Skip to content
হোম/আইনি গাইড/মিথ্যা মামলা হলে করণীয়
ফৌজদারি

মিথ্যা মামলা হলে করণীয়: আগাম জামিন, মামলা খারিজ ও ক্ষতিপূরণ

মিথ্যা মামলা করাই হয় ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করতে, জমি ছাড়িয়ে নিতে বা নিজের দাবি প্রত্যাহার করাতে। আপনি ভয় পাবেন, বাদী ঠিক সেটাই চান। আইন কিন্তু অভিযুক্তকে বেশ কয়েকটি স্বতন্ত্র হাতিয়ার দিয়ে রেখেছে, আর সঠিক সময়ে সঠিক হাতিয়ারটি ব্যবহার করলেই এসব মামলার অবসান ঘটে।

ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ (২০২৬ সালের সংশোধনীসহ)দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (ধারা ২১১)নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (ধারা ১৭)
শেয়ার করুন
বাংলাদেশে মিথ্যা ফৌজদারি মামলার বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার
এক নজরে
  • সম্ভব হলে গ্রেপ্তারের আগেই আগাম জামিনের ব্যবস্থা করুন
  • হাইকোর্ট অপব্যবহারমূলক মামলা খারিজ করতে পারে (ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৫৬১এ)
  • ম্যাজিস্ট্রেট সর্বোচ্চ ৫০,০০০ টাকা ক্ষতিপূরণের আদেশ দিতে পারেন (ধারা ২৫০)
  • মিথ্যা অভিযোগ: গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৭ বছরের সাজা (ধারা ২১১)

এই গাইডে যা আছে: প্রথম ৪৮ ঘণ্টা: যা করবেন · আগাম জামিন · তদন্ত চলাকালীন · অব্যাহতি ও মামলা খারিজ · মিথ্যা বাদীকে জবাবদিহি করানো · সবচেয়ে সাধারণ মিথ্যা মামলাগুলো

সংক্ষিপ্ত উত্তর

মিথ্যা মামলা হলে: মামলার কাগজপত্র সংগ্রহ করুন, সম্ভব হলে গ্রেপ্তারের আগেই জামিনের ব্যবস্থা করুন, এবং নিজের প্রমাণ সংরক্ষণ করুন। এরপর মামলার ধাপ অনুযায়ী সঠিক প্রতিকার ব্যবহার করুন — তদন্তকালে অব্যাহতি বা চূড়ান্ত প্রতিবেদন, ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৫৬১এ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগ থেকে মামলা খারিজ, অথবা বিচারে খালাস। এরপর মিথ্যা বাদীকে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা যায় এবং তার বিরুদ্ধে মামলাও করা যায়।

প্রথম ৪৮ ঘণ্টা: যা করবেন

  • ঠিক কী মামলা করা হয়েছে তা জেনে নিন। পুলিশি মামলা (এজাহার/এফআইআর) নাকি আদালতে নালিশি অভিযোগ? কোন কোন ধারায়? কোন থানা বা আদালতে, মামলা নম্বর কত? আপনার আইনজীবী এগুলোর প্রত্যয়িত কপি সংগ্রহ করতে পারবেন।
  • লুকিয়ে থাকবেন না, আর বাদীকে ভয়ও দেখাবেন না। পালিয়ে থাকলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ হতে পারে; আর বাদীর সাথে যোগাযোগ করলে নতুন অভিযোগ যুক্ত হতে পারে।
  • অবিলম্বে প্রমাণ সংরক্ষণ করুন: সিসিটিভি ফুটেজ (কয়েক দিনের মধ্যেই প্রায়ই মুছে যায়), লোকেশন ডেটা, ভ্রমণ ও অফিসের রেকর্ড, বার্তা ও কল লগ, এবং সাক্ষীদের নাম।
  • আপসযোগ্য নয় এমন মামলা “মিটিয়ে ফেলতে” কাউকে টাকা দেবেন না অনানুষ্ঠানিকভাবে। এতে মামলা শেষ হয় না, বরং তা পরে আপনার বিরুদ্ধেই ব্যবহার করা হতে পারে।

আগাম জামিন

এখনো গ্রেপ্তার না হয়ে থাকলে গ্রেপ্তারের আগেই জামিনের আবেদন করা যায়। বাস্তবে এটি করা হয় ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৪৯৮ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগে, অথবা দায়রা আদালতে। হাইকোর্ট বিভাগ সাধারণত একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আগাম জামিন মঞ্জুর করে এবং সেই সময়ের মধ্যে অভিযুক্তকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করে সেখান থেকে নিয়মিত জামিন নিতে নির্দেশ দেয়। আদালত যুক্তিসঙ্গত শর্তও জুড়ে দিতে পারে। পুলিশ ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই দ্রুত আবেদন করুন, এবং সবকিছু সঠিকভাবে প্রকাশ করুন।

মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে প্রতিকারের ফ্লোচার্ট: আগাম জামিন, অব্যাহতি, মামলা খারিজ, ক্ষতিপূরণ

তদন্ত চলাকালীন

ফৌজদারি কার্যবিধির ২০২৬ সালের সংশোধনী অনুযায়ী এখন পুলিশকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (৬০ কর্মদিবস, ম্যাজিস্ট্রেট চাইলে বাড়াতে পারেন) তদন্ত শেষ করতে হয়। তদন্ত কর্মকর্তাকে একটি কভারিং লেটারসহ লিখিতভাবে আপনার প্রমাণ জমা দিন এবং প্রাপ্তি স্বীকারের কপি রেখে দিন। প্রমাণ যদি অভিযোগকে সমর্থন না করে, তাহলে কর্মকর্তার চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া উচিত, আর সংশোধিত কার্যবিধি অনুযায়ী তদন্তের মধ্যেই কোনো প্রমাণ না মিললে ম্যাজিস্ট্রেট অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অভিযুক্তকে অব্যাহতিও দিতে পারেন।

অব্যাহতি ও মামলা খারিজ

অব্যাহতি

চার্জশিট আদালতে পৌঁছালে চার্জ শুনানিতে আপনি যুক্তি দিতে পারেন যে অভিযোগগুলো সত্য ধরে নিলেও তাতে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয় না। ম্যাজিস্ট্রেট (ধারা ২৪১এ) বা দায়রা জজ (ধারা ২৬৫সি) আপনাকে অব্যাহতি দিতে পারেন।

ধারা ৫৬১এ অনুযায়ী মামলা খারিজ

প্রক্রিয়ার অপব্যবহার হয় এমন মামলা খারিজ করার সহজাত ক্ষমতা হাইকোর্ট বিভাগের আছে — যেমন যেখানে অভিযোগে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয় না, দেওয়ানি বিরোধকে ফৌজদারি রূপ দেওয়া হয়েছে, বা মামলাটি আইনত নিষিদ্ধ। মামলা খারিজ হয়ে গেলে তা সম্পূর্ণভাবেই শেষ হয়ে যায়।

মিথ্যা বাদীকে জবাবদিহি করানো

  • ক্ষতিপূরণ (ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ২৫০): অভিযোগটি মিথ্যা এবং হয়রানিমূলক বা তুচ্ছ মনে হলে ম্যাজিস্ট্রেট বাদীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে বাধ্য, এবং সর্বোচ্চ ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণের আদেশ দিতে পারেন (সাম্প্রতিক সংশোধনীতে এই সীমা বাড়ানো হয়েছে)।
  • মিথ্যা অভিযোগ (দণ্ডবিধির ধারা ২১১): সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, আর গুরুতর অপরাধের মিথ্যা অভিযোগ হলে সর্বোচ্চ সাত বছর। আদালতের কার্যক্রমে করা মিথ্যা অভিযোগের ক্ষেত্রে সাধারণত সেই আদালতের নিজের অভিযোগ প্রয়োজন হয় বিচার শুরু করতে (ধারা ১৯৫)।
  • নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মিথ্যা মামলা (ধারা ১৭): কাউকে ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে এই আইনে মিথ্যা মামলা করলে সর্বোচ্চ সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও জরিমানা হতে পারে। মিথ্যাভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ট্রাইব্যুনাল ক্ষতিপূরণেরও আদেশ দিতে পারে।
  • বিদ্বেষপ্রসূত মামলার জন্য দেওয়ানি মামলা ক্ষতিপূরণের জন্য, খালাস বা অব্যাহতি পাওয়ার পর।

সবচেয়ে সাধারণ মিথ্যা মামলাগুলো

আমাদের অভিজ্ঞতায় সবচেয়ে বেশি দেখা যায় দাম্পত্য কলহ থেকে ওঠা মিথ্যা যৌতুক বা নারী-শিশু নির্যাতন মামলা, “সিকিউরিটি চেক” থেকে তৈরি চেকের মামলা, মারামারি বা চুরির মামলায় রূপান্তরিত জমি বিরোধ, এবং সাইবার অভিযোগ। প্রতিটির নিজস্ব প্রতিরক্ষা কৌশল ও সময়জ্ঞান আছে, তাই কৌশল সবসময় মামলা অনুযায়ী ঠিক করতে হয়।

এটি সাধারণ তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়। প্রতিকার নির্ভর করে মামলার ধাপ ও নির্দিষ্ট ধারার ওপর। পুলিশের সাথে দেখা করা বা আদালতে হাজির হওয়ার আগেই একজন আইনজীবীর সাথে কথা বলুন।
মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে লড়াই
1

কাগজপত্র সংগ্রহ করুন

মামলা নম্বর, ধারা, এজাহার বা অভিযোগের কপি, এবং আদালত বা থানার নাম।

2

জামিনের ব্যবস্থা করুন

গ্রেপ্তারের আগে হাইকোর্ট বিভাগে আগাম জামিন, এরপর আত্মসমর্পণ করে নিয়মিত জামিন।

3

প্রতিরক্ষা সাজান

তদন্ত কর্মকর্তার কাছে অ্যালিবাই ও প্রমাণপত্র জমা দিন এবং চূড়ান্ত প্রতিবেদন বা অব্যাহতি চান।

4

মামলা শেষ করুন ও পাল্টা ব্যবস্থা নিন

ধারা ৫৬১এ অনুযায়ী খারিজ করান, বা বিচারে জিতুন, এরপর ক্ষতিপূরণ ও মিথ্যা অভিযোগের মামলা করুন।

প্রতিরক্ষার প্রমাণ যত আগে সংরক্ষণ করবেন, পরবর্তী প্রতিটি প্রতিকার তত শক্তিশালী হবে।পরামর্শের সময় নিন

সাধারণ জিজ্ঞাসা

বাংলাদেশে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা হলে আমার কী করা উচিত?

মামলার বিস্তারিত জেনে নিন, একজন আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন, গ্রেপ্তার না হয়ে থাকলে আগাম জামিনের আবেদন করুন, নিজের প্রমাণ সংরক্ষণ করুন এবং বাদীর সাথে যোগাযোগ করবেন না। এরপর অব্যাহতি, মামলা খারিজ বা খালাসের চেষ্টা করুন।

বাংলাদেশে মিথ্যা মামলা করার শাস্তি কী?

দণ্ডবিধির ধারা ২১১ অনুযায়ী সর্বোচ্চ দুই বছর, আর গুরুতর অপরাধের মিথ্যা অভিযোগ হলে সর্বোচ্চ সাত বছর। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মিথ্যা মামলার সাজা সর্বোচ্চ সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড।

বাংলাদেশে আগাম জামিন কীভাবে পাব?

ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৪৯৮ অনুযায়ী আবেদনের মাধ্যমে, সাধারণত হাইকোর্ট বিভাগে। মঞ্জুর হলে তা একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আপনাকে সুরক্ষা দেয়, যার মধ্যে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করে নিয়মিত জামিন নিতে হবে।

হাইকোর্ট কি মিথ্যা মামলা খারিজ করতে পারে?

হ্যাঁ। ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৫৬১এ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগ প্রক্রিয়ার অপব্যবহার হয় এমন মামলা খারিজ করতে পারে, যেমন যেখানে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয় না বা দেওয়ানি বিরোধকে ফৌজদারি মামলায় রূপান্তর করা হয়েছে।

মিথ্যা মামলার জন্য কি আমি ক্ষতিপূরণ পেতে পারি?

হ্যাঁ। ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ২৫০ অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেট বাদীকে সর্বোচ্চ ৫০,০০০ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে আদেশ দিতে পারেন, আর খালাস বা অব্যাহতি পাওয়ার পর আপনি বিদ্বেষপ্রসূত মামলার জন্য পাল্টা মামলাও করতে পারেন।

মিথ্যা যৌতুক বা নারী নির্যাতন মামলা হলে কী করবেন?

দ্রুত আগাম জামিনের ব্যবস্থা করুন, দাম্পত্য বিরোধের প্রকৃত ইতিহাসের প্রমাণ সংগ্রহ করুন, এবং মামলাটি খারিজ হয়ে গেলে আইনের ধারা ১৭ অনুযায়ী পাল্টা মামলার কথা বিবেচনা করুন।

মিথ্যা মামলা কি আপস-মীমাংসায় মেটানো যায়?

শুধু আপসযোগ্য অপরাধই মীমাংসা করা যায়, আর কিছু ক্ষেত্রে তাও কেবল আদালতের অনুমতিতে। অনানুষ্ঠানিক অর্থ পরিশোধে আপসঅযোগ্য মামলা শেষ হয় না।

মিথ্যা মামলা থেকে মুক্তি পেতে কত সময় লাগে?

আগাম জামিন কয়েক দিনের মধ্যেই চাওয়া যায়। চূড়ান্ত প্রতিবেদন, অব্যাহতি বা মামলা খারিজের মাধ্যমে মামলা শেষ হতে মাসখানেক লাগতে পারে; পূর্ণাঙ্গ বিচারে আরও বেশি সময় লাগে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।

মন্তব্য লিখুন

সব মন্তব্য প্রকাশের আগে চেম্বার থেকে যাচাই করা হয়। মামলার গোপন তথ্য, ফোন নম্বর বা লিংক দেবেন না। এখানে দেওয়া উত্তর সাধারণ তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়; নির্দিষ্ট বিষয়ে পরামর্শের জন্য চেম্বারে যোগাযোগ করুন।

না করা অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন?

থানায় যাওয়ার আগে আমাদের কল করুন। আমরা আগাম জামিন, মামলা খারিজের আবেদন এবং পাল্টা মামলা — সবকিছুই দেখভাল করি।