অনিবাসী বাংলাদেশি ও বিদেশি নাগরিকের আয়কর ২০২৬: আবাসিকতা, হার, রেমিট্যান্স ও চুক্তির সুবিধা
বাংলাদেশ আপনাকে কর করবে কি না, কোন হারে, তা নির্ভর করে দুটি প্রশ্নে যা লোকে নিয়মিত ভুল করে: বছরটিতে আপনি নিবাসী কি না, আর আয়টি বাংলাদেশ-উৎসের কি না। দুবাইয়ে কর্মরত বাংলাদেশি, চট্টগ্রামে দুই বছরের পোস্টিংয়ে আসা বিদেশি প্রকৌশলী, আর গুলশানে ফ্ল্যাটওয়ালা লন্ডনবাসী প্রবাসী — আয়কর আইন ২০২৩-এ তিনটি আলাদা ঘটনা। এই গাইড তাদের ধারাসহ আলাদা করেছে, আর প্রত্যেকের কী দাখিল করতে হয় দেখিয়েছে।
- নিবাসী = আয়বর্ষে বাংলাদেশে ১৮৩ দিন বা তার বেশি, অথবা ওই বছরে ৯০ দিন ও আগের চার বছরে ৩৬৫ দিন (ধারা ২(৪৫))। নিবাসীর বিশ্বব্যাপী আয়ে কর; অনিবাসীর শুধু বাংলাদেশে উদ্ভূত আয়ে।
- অনিবাসী বিদেশি নাগরিক বাংলাদেশের আয়ে সরাসরি ৩০% দেন; অনিবাসী বাংলাদেশি সাধারণ স্ল্যাবে (করমুক্ত ৪ লাখ, ১০% থেকে ৩০%), অর্থ আইন ২০২৬-এর তফসিল অনুযায়ী।
- ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠানো মজুরি-রেমিট্যান্স প্রাপকের হাতে করমুক্ত, সঙ্গে সরকারের ২.৫% প্রণোদনা; অনিবাসী থাকাকালে প্রেরকের বিদেশি বেতন বাংলাদেশের জালের বাইরে।
- বাংলাদেশে স্থায়ী ঘাঁটিহীন অনিবাসী স্বাভাবিক ব্যক্তির রিটার্ন লাগে না (ধারা ১৬৬(২)(জ)); কিন্তু এখানে ভাড়া, সুদ, লভ্যাংশ বা জমি থাকা প্রবাসী রিটার্ন দেন, আর চুক্তির সুবিধা, কর আবাসিকতা সনদ ও দেশত্যাগের ছাড়পত্রের নিজস্ব পদ্ধতি আছে।
এই গাইডে: আবাসিকতার পরীক্ষা, তারিখ কেন জরুরি · হার: কে কত দেন · রেমিট্যান্স: অব্যাহতি ও প্রণোদনা · চুক্তির সুবিধা, TRC ও TCC · বাংলাদেশে সম্পদ থাকা প্রবাসীর যা করতে হয়
সংক্ষেপে উত্তর
আইন নিবাসীর যেখানেই উদ্ভূত মোট আয়ে (ধারা ২৭) আর অনিবাসীর কেবল বাংলাদেশে উপচিত, উদ্ভূত বা প্রাপ্ত (বা তা গণ্য) আয়ে কর করে। আবাসিকতা নিছক দিন-গণনা: আয়বর্ষে (১ জুলাই–৩০ জুন) ১৮৩ দিন, অথবা ওই বছরে ৯০ দিন ও আগের চার বছরে মিলিয়ে ৩৬৫ দিন। নাগরিকত্ব আবাসিকতায় অপ্রাসঙ্গিক কিন্তু হারে প্রাসঙ্গিক: বাংলাদেশি নন এমন অনিবাসী করমুক্ত সীমা ছাড়া সরাসরি ৩০% দেন; অনিবাসী বাংলাদেশি সাধারণ স্ল্যাব হারে। ওয়ার্ক পারমিটে এখানে কর্মরত বিদেশি নাগরিক প্রথম বছরের পরে প্রায় সবসময় নিবাসী, আর বাসস্থান ও সুবিধাসহ পুরো বেতন প্যাকেজে কর দেন।
আবাসিকতার পরীক্ষা, তারিখ কেন জরুরি
১ জুলাই থেকে ৩০ জুনের মধ্যে বাংলাদেশে সশরীরে থাকা দিন গুনুন। আগমন ও প্রস্থানের দিন দুটোই গোনা হয়। পোস্টিংয়ে ১ জানুয়ারি নামা ব্যক্তি প্রথম বছর অনিবাসী (সর্বোচ্চ ১৮১ দিন), পরের বছর থেকে নিবাসী। ৯০ দিনের শাখা ঘন ঘন আসা লোকদের ধরে: বছরে তিন মাস এখানে কাটানো প্রবাসী, আগের চার বছরও তা-ই করে থাকলে, নিবাসী, আর বিশ্বব্যাপী আয় করযোগ্য হয়। পাসপোর্টের সিল ও বিমানের রেকর্ড রাখুন; রিটার্নে অনিবাসিতা দাবি করলে সার্কেল তা চায়। একই বছরে দুই দেশে নিবাসী ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট চুক্তির টাই-ব্রেকার দেখেন (স্থায়ী বাসস্থান, জীবনস্বার্থের কেন্দ্র, অভ্যাসগত বাস, নাগরিকত্ব)।
হার: কে কত দেন
| অবস্থা | কোন আয়ে কর | হার | রিটার্ন লাগে? |
|---|---|---|---|
| নিবাসী (যেকোনো নাগরিকত্ব) | বিশ্বব্যাপী | স্ল্যাব: ৪ লাখ করমুক্ত, তারপর ১০%, ১৫%, ২০%, ২৫%, ৩০%; ন্যূনতম কর ৫,০০০ টাকা | সীমার ওপরে আয় বা ধারা ১৬৬-এর তালিকায় থাকলে হ্যাঁ |
| অনিবাসী বাংলাদেশি | শুধু বাংলাদেশ-উৎস | স্ল্যাব হার (অর্থ আইন ২০২৬) | বাংলাদেশের আয় করযোগ্য হলে বা ধারা ২৬৪-এর PSR লাগলে (সম্পত্তি, ব্যাংক, জমি) হ্যাঁ |
| অনিবাসী বিদেশি নাগরিক | শুধু বাংলাদেশ-উৎস | সরাসরি ৩০%, করমুক্ত সীমা নেই, রেয়াত নেই | এখানে স্থায়ী ঘাঁটি না থাকলে ও উৎসে কর কাটা হলে না (ধারা ১৬৬(২)(জ)); নইলে হ্যাঁ |
বাংলাদেশে স্থায়ী ঘাঁটিহীন অনিবাসীর রিটার্ন লাগে না, আর তাঁর কাছ থেকে কাটা কর চূড়ান্ত। ২০২৬ থেকে বাংলাদেশে ১,০০,০০০ বা তার বেশি অনলাইন গ্রাহক বা সাবস্ক্রাইবারওয়ালা অনিবাসীর ডিজিটাল স্থায়ী ঘাঁটি গণ্য হয়; চুক্তিভুক্ত দেশের ব্যক্তির আবাসিকতা ও স্থায়ী ঘাঁটি চুক্তি অনুযায়ী ঠিক হয়। অনিবাসীকে পরিশোধে উৎসে কর (ধারা ১১৯) সাধারণত চূড়ান্ত, বেশির ভাগ সেবায় ২০%, লভ্যাংশসহ কয়েকটি শ্রেণিতে ৩০%, আর আগে এনবিআরের সনদ নিলে চুক্তির হার। বাংলাদেশি কোম্পানির দেওয়া বিদেশি পরামর্শকের বিষয় তাই সাধারণত কোম্পানির কর্তনেই শেষ; কম চুক্তি-হার প্রয়োগে কোম্পানিকে আগে এনবিআরের সনদ নিতে হয়।
রেমিট্যান্স: অব্যাহতি ও প্রণোদনা
অনিবাসী থাকাকালে প্রবাসীর বিদেশে অর্জিত টাকা বাংলাদেশের জালের বাইরে; পরিবার যা পায় তা তাদের আয় নয়, আর ব্যাংকিং চ্যানেলের রেমিট্যান্স ষষ্ঠ তফসিলে প্রাপকের হাতে করমুক্ত। মজুরি-রেমিট্যান্সে সরকারের ২.৫% প্রণোদনা চালু আছে। দুটি সতর্কতা। অব্যাহতি বিদেশি উপার্জনের রেমিট্যান্সে: বাংলাদেশের ব্যবসার আয় বিদেশি হিসাবে ঘুরিয়ে “রেমিট্যান্স” নামে ফেরত আনা নিবাসী সুরক্ষিত নন। আর নিবাসী আত্মীয়ের হিসাবে বড় জমা তাঁর সম্পদ বিবরণীতে ব্যাখ্যা চায় (আমাদের IT-10B গাইড দেখুন) — ব্যাংকের রেমিট্যান্স সনদ রাখুন।
চুক্তির সুবিধা, TRC ও TCC
বাংলাদেশের দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি প্রায় ৩৮ থেকে ৪৩টি দেশের সঙ্গে (এনবিআরের তালিকা ও বাস্তবে বলবৎ চুক্তি আলাদা; বর্তমান সংখ্যা আমরা মেলাচ্ছি), যার মধ্যে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র (শুধু জাহাজ), কানাডা, ভারত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, জাপান, কোরিয়া, চীন ও ইউরোপের বেশির ভাগ দেশ। সুবিধা রিটার্নে বিদেশে দেওয়া করের প্রমাণসহ দাবি করতে হয়; উৎসে চুক্তির হারে কর্তনে পরিশোধকারী আগে এনবিআরে সনদের আবেদন করেন। বিদেশি কর কর্তৃপক্ষকে বাংলাদেশের আবাসিকতা প্রমাণ করতে প্রবাসী রিটার্ন ও পাসপোর্টসহ সার্কেলে কর আবাসিকতা সনদের (TRC) আবেদন করেন; কয়েক সপ্তাহ ধরুন। চাকরি শেষে বাংলাদেশ ছাড়া বিদেশির ধারা ১৯৩-এ কর ছাড়পত্র সনদ লাগে (আবেদন tcc.nbr.gov.bd পোর্টালে), বিমান সংস্থা বা ইমিগ্রেশন চাইতে পারে; নিয়োগকর্তার চূড়ান্ত কর্তন ও রিটার্ন তার উপকরণ।
বাংলাদেশে সম্পদ থাকা প্রবাসীর যা করতে হয়
- ফ্ল্যাটের ভাড়া: ২৫% মেরামত ভাতার পরে করযোগ্য বাংলাদেশি আয়; ভাড়াটে উৎসে ৫% কাটেন; রিটার্ন দিন, আর ২০২৬ থেকে কর্তনের ক্রেডিট দাবি করুন।
- এফডিআর ও সঞ্চয়ের সুদ: ব্যাংক ১০% কাটে (কোম্পানিতে ২০%), রিটার্নে ক্রেডিট; হার ১০%-এ রাখতে ব্যাংক PSR চাইবে।
- লভ্যাংশ ও তালিকাভুক্ত শেয়ার: লভ্যাংশে উৎসে কর ১৫% (অর্থ আইন ২০২৬); তালিকাভুক্ত শেয়ারের মুনাফা বছরে ৫০ লাখ পর্যন্ত করমুক্ত, ওপরে ১৫%।
- জমি বা ফ্ল্যাট বিক্রি: রেজিস্ট্রেশনে ধারা ১২৫-এ কর আদায়, এখন চূড়ান্ত নয় বরং ক্রেডিটযোগ্য; আমাদের নির্দিষ্ট আয়ের গাইড দেখুন।
- টিন ও রিটার্ন: এনআইডি বা পাসপোর্টে অনলাইনে টিন নিন; আমাদের দাখিল গাইডের তারিখে রিটার্ন দিন; পাওয়ার অব অ্যাটর্নিতে আত্মীয় বা আমরা দাখিল ও হাজিরা দিতে পারি।
আবাসিকতার মতামত
ভ্রমণ রেকর্ড থেকে বছরের অবস্থা ঠিক করি, দুই দেশ দাবি করলে চুক্তির টাই-ব্রেকারসহ।
রিটার্ন ও ক্রেডিট
ভাড়া, সুদ, লভ্যাংশ ও জমি নিয়ে বাংলাদেশি রিটার্ন, উৎসে কর্তনের ক্রেডিট ও চুক্তির সুবিধা দাবিসহ।
সনদ
বিদেশি কর্তৃপক্ষের জন্য কর আবাসিকতা সনদ; দেশত্যাগী বিদেশির ধারা ১৯৩-এর ছাড়পত্র।
নিয়োগকর্তার দিক
বিদেশি কর্মীর বেতনের উৎসে কর, ওয়ার্ক পারমিটের কর ও চূড়ান্ত রিটার্ন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বাংলাদেশের আয়করে নিবাসী কে?
আয়বর্ষে বাংলাদেশে ১৮৩ দিন বা তার বেশি, অথবা ওই বছরে ৯০ দিন ও আগের চার বছরে ৩৬৫ দিন থাকা ব্যক্তি (আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ২(৪৫))। আবাসিকতায় নাগরিকত্ব প্রাসঙ্গিক নয়।
বিদেশে কর্মরত প্রবাসী কি বিদেশি বেতনে বাংলাদেশে কর দেন?
অনিবাসী থাকাকালে না: শুধু বাংলাদেশ-উৎসের আয়ে কর। ব্যাংকে পাঠানো রেমিট্যান্স প্রাপকের হাতে করমুক্ত, সঙ্গে ২.৫% প্রণোদনা।
বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশির কর হার কত?
অনিবাসী বিদেশি নাগরিক বাংলাদেশের আয়ে সরাসরি ৩০%। নিবাসী হলে (সাধারণত দ্বিতীয় বছর থেকে) পুরো বেতন প্যাকেজসহ বিশ্বব্যাপী আয়ে সাধারণ স্ল্যাব হার।
অনিবাসীকে কি রিটার্ন দিতে হয়?
বাংলাদেশে স্থায়ী ঘাঁটিহীন অনিবাসী স্বাভাবিক ব্যক্তির লাগে না (ধারা ১৬৬(২)(জ))। এখানে ভাড়া, সুদ, লভ্যাংশ বা জমি বিক্রি থাকা প্রবাসীর উৎসে কর্তনের ক্রেডিট ও ব্যাংক-রেজিস্ট্রারের চাওয়া PSR-এর জন্য রিটার্ন দেওয়া উচিত।
দ্বৈত করের সুবিধা কীভাবে দাবি করব?
রিটার্নে, বিদেশে দেওয়া করের প্রমাণসহ, সংশ্লিষ্ট চুক্তিতে। উৎসে কম হারে কর্তনে পরিশোধকারীকে আগে এনবিআরের সনদ নিতে হয়।
বাংলাদেশ থেকে কর আবাসিকতা সনদ কীভাবে পাব?
দাখিল করা রিটার্ন ও পাসপোর্টসহ আপনার কর সার্কেলে আবেদন করুন। কয়েক সপ্তাহ ধরুন।
বাংলাদেশ ছাড়তে বিদেশির কি কর ছাড়পত্র লাগে?
হ্যাঁ, ধারা ১৯৩-এ চাকরি বা ব্যবসায় থেকে দেশ ছাড়া ব্যক্তি ছাড়পত্র সনদ নেন; আবেদন tcc.nbr.gov.bd-তে।
বাংলাদেশে রেমিট্যান্স কি করযোগ্য?
ব্যাংকিং চ্যানেলের মজুরি-রেমিট্যান্স প্রাপকের হাতে করমুক্ত। নিবাসীর বাংলাদেশি আয় বিদেশি হিসাবে ঘুরিয়ে ফেরত আনা এর আওতায় পড়ে না।
কর, ভ্যাট ও কাস্টমস বিষয়ে আরও পড়ুন
আয়কর রিটার্ন, টিন, ভ্যাট ও বিন, মূসক ফরম, কাস্টমস শুল্ক এবং এনবিআরের নোটিশ পেলে করণীয়।
বিদেশে আছেন, বাংলাদেশে আয় বা সম্পত্তি?
আপনি যেখানে আছেন সেখানে থেকেই আমরা আবাসিকতা ঠিক করব, রিটার্ন দেব, সনদ আনব। লিখিত প্রাথমিক মূল্যায়ন বিনামূল্যে।

মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।