দেওয়ানি মামলা করার নিয়ম: প্রক্রিয়া, কোর্ট ফি ও কত দিন চলে
টাকা, সম্পত্তি, ঘোষণা বা নিষেধাজ্ঞা চাইতে আদালতে দেওয়ানি মামলা করা হয়। মানুষ যতটা ভাবেন, এটি তার চেয়ে ধীর, তাই ধাপ ও সংক্ষিপ্ত পথগুলো জানা জরুরি। আরজি থেকে ডিক্রি পর্যন্ত পথ, এখানে।
- মূল্যমান ও স্থান অনুযায়ী এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতে আরজি দিয়ে মামলা শুরু হয়।
- আরজিতে কোর্ট ফি দিতে হয়: টাকা ও মূল্যভিত্তিক দাবিতে মূল্যানুপাতিক, কিছু প্রতিকারে নির্দিষ্ট।
- লিখিত জবাবের পর আদালত দেওয়ানি কার্যবিধির ৮৯ক ধারায় মধ্যস্থতায় পাঠাতে পারেন।
- কিছু বিরোধে মামলার আগে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতা বাধ্যতামূলক।
এই গাইডে: কোন আদালতে · ধাপ ও সাধারণ সময় · কোর্ট ফি ও অন্যান্য খরচ
সংক্ষেপে উত্তর
দেওয়ানি মামলা চলে দেওয়ানি কার্যবিধি ১৯০৮ অনুযায়ী। ঘটনা, মামলার কারণ ও চাওয়া প্রতিকার লিখে কোর্ট ফি ও কাগজপত্রসহ আরজি দাখিল করতে হয়। আদালত সমন দেন; বিবাদী লিখিত জবাব দেন। এরপর আদালত মধ্যস্থতার চেষ্টা করেন, বিচার্য বিষয় গঠন করেন, সাক্ষ্য নেন, যুক্তিতর্ক শোনেন এবং রায় ও ডিক্রি দেন।
ডিক্রি মানেই হাতে টাকা নয়। অপর পক্ষ না মানলে ডিক্রি জারির মামলা করতে হয়।
কোন আদালতে
| মামলার মূল্যমান | সাধারণ আদালত |
|---|---|
| ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত | সিভিল জজ (আগের নাম সহকারী জজ) |
| ১৫ লাখ টাকার বেশি থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত | সিনিয়র সিভিল জজ (আগের নাম সিনিয়র সহকারী জজ) |
| ২৫ লাখ টাকার বেশি | যুগ্ম জেলা জজ |
এটি দেওয়ানি আদালত আইন, ১৮৮৭-এর ১৮ ও ১৯ ধারা এবং দেওয়ানি কার্যবিধির ১৫ ধারা (সর্বনিম্ন উপযুক্ত আদালতে মামলা) অনুযায়ী। দেওয়ানি আদালত (সংশোধন) আইন, ২০২৬ সহকারী জজ ও সিনিয়র সহকারী জজের পদনাম ২ নভেম্বর ২০২৫ থেকে সিভিল জজ ও সিনিয়র সিভিল জজ করেছে; সীমা বদলায়নি। কিছু বিরোধ বিশেষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে যায়। মামলা হয় যেখানে বিবাদী থাকেন বা কাজ করেন, যেখানে মামলার কারণ ঘটেছে, অথবা জমির ক্ষেত্রে যেখানে সম্পত্তি অবস্থিত। সরকারের বিরুদ্ধে মামলার আগে সাধারণত দেওয়ানি কার্যবিধির ৮০ ধারায় দুই মাসের নোটিশ লাগে।
ধাপ ও সাধারণ সময়
- আরজি ও কোর্ট ফি: কাগজসহ দাখিল; সমন জারি।
- লিখিত জবাব: আদালতের দেওয়া সময়ের মধ্যে বিবাদীর জবাব।
- মধ্যস্থতা (ধারা ৮৯ক): আদালত মধ্যস্থতায় পাঠাতে পারেন; মীমাংসা হলে মামলা শেষ।
- বিচার্য বিষয়: আদালত কোন প্রশ্নে সিদ্ধান্ত দেবেন তা ঠিক করেন।
- সাক্ষ্য: প্রত্যেক পক্ষের সাক্ষী ও কাগজপত্র।
- যুক্তিতর্ক ও রায়: তারপর ডিক্রি।
প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দেওয়ানি মামলা বিচারিক আদালতে কয়েক বছর চলতে পারে। সময় নির্ভর করে আদালতের মামলার চাপ, সমন জারি, সাক্ষ্য, মুলতবি ও অন্তর্বর্তী কার্যক্রমের ওপর। আপিল ও ডিক্রি জারিতে আরও সময় লাগতে পারে। অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মতো অন্তর্বর্তী প্রতিকার অনেক আগে আসতে পারে।
কোর্ট ফি ও অন্যান্য খরচ
কোর্ট ফি আইন, ১৮৭০ অনুযায়ী কোর্ট ফি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মূল্যানুপাতিক: দাবি করা টাকা বা সম্পত্তির মূল্যের একটি শতাংশ, ফি তফসিল, মূল্য নির্ধারণের নিয়ম এবং প্রযোজ্য ছাড় বা হ্রাসের প্রজ্ঞাপন সাপেক্ষে। কিছু প্রতিকারে, যেমন কিছু ঘোষণামূলক মামলায়, নির্দিষ্ট ফি। এর সঙ্গে আইনজীবীর ফি, সমনের প্রসেস ফি, সার্টিফায়েড কপি, আর প্রয়োজনে কমিশনার বা জরিপের খরচ যোগ হয়। দাবির মূল্য নির্ধারণের পর আমরা লিখিত খরচের হিসাব দিই।
তামাদি যাচাই
তামাদি আইনের সময়ের মধ্যে আছেন কি না নিশ্চিত হোন।
নোটিশ পাঠান
উকিল নোটিশে অনেক সময় মিটে যায়, আর সরকারের বিরুদ্ধে তা বাধ্যতামূলক।
মধ্যস্থতা দেখুন
আপনার বিরোধ ও জেলায় মামলার আগে মধ্যস্থতা প্রযোজ্য কি না দেখুন।
মূল্য নির্ধারণ ও দাখিল
দাবির মূল্য ঠিক করে কোর্ট ফি দিয়ে কাগজসহ দাখিল করুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
দেওয়ানি মামলা করার নিয়ম কী?
আইনজীবীর মাধ্যমে মূল্যমান ও স্থান অনুযায়ী এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতে কোর্ট ফি ও কাগজসহ আরজি দাখিল করুন। আদালত তারপর বিবাদীকে সমন দেন।
দেওয়ানি মামলার কোর্ট ফি কত?
কোর্ট ফি আইন, ১৮৭০ অনুযায়ী বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মূল্যানুপাতিক: দাবির টাকা বা সম্পত্তির মূল্যের একটি শতাংশ, ফি তফসিল, মূল্য নির্ধারণের নিয়ম এবং প্রযোজ্য ছাড় বা হ্রাসের প্রজ্ঞাপন সাপেক্ষে। কিছু প্রতিকারে নির্দিষ্ট ফি।
দেওয়ানি মামলা কত দিন চলে?
প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দেওয়ানি মামলা বিচারিক আদালতে কয়েক বছর চলতে পারে, যা নির্ভর করে আদালতের চাপ, সমন জারি, সাক্ষ্য, মুলতবি ও অন্তর্বর্তী কার্যক্রমের ওপর। আপিল ও ডিক্রি জারিতে সময় বাড়ে; মধ্যস্থতা বা আপসে আগেই শেষ হতে পারে।
কোন আদালতে মামলা করব?
মূল্যমান অনুযায়ী: ১৫ লাখ পর্যন্ত সিভিল জজ (আগের নাম সহকারী জজ), ২৫ লাখ পর্যন্ত সিনিয়র সিভিল জজ, এর বেশি যুগ্ম জেলা জজ। স্থান অনুযায়ী: যেখানে বিবাদী থাকেন, মামলার কারণ ঘটেছে বা জমি অবস্থিত।
দেওয়ানি মামলায় কি মধ্যস্থতা বাধ্যতামূলক?
দেওয়ানি কার্যবিধির ৮৯ক ধারায় লিখিত জবাবের পর আদালত মামলা মধ্যস্থতায় পাঠাতে পারেন। আলাদাভাবে, কিছু বিরোধে মামলার আগে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতা বাধ্যতামূলক।
লিখিত জবাব কী?
আরজির বিরুদ্ধে বিবাদীর আনুষ্ঠানিক জবাব, যেখানে প্রতিটি দাবি স্বীকার বা অস্বীকার করা হয় এবং প্রতিরক্ষা বা পাল্টা দাবি থাকে।
দেওয়ানি রায়ের বিরুদ্ধে কি আপিল করা যায়?
যায়। আদালত ও মূল্যমান অনুযায়ী জেলা জজ বা হাইকোর্ট বিভাগে আপিল হয়। সময়সীমা ছোট, তাই দ্রুত সার্টিফায়েড কপি নিন।
অপর পক্ষ ডিক্রি না মানলে কী করব?
ডিক্রি জারির আবেদন করুন। আদালত দেওয়ানি কার্যবিধির ২১ আদেশ অনুযায়ী সম্পত্তি ক্রোক ও বিক্রি, দখল বুঝিয়ে দেওয়া বা অন্য পদ্ধতিতে ডিক্রি কার্যকর করতে পারেন।
আদালত, মামলা ও টাকা আদায় বিষয়ে আরও পড়ুন
চেক ডিজঅনার, লিগ্যাল নোটিশ ও মামলার আগে মধ্যস্থতা।
চেক ডিজঅনার মামলা (ধারা ১৩৮): নোটিশ, সময়সীমা ও শাস্তির নিয়ম
উকিল নোটিশ লেখার নিয়ম, খরচ ও জবাব
পাওনা টাকা আদায়ের উপায়: নোটিশ, মামলা ও আপস
অনলাইনে মামলার অবস্থা ও কজলিস্ট দেখার নিয়ম
হাইকোর্টে রিট পিটিশন: খরচ ও প্রক্রিয়া
অর্থঋণ মামলা: ঋণগ্রহীতা ও জামিনদারের করণীয়
সালিশনামা লেখার নিয়ম ও সালিশি আইন
সরকারি আইনগত সহায়তা: কারা পাবেন, কীভাবে আবেদন
লিগ্যাল নোটিশের কাঠামো: টাকা ও চেক আদায়ের দাবি
মামলার আগে বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা: ২০২৬ সালে যা বদলাল
মামলা করার কথা ভাবছেন, নাকি মামলার সমন পেয়েছেন?
কাগজ পাঠান। দাবির মূল্য, তামাদি যাচাই করে আমরা পরিকল্পনা ও খরচের হিসাব দিই। লিখিত প্রাথমিক মূল্যায়ন বিনামূল্যে।

মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।