চুক্তিপত্র লেখার নিয়ম: বৈধতা, স্ট্যাম্প শুল্ক ও রেজিস্ট্রেশন
বাংলাদেশে বেশিরভাগ ব্যবসায়িক ও পারিবারিক লেনদেন শেষে স্ট্যাম্পে ওঠে: বন্ধুকে ধার, দোকান ভাড়া, অংশীদারি, জমি বিক্রির বায়না। অনেক চুক্তিই পরে অকার্যকর প্রমাণিত হয় ভুল স্ট্যাম্প, রেজিস্ট্রি না করা বা অস্পষ্ট ভাষার কারণে। এখানে আছে চুক্তি কিসে বৈধ হয়, কখন রেজিস্ট্রি করতে হয়, আর চুক্তিপত্রে কী লেখা উচিত।
- স্ট্যাম্প চুক্তিকে বৈধ করে না; সম্মতি ও প্রতিদান করে
- কম স্ট্যাম্পের চুক্তি শুল্ক ও জরিমানা না দেওয়া পর্যন্ত সাক্ষ্য হিসেবে গৃহীত হয় না
- জমি বিক্রির বায়নানামা ৬০ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রি করতে হয়
- এক বছরের বেশি মেয়াদের লিজ রেজিস্ট্রি বাধ্যতামূলক
এই গাইডে: চুক্তি আইনগতভাবে বৈধ হয় কিসে · কোন চুক্তি রেজিস্ট্রি করতে হয় · কত টাকার স্ট্যাম্প লাগে · প্রতিটি চুক্তিপত্রে যে শর্ত থাকা উচিত · অংশীদারি চুক্তিপত্র, অঙ্গীকারনামা ও ধার
সংক্ষেপে উত্তর
চুক্তি আইন ১৮৭২ অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কের পক্ষগণ স্বেচ্ছায়, বৈধ প্রতিদান ও বৈধ উদ্দেশ্যে রাজি হলে চুক্তি বৈধ। স্ট্যাম্প হলো করের বিষয়, বৈধতার নয়: স্ট্যাম্প আইন ১৮৯৯ অনুযায়ী প্রতিটি ধরনের চুক্তিতে স্ট্যাম্প শুল্ক লাগে, আর কম স্ট্যাম্পের দলিল শুল্ক ও জরিমানা না দেওয়া পর্যন্ত আদালতে ব্যবহার করা যায় না। কিছু চুক্তি রেজিস্ট্রিও করতে হয়, যেমন জমি বিক্রির বায়নানামা ৬০ দিনের মধ্যে, আর এক বছরের বেশি মেয়াদের লিজ।
চুক্তি আইনগতভাবে বৈধ হয় কিসে
- স্বাধীন সম্মতি সব পক্ষের, জোরজবরদস্তি, প্রতারণা বা ভুল উপস্থাপন ছাড়া।
- যোগ্য পক্ষ: প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কের; কোম্পানির ক্ষেত্রে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি।
- বৈধ প্রতিদান ও উদ্দেশ্য: বিনিময়ে কিছু দেওয়া, আইনসম্মত উদ্দেশ্যে।
- স্পষ্টতা: শর্তগুলো এমন স্পষ্ট হতে হবে যাতে কার্যকর করা যায়।
মৌখিক চুক্তিও বৈধ হতে পারে, তবে প্রমাণ করা কঠিন। লিখে রাখুন।
কোন চুক্তি রেজিস্ট্রি করতে হয়
| চুক্তি | রেজিস্ট্রেশন |
|---|---|
| জমি বা ফ্ল্যাট বিক্রির বায়নানামা | বাধ্যতামূলক, সইয়ের ৬০ দিনের মধ্যে |
| এক বছরের বেশি মেয়াদের স্থাবর সম্পত্তির লিজ | বাধ্যতামূলক |
| বিক্রি বা উন্নয়নের অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি | বাধ্যতামূলক |
| এক বছর বা কম মেয়াদের ভাড়ার চুক্তি | বাধ্যতামূলক নয় |
| অংশীদারি চুক্তিপত্র | আরজেএসসিতে ঐচ্ছিক, তবে নিবন্ধনহীন ফার্ম বাইরের পক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে না |
| ঋণ, সেবা বা সরবরাহ চুক্তি | বাধ্যতামূলক নয় |
নোটারি করা মানে রেজিস্ট্রি নয়। নোটারি শুধু সই সত্যায়ন করেন।
কত টাকার স্ট্যাম্প লাগে
স্ট্যাম্প আইন ১৮৯৯-এর তফসিল অনুযায়ী দলিলের ধরনভেদে স্ট্যাম্প শুল্ক ভিন্ন, আর কিছু ক্ষেত্রে টাকার অঙ্কের ওপর নির্ভর করে। অর্থ আইনের মাধ্যমে হার বদলায়, তাই সইয়ের আগে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস বা আইনজীবীর কাছ থেকে বর্তমান অঙ্ক জেনে নিন। দলিলে স্ট্যাম্প কম থাকলে ঘাটতি ও জরিমানা না দেওয়া পর্যন্ত আদালত তা সাক্ষ্য হিসেবে নেন না (ধারা ৩৫)। শুরুতেই সঠিক শুল্ক দেওয়া সস্তা।
প্রতিটি চুক্তিপত্রে যে শর্ত থাকা উচিত
- পক্ষগণের পূর্ণ নাম, বাবার নাম, ঠিকানা ও জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর।
- সইয়ের তারিখ ও স্থান।
- প্রত্যেক পক্ষ কী করবেন, কবের মধ্যে, আর মূল্য বা অঙ্ক।
- কীভাবে ও কবে পরিশোধ, এবং রসিদ।
- দেরি বা চুক্তিভঙ্গ হলে কী হবে, টাকা ফেরত বা জরিমানার শর্তসহ।
- চুক্তি কীভাবে শেষ করা যাবে।
- বিরোধ কীভাবে মিটবে: আলোচনা, মধ্যস্থতা, সালিশ বা আদালত।
- প্রতিটি পৃষ্ঠায় সব পক্ষের সই, আর ঠিকানাসহ দুজন সাক্ষী।
অংশীদারি চুক্তিপত্র, অঙ্গীকারনামা ও ধার
- অংশীদারি চুক্তিপত্র: মূলধন, লাভের ভাগ, ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকের স্বাক্ষরকারী, অংশীদার যোগ ও বের হওয়া এবং বিলুপ্তি। গ্রাহকের বিরুদ্ধে মামলার প্রয়োজন হতে পারলে ফার্ম আরজেএসসিতে নিবন্ধন করুন।
- অঙ্গীকারনামা: এক পক্ষের প্রতিশ্রুতি। প্রতিদান থাকলে বা চুক্তির অংশ হলে কার্যকর; নইলে মূলত প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগে।
- বন্ধু বা আত্মীয়কে ধার: অঙ্ক, পরিশোধের তারিখ ও জামানত লিখুন। জামানত হিসেবে দেওয়া চেক ডিজঅনার হলে চেক ডিজঅনার মামলা করা যায়।
শর্ত ঠিক করুন
কে, কী, কবে, কত, আর না হলে কী।
সঠিক স্ট্যাম্প
এই ধরনের দলিলের শুল্ক।
সই ও সাক্ষী
সব পক্ষ ও দুজন সাক্ষী।
প্রয়োজনে রেজিস্ট্রি
৬০ দিনের মধ্যে বায়নানামা; দীর্ঘ লিজ।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
চুক্তিপত্র লেখার নিয়ম কী?
জাতীয় পরিচয়পত্রসহ পক্ষগণ, বিষয়, মূল্য ও পরিশোধ, সময়সীমা, চুক্তিভঙ্গে কী হবে ও বিরোধ নিষ্পত্তির উপায় লিখে সঠিক মূল্যের স্ট্যাম্পে দুজন সাক্ষীর সামনে সই করুন।
স্ট্যাম্পে চুক্তিপত্র কি আইনত বৈধ?
পক্ষগণ স্বেচ্ছায়, বৈধ প্রতিদান ও উদ্দেশ্যে রাজি হলে বৈধ। স্ট্যাম্প শুধু শুল্ক পরিশোধ; নিজে থেকে বৈধতা দেয় না।
চুক্তিপত্রে কত টাকার স্ট্যাম্প লাগে?
স্ট্যাম্প আইন অনুযায়ী দলিলের ধরন ও কখনো টাকার অঙ্কের ওপর নির্ভর করে। সইয়ের আগে বর্তমান হার জেনে নিন।
জমি বিক্রির বায়নানামা কি রেজিস্ট্রি করতে হয়?
হ্যাঁ। সইয়ের ৬০ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রি করতে হয়।
ভাড়ার চুক্তি কি রেজিস্ট্রি করতে হয়?
লিজ এক বছরের বেশি মেয়াদের হলেই কেবল।
অংশীদারি চুক্তিপত্র কি?
মূলধন, লাভের ভাগ, ব্যবস্থাপনা ও বের হওয়া নিয়ে অংশীদারদের লিখিত চুক্তি। আরজেএসসিতে ফার্ম নিবন্ধন করলে বাইরের পক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করা যায়।
অঙ্গীকারনামা কি?
এক পক্ষের লিখিত প্রতিশ্রুতি। প্রতিদান থাকলে বা চুক্তির অংশ হলে কার্যকর; নইলে মূলত প্রমাণ।
নোটারি করলে কি চুক্তি রেজিস্ট্রি হয়?
না। নোটারি সই সত্যায়ন করেন। রেজিস্ট্রি হয় শুধু সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে।
কাগজপত্র ও প্রবাসী বিষয়ে আরও পড়ুন
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি ও প্রবাসীদের কাগজপত্র।
শিগগির কোনো চুক্তিতে সই করছেন?
আমরা চুক্তি লিখি ও যাচাই করি, স্ট্যাম্প শুল্ক নিয়ে পরামর্শ দিই এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনে রেজিস্ট্রি করাই। লিখিত প্রাথমিক মূল্যায়ন বিনামূল্যে।

মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।