সালিশনামা লেখার নিয়ম ও সালিশি আইন: চুক্তি, প্রক্রিয়া ও রোয়েদাদ কার্যকর করা
সালিশে পক্ষগুলো নিজেরাই ঠিক করে কে বিরোধ নিষ্পত্তি করবেন, আর বিষয়টি আদালতের বাইরে থাকে। তবে তা কাজ করে কেবল সালিশনামা ঠিকভাবে লেখা হলে। কীভাবে, এখানে।
- সালিশ চুক্তি লিখিত হতে হবে (ধারা ৯); সই করা দলিল, চিঠি ও ইমেইলও গণ্য হতে পারে।
- চুক্তি থাকা সত্ত্বেও কেউ মামলা করলে আদালত মামলা স্থগিত করে সালিশে পাঠাতে পারেন (ধারা ১০)।
- সালিশকারীর সংখ্যা ঠিক না থাকলে তিনজন হবেন।
- রোয়েদাদ পাওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে চ্যালেঞ্জ করা যায়; না হলে আদালতের ডিক্রির মতো কার্যকর হয়।
এই গাইডে: গ্রাম্য সালিশ, গ্রাম আদালত নাকি সালিশি আইন? · ভালো সালিশনামায় যা থাকে · রোয়েদাদ চ্যালেঞ্জ বা কার্যকর করা
সংক্ষেপে উত্তর
সাধারণ কথায় সালিশ বলতে গ্রাম্য মাতব্বরদের মীমাংসা আর আনুষ্ঠানিক সালিশ দুটোই বোঝায়। আদালত কার্যকর করবেন এমন রোয়েদাদ পাওয়া যায় কেবল সালিশি আইন, ২০০১-এর আনুষ্ঠানিক সালিশে। শুরু হয় লিখিত সালিশ চুক্তি দিয়ে: চুক্তিপত্রের একটি ধারা, অথবা বিরোধ হওয়ার পর আলাদা সালিশনামা।
সালিশ ট্রাইব্যুনাল উভয় পক্ষকে শুনে লিখিত রোয়েদাদ দেন। দেশীয় সালিশের বিষয় দেখে জেলা জজ আদালত; আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সালিশ দেখে হাইকোর্ট বিভাগ।
গ্রাম্য সালিশ, গ্রাম আদালত নাকি সালিশি আইন?
| গ্রাম্য সালিশ | গ্রাম আদালত | সালিশি আইন | |
|---|---|---|---|
| ভিত্তি | প্রথা, সম্মতিতে | গ্রাম আদালত আইন, ২০০৬ | সালিশি আইন, ২০০১ |
| কে সিদ্ধান্ত দেন | স্থানীয় মুরব্বি | ইউপি চেয়ারম্যান ও প্যানেল | পক্ষগুলোর বাছাই করা সালিশকারী |
| বিরোধ | পারিবারিক ও স্থানীয় বিষয় | নির্দিষ্ট ছোট দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিরোধ, ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত | বাণিজ্যিক, চুক্তি, সম্পত্তি ও অংশীদারি বিরোধ |
| বাধ্যতামূলক? | কেবল ব্যক্তিগত চুক্তি হিসেবে | হ্যাঁ, এখতিয়ারের মধ্যে | হ্যাঁ; ডিক্রির মতো কার্যকর |
ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ের গ্রাম আদালত ২০২৪ সালে সংশোধিত গ্রাম আদালত আইন, ২০০৬ অনুযায়ী নির্দিষ্ট ছোট দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিরোধ শুনতে পারে। আর্থিক সীমা ৩ লাখ টাকা, তবে আইন ও তফসিলের মামলার ধরন, মূল্য নির্ধারণের নিয়ম ও অন্যান্য শর্ত সাপেক্ষে। ফৌজদারি বিষয়ে এটি ক্ষতিপূরণ দেওয়ানোর ক্ষমতা, সাধারণ জরিমানার ক্ষমতা নয়।
গ্রাম আদালত আলাদা একটি আইনি ব্যবস্থা, সালিশ নয়। পক্ষগুলোর চুক্তিতে সালিশ বা বিরোধ নিষ্পত্তির ধারা থাকলে সেই দেওয়ানি বিরোধ গ্রাম আদালতে যায় না (ধারা ৩(২)(খ))।
ভালো সালিশনামায় যা থাকে
- পক্ষগুলোর পূর্ণ নাম, ঠিকানা ও জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর।
- কোন বিরোধ সালিশে যাবে: চুক্তির সব বিরোধ, নাকি নির্দিষ্ট একটি।
- সালিশকারীর সংখ্যা ও নিয়োগের পদ্ধতি, আর এক পক্ষ নিয়োগ না দিলে কী হবে।
- সালিশের স্থান, ভাষা ও নিয়ম, যেমন বিয়াক (BIAC)-এর নিয়ম।
- রোয়েদাদ চূড়ান্ত ও বাধ্যতামূলক, আর খরচ কে কতটা বহন করবেন।
- উভয় পক্ষ ও সাক্ষীদের সই এবং তারিখ।
অস্পষ্ট ধারা থাকলে পরে কে কাকে নিয়োগ দেবেন তা নিয়ে আদালতে যেতে হয়।
রোয়েদাদ চ্যালেঞ্জ বা কার্যকর করা
রোয়েদাদ পাওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে সীমিত কারণে তা বাতিলের আবেদন করা যায়, যেমন চুক্তি অবৈধ, যথাযথ নোটিশ হয়নি, বিষয়ের বাইরে সিদ্ধান্ত, পদ্ধতিগত ত্রুটি, জননীতি, প্রতারণা বা দুর্নীতি (ধারা ৪২–৪৩)। আদালত মূল বিরোধ নতুন করে শোনেন না।
চ্যালেঞ্জ সফল না হলে রোয়েদাদ আদালতের ডিক্রির মতো কার্যকর হয় (ধারা ৪৪)। বিদেশি রোয়েদাদ কার্যকর হয় ঢাকার জেলা জজ আদালতের মাধ্যমে (ধারা ৪৫)।
চুক্তি লিখুন
চুক্তির ধারা বা সালিশনামা লিখিত, উভয় পক্ষের সই।
ট্রাইব্যুনাল গঠন
চুক্তি অনুযায়ী একক বা তিনজন সালিশকারী; এক পক্ষ অস্বীকার করলে আদালত নিয়োগ দিতে পারেন।
শুনানি ও সিদ্ধান্ত
দাবি, জবাব, কাগজ ও শুনানি; লিখিত ও সই করা রোয়েদাদ।
কার্যকর বা চ্যালেঞ্জ
৬০ দিনের মধ্যে চ্যালেঞ্জ; না হলে ডিক্রির মতো কার্যকর।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সালিশনামা লেখার নিয়ম কী?
লিখিত করুন এবং পক্ষগুলোর সই নিন। কোন বিরোধ, কতজন সালিশকারী ও কীভাবে নিয়োগ, স্থান, ভাষা ও নিয়ম লিখুন, আর রোয়েদাদ চূড়ান্ত তা উল্লেখ করুন।
গ্রাম্য সালিশের সিদ্ধান্ত কি আইনত বাধ্যতামূলক?
রোয়েদাদ হিসেবে নয়। গ্রাম্য সালিশ প্রথাগত মীমাংসা, যা কেবল ব্যক্তিগত চুক্তি হিসেবে বাধ্য করে। কার্যকরযোগ্য সিদ্ধান্তের জন্য সালিশি আইন, ২০০১-এর সালিশ বা এখতিয়ার থাকলে গ্রাম আদালত ব্যবহার করুন।
সালিশের ধারা থাকলে কি আদালতে যাওয়া যায়?
মামলা করলে অপর পক্ষ ১০ ধারায় মামলা স্থগিত করে সালিশে পাঠানোর আবেদন করতে পারেন, যদি না চুক্তি অবৈধ, অকার্যকর বা বিরোধটি সালিশযোগ্য না হয়।
কতজন সালিশকারী লাগে?
পক্ষগুলো যতজনে একমত হন, সাধারণত একজন বা তিনজন। সংখ্যা ঠিক না থাকলে তিনজন।
সালিশে কত সময় লাগে?
আইনে রোয়েদাদের নির্দিষ্ট সময় নেই। সালিশনামায় সময়সূচি ঠিক করা যায়, আর একক সালিশকারী সাধারণত দ্রুত হন।
সালিশের রোয়েদাদ কীভাবে চ্যালেঞ্জ করব?
রোয়েদাদ পাওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে ৪২ ও ৪৩ ধারার সীমিত কারণে আদালতে বাতিলের আবেদন করুন। আদালত মূল বিরোধ নতুন করে নিষ্পত্তি করেন না।
সালিশের রোয়েদাদ কীভাবে কার্যকর হয়?
৪৪ ধারায় আদালতের ডিক্রির মতো, ডিক্রি জারির মাধ্যমে।
পারিবারিক বিরোধ কি সালিশে যেতে পারে?
পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কিছু সম্পত্তি ও টাকার বিরোধ যেতে পারে। তালাক, দেনমোহর ও ভরণপোষণ পারিবারিক আইনের পদ্ধতিতে চলে, আর অনেক পারিবারিক বিরোধে এখন মামলার আগে মধ্যস্থতা বাধ্যতামূলক।
আদালত, মামলা ও টাকা আদায় বিষয়ে আরও পড়ুন
চেক ডিজঅনার, লিগ্যাল নোটিশ ও মামলার আগে মধ্যস্থতা।
চেক ডিজঅনার মামলা (ধারা ১৩৮): নোটিশ, সময়সীমা ও শাস্তির নিয়ম
উকিল নোটিশ লেখার নিয়ম, খরচ ও জবাব
পাওনা টাকা আদায়ের উপায়: নোটিশ, মামলা ও আপস
অনলাইনে মামলার অবস্থা ও কজলিস্ট দেখার নিয়ম
হাইকোর্টে রিট পিটিশন: খরচ ও প্রক্রিয়া
অর্থঋণ মামলা: ঋণগ্রহীতা ও জামিনদারের করণীয়
সরকারি আইনগত সহায়তা: কারা পাবেন, কীভাবে আবেদন
দেওয়ানি মামলা করার নিয়ম: খরচ, কোর্ট ফি ও সময়
লিগ্যাল নোটিশের কাঠামো: টাকা ও চেক আদায়ের দাবি
মামলার আগে বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা: ২০২৬ সালে যা বদলাল
সালিশনামা লিখছেন, নাকি রোয়েদাদের মুখোমুখি?
চুক্তি বা রোয়েদাদ পাঠান। আমরা সালিশনামা লিখি, সালিশ পরিচালনা বা চ্যালেঞ্জ করি। লিখিত প্রাথমিক মূল্যায়ন বিনামূল্যে।

মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।