সম্পদ বিবরণী (আইটি-১০বি) পূরণের নিয়ম: কারা দেবেন, কী দেখাবেন, অডিটে না পড়ে কীভাবে পূরণ করবেন
আয়কর রিটার্ন ভুল হয় সম্পদ বিবরণীতে। আয়ের অঙ্ক ঠিক লেখা সহজ; কিন্তু সম্পদ ও দায়ের যে তালিকা গত বছরের সঙ্গে, আপনার আয়ের সঙ্গে, আর ব্যাংক ও ভূমি রেজিস্ট্রি এনবিআরকে যা জানায় তার সঙ্গে মিলতে হবে — সেটি সহজ নয়। কারা দেবেন আর আমরা কীভাবে তৈরি করি, এখানে।
- আইটি-১০বি দিতে হবে যদি মোট সম্পদ ৪০ লাখ টাকার বেশি হয়, মোটরগাড়ি থাকে, সিটি কর্পোরেশনে বাড়ি বা ফ্ল্যাট থাকে, বিদেশে কোনো সম্পদ থাকে, বা আপনি শেয়ারহোল্ডার-পরিচালক হন (ধারা ১৬৭)।
- জীবনযাত্রার বিবরণী আইটি-১০বিবি লাগে আয় ৫ লাখ টাকার বেশি হলে, ব্যবসায়িক আয় থাকলে, গাড়ি কিনলে, বা সিটি কর্পোরেশনে গৃহসম্পত্তি থাকলে (ধারা ১৬৮)।
- সম্পদ দেখাতে হয় ক্রয়মূল্যে; গত বছরের সমাপনী অঙ্ক + এ বছরের আয় − খরচ = এ বছরের সমাপনী অঙ্ক — মিলতেই হবে।
- যে ফারাক সিস্টেম ব্যাখ্যা করতে পারে না, তা-ই অডিটে যাওয়ার সবচেয়ে সাধারণ পথ; স্বনির্ধারণী রিটার্ন ১৮০ দিনের মধ্যে একবার সংশোধন করা যায়।
এই গাইডে: কাদের আইটি-১০বি ও আইটি-১০বিবি দিতে হবে · যা আছে তার মূল্য কীভাবে ধরবেন · ঋণ, দান ও মিলানোর হিসাব · মিসম্যাচ, প্রসেসিং ও অডিট — আসলে কী হয়
সংক্ষেপে উত্তর
ধারা ১৬৭ অনুযায়ী আয়বর্ষের শেষে মোট সম্পদ ৪০ লাখ টাকার বেশি হলে, কিংবা বছরের যেকোনো সময় মোটরগাড়ির মালিক হলে, সিটি কর্পোরেশনে বাড়ি বা ফ্ল্যাটে বিনিয়োগ করলে, বাংলাদেশের বাইরে কোনো সম্পদ থাকলে, বা কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার-পরিচালক হলে — ব্যক্তিকে রিটার্নের সঙ্গে সম্পদ ও দায়ের বিবরণী (ফরম আইটি-১০বি) দিতে হয়। সরকারি কর্মচারীরা সব ক্ষেত্রেই দেন। বিবরণীতে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে আপনার যা আছে ও যা দেনা তা ক্রয়মূল্যে লেখা থাকে, আর এনবিআর তা গত বছরেরটির পাশে রেখে পড়ে: ফারাকটি আপনার ঘোষিত আয় থেকে জীবনযাত্রার বিবরণীর খরচ বাদ দিয়ে মিলতে হবে। না মিললে রিটার্ন চিহ্নিত হয়।
কাদের আইটি-১০বি ও আইটি-১০বিবি দিতে হবে
| বিবরণী | যেকোনো একটি হলেই লাগবে |
|---|---|
| আইটি-১০বি সম্পদ ও দায় (ধারা ১৬৭) | ৩০ জুনে মোট সম্পদ ৪০ লাখ টাকার বেশি; বছরের যেকোনো সময় মোটরগাড়ির মালিক; সিটি কর্পোরেশনে গৃহসম্পত্তি বা অ্যাপার্টমেন্টে বিনিয়োগ; বিদেশে কোনো সম্পদ; কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার-পরিচালক; সরকারি কর্মচারী |
| আইটি-১০বিবি জীবনযাত্রার খরচ (ধারা ১৬৮) | মোট আয় ৫ লাখ টাকার বেশি; মোটরগাড়ি কিনেছেন; ব্যবসা থেকে কোনো আয়; শেয়ারহোল্ডার-পরিচালক; সিটি কর্পোরেশনে গৃহসম্পত্তিতে বিনিয়োগ |
নিবাসী বাংলাদেশি দেশের ভেতরের ও বাইরের সম্পদ দেখান; অনাবাসী বা বিদেশি কেবল বাংলাদেশের সম্পদ। নিজস্ব টিন নেই এমন স্বামী/স্ত্রী ও নাবালক সন্তানের সম্পদও বিবরণীতে থাকবে। যে কেউ স্বেচ্ছায় বিবরণী দিতে পারেন, আর আমরা সাধারণত তা-ই বলি: বছরের পর বছর পরে নোটিশ এলে অবিচ্ছিন্ন সম্পদের ইতিহাসই সেরা প্রতিরক্ষা। উপকর কমিশনার নোটিশ দিয়ে যেকোনো বছরের যেকোনো বিবরণী চাইতে পারেন; ২০২৬-২৭ থেকে চাওয়া বিবরণী ছাড়া রিটার্ন অসম্পূর্ণ গণ্য হয়, আর অসম্পূর্ণ রিটার্ন বাতিল ঘোষণা করা যায় (ধারা ১৭৬)।
সীমাটি মোট সম্পদের, আয়ের নয়; এটি ৫০ লাখে উঠেছে বলে যে খবর, আমাদের পড়া আইনের পাঠে তার সমর্থন নেই।
যা আছে তার মূল্য কীভাবে ধরবেন
বিবরণী হয় ক্রয়মূল্যে, বাজারমূল্যে নয়। নিয়মটি ধারাবাহিকভাবে মানলেই বছর-থেকে-বছর মিলানো সম্ভব হয়।
| সম্পদ | যে অঙ্ক দেখাবেন |
|---|---|
| জমি, ফ্ল্যাট, ভবন | ক্রয়মূল্য ও রেজিস্ট্রির খরচ (দলিলমূল্য + স্ট্যাম্প, রেজিস্ট্রি ফি ও উৎসে কর); উত্তরাধিকারে পাওয়া সম্পত্তি আগের মালিকের রিটার্নের মূল্যে, না থাকলে টীকাসহ নামমাত্র মূল্যে |
| মোটরগাড়ি | রেজিস্ট্রেশনসহ ক্রয়মূল্য; ফরমে রেজিস্ট্রেশন নম্বর |
| স্বর্ণ ও অলংকার | ক্রয়মূল্য; উত্তরাধিকার বা উপহারে পেলে ওজন ও পাওয়ার সময়ের মূল্য — ২৫ ভরির পাশে কখনো “০” নয়, সেটি নোটিশের আমন্ত্রণ |
| শেয়ার, সঞ্চয়পত্র, ডিপিএস, এফডিআর | ক্রয়মূল্য বা অভিহিত মূল্য; স্টেটমেন্টের সমাপনী স্থিতি |
| ব্যাংক স্থিতি ও হাতে নগদ | ৩০ জুনের প্রকৃত অঙ্ক; উৎস ছাড়া বড় অঙ্কের হাতে-নগদ চিরাচরিত লাল পতাকা |
| ব্যবসার মূলধন | ব্যবসার হিসাবের সমাপনী মূলধন |
| অন্যকে দেওয়া ঋণ | বকেয়া অঙ্ক, ঋণগ্রহীতার নামসহ |
দায় — গৃহঋণ, গাড়ির ঋণ, ব্যক্তিগত ঋণ, বকেয়া — মোট সম্পদ থেকে বাদ দিলে নিট সম্পদ; ৪ কোটি টাকার বেশি নিট সম্পদের সারচার্জের ভিত্তিও এটিই, যা আমাদের করহার গাইডে আছে।
ঋণ, দান ও মিলানোর হিসাব
এনবিআরের সিস্টেম যে অঙ্ক কষে তা সরল: প্রারম্ভিক নিট সম্পদ + ঘোষিত আয় + অব্যাহতিপ্রাপ্ত আয় ও প্রাপ্ত দান − ঘোষিত খরচ = সমাপনী নিট সম্পদ। সমীকরণ যা ভাঙে, তা-ই “ব্যাখ্যাহীন”।
ঋণ। আপনার নেওয়া ঋণ দায়, এবং সম্পদ বাড়ার ব্যাখ্যা; আপনার দেওয়া ঋণ সম্পদ, এবং নগদ কমার সঙ্গে মিলতে হবে। দুই ক্ষেত্রেই অপর পক্ষের নাম লিখুন ও চুক্তি রাখুন; বন্ধুর কাছ থেকে কাগজহীন ঋণই অডিট দলের প্রথম প্রশ্ন।
দান। স্বামী/স্ত্রী, বাবা-মা বা সন্তানের দান অব্যাহতিপ্রাপ্ত, ব্যাংক ট্রান্সফার লাগে না। অন্য যে-কারও ৫ লাখ টাকার বেশি দান ক্রসড চেক বা ব্যাংক ট্রান্সফারে না এলে অন্যান্য উৎসের আয় হিসেবে করযোগ্য। বিদেশ থেকে বাবা-মাকে দান ব্যাংকিং চ্যানেলে আসতে হবে। বছরে দান প্রাপ্তি হিসেবে দাতার নামসহ দেখান; দানকর আইন ১৯৯০ আলাদাভাবে দাতার ওপর প্রযোজ্য, আত্মীয়রা অব্যাহতিপ্রাপ্ত।
উত্তরাধিকারে পাওয়া সম্পদ। উত্তরাধিকারের বছরে মৃতের খাতামূল্যে দেখান, সাকসেশন বা ওয়ারিশ সনদ ফাইলে রাখুন। “সবসময়ই ছিল” ভেবে বছরের পর বছর চল্লিশ বিঘা কৃষিজমি বাদ দেওয়া এক ক্লায়েন্টকে কিছু বিক্রির বছরে তা ব্যাখ্যা করতে হয়েছিল।
মিসম্যাচ, প্রসেসিং ও অডিট — আসলে কী হয়
প্রসেসিং (ধারা ১৮১)। রিটার্ন স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রসেস হয়। রিটার্নের গায়ে দৃশ্যমান গাণিতিক ভুল ও ভুল দাবিতে হিসাবসহ পার্থক্যের নোটিশ আসে; আপনি ব্যাখ্যা দিতে পারেন, বা সংশোধিত রিটার্ন দিয়ে পরিশোধ করতে পারেন। কোনোটি না করলে ছয় মাসের মধ্যে দাবিনামা আসে।
অডিট বাছাই (ধারা ১৮২)। বোর্ড নিজস্ব পদ্ধতিতে অডিটের জন্য রিটার্ন বাছে — ২০২৪ থেকে হাতে বাছাই নয়, স্বয়ংক্রিয় ঝুঁকিভিত্তিক বাছাই। দাখিলের ৬০ দিনের মধ্যে বাছাই করা যায় না; অডিট দল নিয়োগের সাত কর্মদিবসের মধ্যে কর্মকর্তা আপনাকে জানাবেন; অনুসন্ধান ৬০ দিন (আরও ৬০ বাড়ানো যায়), প্রতিবেদন ৩০০ দিনে, পুরো প্রক্রিয়া ২৪ মাসে শেষ হতে হবে। আইনের নিরাপদ আশ্রয়: একই উৎস থেকে আগের বছরের চেয়ে অন্তত ১৫% বেশি আয় দেখানো রিটার্ন, ফেরতের দাবি নেই ও উৎসে করের দায়িত্ব পালিত — বাছাইযোগ্য নয়। ফেরতের ঘড়ি অর্থ আইন ২০২৬ বেঁধে দিয়েছে: উপ কর কমিশনার দাখিলের ১২০ দিনে রিটার্ন প্রক্রিয়া করেন, আর ফেরতের আবেদনের ৬০ দিনে ইলেকট্রনিক ফেরত; স্বয়ংক্রিয় ফেরত কেবল বেতন, আর্থিক সম্পদ ও কৃষি আয়ের করদাতার জন্য। ২০২৬-এ যোগ হওয়া IT-10B-র দুটি ফাঁদ: ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে (বা ব্যাংকে কিন্তু ছয় বছর অপরিশোধিত) ৫ লাখ টাকার বেশি ঋণ, অগ্রিম বা আমানত অন্যান্য উৎসের আয় হিসেবে করযোগ্য; আর নিকটাত্মীয়ের ঋণ পরে মওকুফ বা উপহারে রূপান্তরিত হলে দুই পক্ষের রিটার্নে দেখানো থাকলে করমুক্ত। প্রকাশিত ঝুঁকির লক্ষণ প্রত্যাশিতই — ব্যাংক, ভূমি রেজিস্ট্রি ও কার্ডের তথ্যের সঙ্গে অমিল, ঘোষিত আয়ের চেয়ে বড় জীবনযাত্রা, ব্যাখ্যাহীন সম্পদবৃদ্ধি, কাগজহীন ঋণ বা নগদ, ফোলানো রেয়াত।
ভুল সংশোধন। স্বনির্ধারণী রিটার্ন দাখিলের ১৮০ দিনের মধ্যে, অডিটে বাছাইয়ের আগে, একবার সংশোধন করা যায় — ঘাটতি মাসে ৫% সরল সুদসহ পরিশোধ করে (ধারা ১৮০)। অডিট প্রতিবেদনের পর ধারা ১৮২(১০)-এ সংশোধিত রিটার্নের আমন্ত্রণ আসতে পারে। সংশোধিত রিটার্নে মূল রিটার্নের দায় কমানো যায় না (ধারা ১৭৫)। চিঠি এলে কী করবেন, আমাদের নোটিশ ও অডিট গাইডে।
প্রারম্ভিক স্থিতি পুনর্গঠন
আপনার সর্বশেষ দাখিল করা বিবরণী থেকে শুরু করি; না থাকলে দলিল, ব্যাংক ও ব্রোকারেজের নথি থেকে তৈরি করি।
প্রতিটি লেনদেন অনুসরণ
প্রতিটি নতুন সম্পদ যে টাকায় কেনা তার সঙ্গে মেলাই; প্রতিটি ঋণ ও দানের কাগজ করি।
দাখিলের আগে মিলানো
প্রারম্ভিক-আয়-খরচ-সমাপনী সমীকরণ নিজেরা কষে এনবিআরের আগে ফাঁক বন্ধ করি।
দাখিল ও সংরক্ষণ
বিবরণী, প্রমাণ ও হিসাব পরের নোটিশের জন্য আপনার স্থায়ী ফাইলে থাকে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বাংলাদেশে কাদের সম্পদ বিবরণী দিতে হয়?
মোট সম্পদ ৪০ লাখ টাকার বেশি, কিংবা মোটরগাড়ি, সিটি কর্পোরেশনে বাড়ি বা ফ্ল্যাট, বিদেশে কোনো সম্পদ বা কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার-পরিচালকত্ব আছে এমন যেকোনো ব্যক্তি, এবং সরকারি কর্মচারীরা (ধারা ১৬৭)।
সীমা কি ৪০ লাখ না ৫০ লাখ টাকা?
আমাদের পড়া ধারা ১৬৭ অনুযায়ী মোট সম্পদ ৪০ লাখ টাকা। একটি পত্রিকার ৫০ লাখের খবর আইনের পাঠে সমর্থিত নয়।
স্বর্ণ কোন মূল্যে দেখাব?
ক্রয়মূল্যে, বা উত্তরাধিকার/উপহারে পেলে পাওয়ার সময়ের মূল্যে, ওজনসহ। বড় মজুত শূন্যে দেখানো নোটিশের সাধারণ কারণ।
আত্মীয়ের কাছ থেকে নেওয়া ঋণ কীভাবে দেখাব?
দায় হিসেবে, ঋণদাতার নাম ও অঙ্কসহ, চুক্তি এবং সম্ভব হলে ব্যাংকের লেনদেনসহ। কাগজহীন ঋণ অডিটের ঘন ঘন কারণ।
দান কি করযোগ্য?
স্বামী/স্ত্রী, বাবা-মা বা সন্তানের দান অব্যাহতিপ্রাপ্ত। অন্য কারও ৫ লাখ টাকার বেশি দান ক্রসড চেক বা ব্যাংক ট্রান্সফারে না এলে আয় হিসেবে করযোগ্য।
মিসম্যাচ কী?
আপনার সমাপনী সম্পদ আর ঘোষিত আয়, খরচ ও প্রাপ্তি দিয়ে যা ব্যাখ্যা করা যায় — এ দুইয়ের ফারাক। সিস্টেম তা চিহ্নিত করে; আপনি ব্যাখ্যা দিতে পারেন, বা রিটার্ন সংশোধন করে পরিশোধ করতে পারেন।
দাখিলের পর সম্পদ বিবরণী সংশোধন করা যায়?
যায়, রিটার্ন সংশোধন করে: স্বনির্ধারণী রিটার্নে ১৮০ দিনের মধ্যে একবার, অডিট বাছাইয়ের আগে, ঘাটতিতে মাসে ৫% সুদসহ।
জীবনযাত্রার বিবরণী আইটি-১০বিবিও কি লাগবে?
আয় ৫ লাখ টাকার বেশি হলে, ব্যবসায়িক আয় থাকলে, গাড়ি কিনলে, বা সিটি কর্পোরেশনে গৃহসম্পত্তি থাকলে।
কর, ভ্যাট ও কাস্টমস বিষয়ে আরও পড়ুন
আয়কর রিটার্ন, টিন, ভ্যাট ও বিন, মূসক ফরম, কাস্টমস শুল্ক এবং এনবিআরের নোটিশ পেলে করণীয়।
বছরের পর বছর সম্পদ বিবরণী দেওয়া হয়নি বা মিলছে না?
নোটিশের চাপে করার আগে আমরা ইতিহাস পুনর্গঠন করে, মিলিয়ে, দাখিল করে দিই। লিখিত প্রাথমিক মূল্যায়ন বিনামূল্যে।

মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।