধকদাতার বিরুদ্ধে মামলা (ধারা ৬(৫)) | হাজির হয়ে সময়মতো লিখিত জবাব দিন |
| মীমাংসা | লিখিত জবাবের পর মধ্যস্থতা, ৬০ দিনে, সর্বোচ্চ ৩০ দিন বাড়ানো যায় (ধারা ২২) | বাস্তবসম্মত পরিশোধ প্রস্তাব আনুন |
| বিচার ও ডিক্রি | সাক্ষ্য, শুনানি ও ডিক্রি | শুধু অস্বীকার নয়, কাগজ দিয়ে দাবির জবাব দিন |
| ডিক্রি জারি | বন্ধকি সম্পত্তি নিলাম ও অন্যান্য আদায় ব্যবস্থা | নিলামের আগে আলোচনা করুন; বিক্রয় নোটিশ যাচাই করুন |
আপনি যদি জামিনদার হন
৬(৫) ধারায় জামিনদার ও তৃতীয় পক্ষের বন্ধকদাতাকে বিবাদী করা হয়, আর দায় যৌথ ও পৃথক। ডিক্রি জারি যতদূর সম্ভব আইনে নির্ধারিত সম্পদের ক্রম মেনে হওয়ার কথা, তবু ঋণের জন্য আপনার কাছে আদায় চাওয়া যায়। আপনার সই করা গ্যারান্টি, তার সীমা, আপনার সম্মতি ছাড়া ঋণ বদলানো বা পুনঃতফসিল হয়েছে কি না, আর ব্যাংক কোনো জামানত ছেড়ে দিয়েছে কি না দেখুন। এগুলো আপনার দায় কমাতে বা শেষ করতে পারে, আর লিখিত জবাবেই তুলতে হয়।
ডিক্রির পর প্রতিকার
- একতরফা ডিক্রি: ১৯ ধারায় ডিক্রি বা তা জানার ৩০ দিনের মধ্যে রদের আবেদন, আর আবেদনের ১৫ দিনের মধ্যে ডিক্রির টাকার ১০% জমা।
- আপিল: ৪১ ধারায়, ডিক্রি ৫০ লাখ টাকার বেশি হলে ৬০ দিনের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে, ৫০ লাখ বা কম হলে ৩০ দিনের মধ্যে জেলা জজের কাছে। ঋণগ্রহীতাকে ডিক্রির টাকার ৫০% জমা দিতে হয়, ১৯ ধারার জমা এর মধ্যে গণ্য হয়; আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জমা লাগে না। দিন গণনা ৪৮ ধারা অনুযায়ী।
- মীমাংসা: ডিক্রি জারিসহ যেকোনো ধাপে ব্যাংকের সঙ্গে আপস লিপিবদ্ধ করা যায়।
- রিট: কেবল সীমিত ক্ষেত্রে, যেমন স্পষ্ট এখতিয়ারহীনতা; এটি আপিলের বিকল্প নয়।
কাগজ জোগাড় করুন
মঞ্জুরিপত্র, গ্যারান্টি, বন্ধকনামা, হিসাব বিবরণী ও নোটিশ।
দাবি যাচাই করুন
সুদ, চার্জ ও জমা হওয়া কিস্তি মিলিয়ে দেখুন; ব্যাংকের কাছে বিবরণী চান।
সময়মতো জবাব
হাজির হয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লিখিত জবাব দিন।
মীমাংসার প্রস্তুতি
মীমাংসা ধাপে কাগজসহ প্রস্তাব সবচেয়ে কাজে দেয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
অর্থঋণ মামলা কী?
অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ অনুযায়ী ঋণ আদায়ে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করা মামলা, যা অর্থঋণ আদালতে চলে।
ব্যাংক কি লোনের জামিনদারের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে?
পারে। ৬(৫) ধারায় ঋণগ্রহীতার সঙ্গে জামিনদার ও তৃতীয় পক্ষের বন্ধকদাতাকে বিবাদী করা হয়, আর দায় যৌথ ও পৃথক।
অর্থঋণ মামলায় কি মধ্যস্থতা হয়?
হয়। ২২ ধারায় লিখিত জবাবের পর মধ্যস্থতা হয়, ৬০ দিনে, সর্বোচ্চ ৩০ দিন বাড়ানো যায়। সম্মত শর্ত আদালত লিপিবদ্ধ করেন।
অর্থঋণ মামলার একতরফা ডিক্রি কীভাবে রদ করব?
১৯ ধারায় ডিক্রি বা তা জানার ৩০ দিনের মধ্যে আবেদন করুন, আর আবেদনের ১৫ দিনের মধ্যে ডিক্রির টাকার ১০% জমা দিন।
অর্থঋণ ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিলে কত টাকা জমা দিতে হয়?
ডিক্রির টাকার ৫০%, ১৯ ধারার জমা এর মধ্যে গণ্য হয়। ৫০ লাখ টাকার বেশি হলে ৬০ দিনের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে, ৫০ লাখ বা কম হলে ৩০ দিনের মধ্যে জেলা জজের কাছে আপিল।
ব্যাংক কি আমার সম্পত্তি নিলামে তুলতে পারে?
পারে। ডিক্রির পর আদালত ডিক্রি জারিতে বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রি করতে পারেন। মামলার আগে, জামানত ও বিক্রির ক্ষমতা অনুযায়ী প্রযোজ্য হলে, ১২ ধারায় ব্যাংককে আগে জামানত বিক্রি বা বিক্রির চেষ্টা করতে হয়।
ডিক্রির পরও কি আপস করা যায়?
যায়। অনেক মামলা ডিক্রি জারির পর্যায়ে মীমাংসা হয়। শর্ত লিখিত নিন এবং আদালতে আপস লিপিবদ্ধ করান।
ঋণগ্রহীতাকে কি দেওয়ানি কারাগারে পাঠানো যায়?
আইনে কিছু ক্ষেত্রে ডিক্রি জারিতে দায়িককে দেওয়ানি আটকের বিধান আছে। এটি পরিশোধের চাপ, শাস্তি নয়।
আদালত, মামলা ও টাকা আদায় বিষয়ে আরও পড়ুন
চেক ডিজঅনার, লিগ্যাল নোটিশ ও মামলার আগে মধ্যস্থতা।
চেক ডিজঅনার মামলা (ধারা ১৩৮): নোটিশ, সময়সীমা ও শাস্তির নিয়ম
উকিল নোটিশ লেখার নিয়ম, খরচ ও জবাব
পাওনা টাকা আদায়ের উপায়: নোটিশ, মামলা ও আপস
অনলাইনে মামলার অবস্থা ও কজলিস্ট দেখার নিয়ম
হাইকোর্টে রিট পিটিশন: খরচ ও প্রক্রিয়া
সালিশনামা লেখার নিয়ম ও সালিশি আইন
সরকারি আইনগত সহায়তা: কারা পাবেন, কীভাবে আবেদন
দেওয়ানি মামলা করার নিয়ম: খরচ, কোর্ট ফি ও সময়
লিগ্যাল নোটিশের কাঠামো: টাকা ও চেক আদায়ের দাবি
মামলার আগে বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা: ২০২৬ সালে যা বদলাল
অর্থঋণ আদালতের সমন বা নোটিশ পেয়েছেন?
কাগজ পাঠান। দাবি, সময়সীমা আর মীমাংসা বা প্রতিরক্ষার সেরা পথ আমরা দেখে দিই। লিখিত প্রাথমিক মূল্যায়ন বিনামূল্যে।

মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।