বাটোয়ারা মামলা: কতদিন চলে, কত খরচ, কীভাবে করবেন
যৌথ জমির মালিকেরা ভাগ নিয়ে একমত না হলে যেকোনো একজন দেওয়ানি আদালতে জমি ভাগ করে দেওয়ার মামলা করতে পারেন। এটাই বাটোয়ারা মামলা। বাংলাদেশে এটি সবচেয়ে বেশি হওয়া জমির মামলা, আর প্রায়ই সবচেয়ে ধীর। তাই শুরুর আগে ধাপ ও খরচ বুঝে নেওয়া লাভজনক।
- যেকোনো সহ-মালিক, ওয়ারিশ বা অবিভক্ত অংশের ক্রেতা, মামলা করতে পারেন
- দখলে থাকা বাদী নির্ধারিত সামান্য কোর্ট ফি দেন; দখলচ্যুত বাদী অংশের মূল্যের ওপর
- দুই ডিক্রি: প্রাথমিক ডিক্রিতে অংশ, চূড়ান্ত ডিক্রিতে জমি
- প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মামলা প্রায়ই কয়েক বছর চলে; আপোষ দ্রুত
এই গাইডে: বাটোয়ারা মামলা কি এবং কে করতে পারে? · বাটোয়ারা মামলা কোথায় করতে হয় ও কি কি কাগজ লাগে · বাটোয়ারা মামলার কোর্ট ফি ও মোট খরচ · বাটোয়ারা মামলার ধাপ: শুরু থেকে শেষ · বাটোয়ারা মামলা কতদিন চলে? · মামলা চলাকালে: নিষেধাজ্ঞা, বিক্রি, অগ্রক্রয় ও আপোষ
সংক্ষেপে উত্তর
বাটোয়ারা মামলা হলো দেওয়ানি মামলা, যেখানে একজন সহ-মালিক আদালতকে যৌথ জমি ভাগ করে প্রত্যেককে আলাদা ছাহাম দেওয়ার আবেদন করেন। সব সহ-মালিককে পক্ষ করতে হয়। আদালত প্রথমে প্রাথমিক ডিক্রি দিয়ে প্রত্যেকের অংশ ঠিক করেন, তারপর অ্যাডভোকেট কমিশনার জমি মেপে ভাগের প্রস্তাব দেন, আর আদালত চূড়ান্ত ডিক্রি দেন। দখলে থাকা বাদী সামান্য নির্ধারিত কোর্ট ফি দেন; দখলচ্যুত বাদী অংশের মূল্যের ওপর ফি দেন। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মামলা প্রায়ই কয়েক বছর চলে।
বাটোয়ারা মামলা কি এবং কে করতে পারে?
বাটোয়ারা মামলা যৌথ মালিকানার অবসান চায়। ওয়ারিশরা বা অবিভক্ত অংশের ক্রেতারা যখন স্বেচ্ছায় বণ্টননামা করতে একমত হন না, তখন এই মামলা লাগে।
- কে করতে পারেন: যেকোনো সহ-মালিক, ওয়ারিশ হোন বা অবিভক্ত অংশের ক্রেতা।
- কাদের পক্ষ করতে হয়: সম্পত্তির সব সহ-মালিককে। একজন বাদ পড়লে ডিক্রি অসম্পূর্ণ হতে পারে।
- প্রত্যেক পক্ষই দাবি করতে পারেন: বাটোয়ারা মামলায় বিবাদীও আলাদা ছাহাম চাইতে পারেন, তাই কার্যত প্রত্যেকেই বাদী ও বিবাদী দুটোই।
- কী অন্তর্ভুক্ত হবে: সব যৌথ জমি, সম্ভব হলে এক মামলায়, যাতে আদালত পুরো চিত্র দেখে ন্যায্যভাবে ভাগ করতে পারেন।
বাটোয়ারা মামলা আর স্বত্বের মামলা এক নয়। বাটোয়ারা মামলা যৌথভাবে মালিকানাধীন জমি ভাগ করে; স্বত্বের মামলা ঠিক করে জমির মালিক আদৌ কে। মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে আদালত প্রাথমিক ডিক্রির পর্যায়েই তা নিষ্পত্তি করেন।
সহ-মালিক থাকা অবস্থায় বাটোয়ারা মামলার সাধারণত নির্দিষ্ট তামাদি নেই। তবে কোনো শরিক বহু বছর প্রকাশ্যে আপনাকে বাদ দিয়ে দখল করলে তিনি বিরুদ্ধ দখলের দাবি তুলতে পারেন, তাই দেরি করবেন না।
বাটোয়ারা মামলা কোথায় করতে হয় ও কি কি কাগজ লাগে
জমি যে এলাকায়, সেই এলাকার দেওয়ানি আদালতে, আরজিতে দেখানো মূল্যমান অনুযায়ী উপযুক্ত স্তরে মামলা করতে হয়। ২০২১ সালের সংশোধনের পর সিভিল জজ (আগের নাম সহকারী জজ) ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত, সিনিয়র সিভিল জজ (আগের নাম সিনিয়র সহকারী জজ) তার ওপরে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত, আর যুগ্ম জেলা জজ ২৫ লাখ টাকার বেশি মূল্যমানের মামলা শোনেন।
যেসব জেলায় বাধ্যতামূলক মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা চালু, সেখানে সিভিল জজ আদালতের এখতিয়ারভুক্ত বাটোয়ারা বিরোধ আগে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে নিতে হয়। মামলার আগে খোঁজ নিন।
সাধারণত যে কাগজ লাগে:
- সিএস, এসএ, আরএস বা বিএস খতিয়ানের কপি ও মৌজা নকশা
- প্রত্যেক মালিক যে দলিলে জমি পেয়েছেন সেগুলো ও সার্টিফাইড কপি
- ওয়ারিশি জমির জন্য ওয়ারিশ সনদ ও বংশতালিকা; দেখুন ওয়ারিশ সনদ গাইড
- নামজারি খতিয়ান, ডিসিআর ও ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ
- সব সহ-মালিকের নাম ও ঠিকানা
- আগের কোনো আপোষ, খসড়া নকশা বা সালিশের কাগজ
বাটোয়ারা মামলার কোর্ট ফি ও মোট খরচ
| খরচ | কী আশা করবেন |
|---|---|
| কোর্ট ফি, দখলে থাকা বাদী | কোর্ট-ফি আইনের দ্বিতীয় তফসিলে নির্ধারিত ফি (বর্তমান তফসিলে ৩০০ টাকা) |
| কোর্ট ফি, দখলচ্যুত বাদী | দাবিকৃত অংশের বাজারমূল্যের ওপর অ্যাড ভ্যালোরেম (ধারা ৭(৬ক)), মূল্য বাড়লে ফিও বাড়ে |
| অ্যাডভোকেট কমিশনার | আদালত নির্ধারিত ফি, সাধারণত পক্ষগণ ভাগ করে দেন |
| সার্টিফাইড কপি, জরিপ, প্রসেস ফি | ছোট অঙ্ক, তবে দীর্ঘ মামলায় জমে বড় হয় |
| চূড়ান্ত ডিক্রির স্ট্যাম্প | চূড়ান্ত ডিক্রি পক্ষগণের খরচে স্ট্যাম্পে লেখা হয় |
| আইনজীবীর ফি | আইনজীবী, আদালত ও মামলা কতটা লড়াই হয় তার ওপর নির্ভর করে |
কোর্ট ফি সাধারণত বড় খরচ নয়। আসল খরচ সময়: অনেক তারিখ, কমিশনের রিপোর্টে আপত্তি, আর আপিল। আইনজীবীর কাছে এক অঙ্কের বদলে ধাপভিত্তিক লিখিত খরচের হিসাব চান।
বাটোয়ারা মামলার ধাপ: শুরু থেকে শেষ
- আরজি। সম্পত্তির বিবরণ, মালিকানার ধারাবাহিকতা, প্রত্যেকের অংশ ও চাওয়া ছাহাম।
- সমন ও জবাব। বিবাদীরা লিখিত জবাব দেন এবং নিজের ছাহাম দাবি করতে পারেন।
- মধ্যস্থতা। লিখিত জবাবের পর আদালত মামলা মধ্যস্থতায় পাঠাতে পারেন।
- বিচার্য বিষয়, সাক্ষ্য ও শুনানি। মালিকানা ও অংশ নিয়ে কাগজপত্র ও সাক্ষী।
- প্রাথমিক ডিক্রি (আদেশ ২০ বিধি ১৮)। কে কত অংশের মালিক, আদালত তা ঘোষণা করেন।
- অ্যাডভোকেট কমিশনার (আদেশ ২৬ বিধি ১৩)। কমিশনার সরেজমিনে মেপে ছাহাম প্রস্তাব করেন, ন্যায্য হলে প্রত্যেকের বাড়িঘর ও বিদ্যমান দখল বজায় রেখে। পক্ষগণ রিপোর্টে আপত্তি দিতে পারেন।
- চূড়ান্ত ডিক্রি। আদালত রিপোর্ট গ্রহণ বা সংশোধন করে প্রত্যেককে নির্দিষ্ট জমি বুঝিয়ে দেন।
- জারি। কেউ ছাহাম ছেড়ে না দিলে ডিক্রিদার দখল বুঝে পেতে জারি মামলা করেন।
জমি যুক্তিসঙ্গতভাবে ভাগ করা না গেলে বাটোয়ারা আইন ১৮৯৩ অনুযায়ী আদালত বিক্রির আদেশ দিতে পারেন, আর অন্য শরিকেরা মূল্য নির্ধারণ করে কিনে নিতে পারেন। প্রাথমিক ও চূড়ান্ত ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিল হতে পারে।
বাটোয়ারা মামলা কতদিন চলে?
নির্দিষ্ট সময় নেই। সবাই অংশ ও কমিশনারের রিপোর্ট মেনে নিলে মামলা অনেক আগে শেষ হতে পারে। অনেক ওয়ারিশ, বিতর্কিত দলিল বা কমিশন রিপোর্টে আপত্তি থাকলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মামলা সাধারণত কয়েক বছর চলে, আপিল হলে আরও বেশি।
যা মামলা ধীর করে:
- পক্ষ বাদ পড়া, বিশেষ করে মামলা চলাকালে মারা যাওয়া ওয়ারিশদের স্থলাভিষিক্ত করা
- দলিল বা রেকর্ড নিয়ে বিরোধ
- বারবার সময় নেওয়া ও আইনজীবীর অনুপস্থিতি
- কমিশন রিপোর্টে আপত্তি
যা দ্রুত করে: প্রথম দিন থেকে সম্পূর্ণ বংশতালিকা, মামলার আগেই সার্টিফাইড কাগজ প্রস্তুত, সব সহ-মালিককে পক্ষ করা, প্রতিটি তারিখে হাজির থাকা, আর একমত অংশগুলো আগেই মিটিয়ে ফেলা। বেশিরভাগ ওয়ারিশ রাজি হলে আপোষ ডিক্রি বা রেজিস্টার্ড বণ্টননামায় মামলা শেষ করা যায়।
মামলা চলাকালে: নিষেধাজ্ঞা, বিক্রি, অগ্রক্রয় ও আপোষ
- নিষেধাজ্ঞা। কোনো শরিক যৌথ জমিতে স্থাপনা তুললে বা নির্দিষ্ট দাগ বিক্রি করলে আদালতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা বা স্থিতাবস্থার আদেশ চাইতে পারেন।
- মামলা চলাকালে বিক্রি। সহ-মালিক তাঁর অবিভক্ত অংশ বিক্রি করতে পারেন, তবে ক্রেতা চূড়ান্ত ডিক্রি মানতে বাধ্য। অন্যদের ক্ষতি না হলে আদালত প্রায়ই ক্রেতার কেনা জমি বিক্রেতার ছাহামে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
- অগ্রক্রয়। অবিভক্ত কৃষি অংশ বাইরের কারও কাছে বিক্রি হলে উত্তরাধিকার সূত্রে শরিক আলাদা অগ্রক্রয় মামলা করতে পারেন, সময়সীমা ২ মাস।
- পারিবারিক বসতবাড়ি। অবিভক্ত পারিবারিক বাড়ির অংশ বাইরের কেউ কিনে বাটোয়ারা চাইলে পরিবারের শরিক মূল্য নির্ধারণ করে সেই অংশ কিনে নিতে পারেন।
- মামলা চলাকালে নামজারি। নামজারি মালিকানা ঠিক করে না। এসি ল্যান্ডকে চলমান মামলার কথা জানান।
- আপোষ। যেকোনো পর্যায়ে আপোষ ডিক্রি বা রেজিস্টার্ড বণ্টননামা করে মীমাংসা করা যায়।
কাগজ প্রস্তুত
খতিয়ান, দলিল, ওয়ারিশ সনদ ও বংশতালিকা।
দায়ের ও সমন
সঠিক আদালত, সব সহ-মালিক পক্ষ, সঠিক কোর্ট ফি।
প্রাথমিক ডিক্রি
আদালত প্রত্যেকের অংশ ঠিক করেন।
চূড়ান্ত ডিক্রি
কমিশনারের ছাহাম, তারপর জমি ও দখল।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বাটোয়ারা মামলা কতদিন চলে?
নির্দিষ্ট সময় নেই। সবাই একমত হলে দ্রুত শেষ হতে পারে, কিন্তু অনেক ওয়ারিশ, বিতর্কিত দলিল বা কমিশন রিপোর্টে আপত্তি থাকলে মামলা প্রায়ই কয়েক বছর চলে, আপিলে আরও সময় লাগে।
বাটোয়ারা মামলা কি?
যৌথ জমি সহ-মালিকদের মধ্যে ভাগ করে প্রত্যেককে আলাদা অংশ দেওয়ার দেওয়ানি মামলা। আদালত প্রথমে প্রাথমিক ডিক্রিতে অংশ ঠিক করেন, পরে চূড়ান্ত ডিক্রিতে জমি বুঝিয়ে দেন।
বাটোয়ারা মামলা করার নিয়ম কী?
খতিয়ান, দলিল, ওয়ারিশ সনদ ও বংশতালিকা জোগাড় করুন, আপনার জেলায় মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা লাগে কি না দেখুন, তারপর জমির এলাকার দেওয়ানি আদালতে সব সহ-মালিককে পক্ষ করে সঠিক কোর্ট ফি দিয়ে আরজি দাখিল করুন।
বাটোয়ারা মামলার কোর্ট ফি কত?
যৌথ জমির দখলে থাকলে কোর্ট-ফি আইনে নির্ধারিত সামান্য ফি দিতে হয়। দখল থেকে বাদ পড়ে থাকলে আপনার অংশের বাজারমূল্যের ওপর ফি হিসাব হয়।
বাটোয়ারা মামলা করতে কি কি কাগজ লাগে?
খতিয়ানের কপি ও মৌজা নকশা, দলিল ও সার্টিফাইড কপি, ওয়ারিশ সনদ ও বংশতালিকা, নামজারি কাগজ ও খাজনার রসিদ, আর সব সহ-মালিকের নাম-ঠিকানা।
বাটোয়ারা মামলা চলাকালে কি জমি বিক্রি করা যায়?
সহ-মালিক তাঁর অবিভক্ত অংশ বিক্রি করতে পারেন, তবে ক্রেতা চূড়ান্ত ডিক্রি মানতে বাধ্য। ভাগ হয়ে গেছে ধরে নির্দিষ্ট দাগ বিক্রি করলে অন্য শরিকেরা নিষেধাজ্ঞা চাইতে পারেন।
বাটোয়ারা মামলার তামাদি আছে কি?
সহ-মালিক থাকা অবস্থায় সাধারণত নেই। তবে অন্য শরিক দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে আপনাকে দখল থেকে বাদ রাখলে বিরুদ্ধ দখলের দাবি তুলতে পারেন, তাই বেশি দেরি করবেন না।
বাটোয়ারা মামলা আর স্বত্বের মামলার পার্থক্য কী?
বাটোয়ারা মামলা পক্ষগণের যৌথ মালিকানার জমি ভাগ করে। স্বত্বের মামলায় আদালত ঘোষণা করেন জমির মালিক কে। সহ-মালিকদের মধ্যে মালিকানা বিরোধ বাটোয়ারা মামলার ভেতরেই অংশ ঠিক করার আগে নিষ্পত্তি হয়।
জমি ও সম্পত্তি বিষয়ে আরও পড়ুন
নিরাপদে জমি কেনা, নামজারি ও বেদখল জমি উদ্ধার।
বাটোয়ারা মামলার কথা ভাবছেন?
আমরা আগে মালিকানার ধারাবাহিকতা ও অংশ যাচাই করি, তারপর বলি বণ্টননামা, মধ্যস্থতা না মামলা, কোনটায় দ্রুত সমাধান হবে। লিখিত প্রাথমিক মূল্যায়ন বিনামূল্যে।

মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।