বিনিয়োগে কর রেয়াত ২০২৬-২৭: সঞ্চয়পত্র, ডিপিএস ও বিমায় কত কর বাঁচে, হিসাবের নিয়ম
১ জুলাই ২০২৬ থেকে রেয়াত কমেছে — রেয়াতযোগ্য বিনিয়োগের ১৫% থেকে ১০%, সর্বোচ্চ সীমা ১০ লাখ থেকে ৭.৫ লাখ টাকা। তবু বেশির ভাগ চাকরিজীবীর হাতে করের অঙ্ক কমানোর এটিই একমাত্র হাতিয়ার। এখন কীভাবে কাজ করে, কী গণ্য হয়, আর ফাঁদগুলো কী — এখানে।
- রেয়াত = আয়ের ৩%, রেয়াতযোগ্য বিনিয়োগের ১০% ও ৭.৫ লাখ টাকা — এই তিনের মধ্যে সবচেয়ে কম (সংশোধিত ধারা ৭৮)।
- গণ্য হয়: সঞ্চয়পত্র, তালিকাভুক্ত শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড, জীবন বিমার প্রিমিয়াম, প্রভিডেন্ট ফান্ডের চাঁদা, বছরে ১,২০,০০০ টাকা পর্যন্ত ডিপিএস, এবং ষষ্ঠ তফসিলের অংশ ৩-এর আরও কয়েকটি।
- কর বছর ২০২৬-২৭-এ কেবল ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ৩০ জুন ২০২৬-এর বিনিয়োগ গণ্য; মেয়াদ শেষের আগে ভাঙালে এখন রেয়াত ফেরত দিতে হয়।
- সঞ্চয়পত্রের সুদে কাটা কর আর চূড়ান্ত নয়: মোট মুনাফা আয়ে দেখান, কর্তন সমন্বয় করুন, বাড়তি ফেরত চান।
এই গাইডে: কোন বিনিয়োগ রেয়াতযোগ্য · একটি উদাহরণ: পুরনো নিয়ম বনাম নতুন · সঞ্চয়পত্রের সুদ আর "চূড়ান্ত" কর নয় · ই-রিটার্নে রেয়াত দাবি, আর ক্লব্যাক
সংক্ষেপে উত্তর
নিবাসী ব্যক্তি ও অনাবাসী বাংলাদেশিরা করের অঙ্ক থেকে তিনটি অঙ্কের মধ্যে সবচেয়ে কমটি রেয়াত হিসেবে বাদ দিতে পারেন: মোট আয়ের ৩% (অব্যাহতিপ্রাপ্ত, হ্রাসকৃত হারের ও চূড়ান্ত-কর আয় বাদে), আয়বর্ষে করা রেয়াতযোগ্য বিনিয়োগের ১০%, এবং ৭,৫০,০০০ টাকা। অর্থ আইন ২০২৬ আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ৭৮-কে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে এই অঙ্কে সংশোধন করেছে; গত বছর পর্যন্ত হার ছিল ১৫%, সীমা ১০ লাখ। রেয়াত আপনার কর ন্যূনতম করের নিচে নামাতে পারে না, আর নিজে থেকে ফেরত তৈরি করতে পারে না।
অর্থ আইন ২০২৬-এ সংশোধিত আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ৭৮ অনুযায়ী। রেয়াত করের বেশি হয় না; ন্যূনতম কর তবু প্রযোজ্য। শুধু ধারণার জন্য।
কোন বিনিয়োগ রেয়াতযোগ্য
তালিকা ষষ্ঠ তফসিলের অংশ ৩-এ। আমাদের ক্লায়েন্টরা যেগুলো ব্যবহার করেন, প্রতিটির সীমাসহ:
| বিনিয়োগ বা খরচ | সীমা বা শর্ত |
|---|---|
| সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য সরকারি সিকিউরিটি | বছরে ক্রয়; কিছু সিকিউরিটিতে প্রযোজ্য ৫ লাখ টাকার সীমা ২০২৬-এর পাঠের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে |
| স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত শেয়ার, ডিবেঞ্চার, মিউচুয়াল ফান্ড ও ইটিএফ ইউনিট | বছরে প্রাথমিক বা সেকেন্ডারি ক্রয়; ইউনিট সার্টিফিকেটে আলাদা ৫ লাখ টাকার সীমা অর্থ আইন ২০২৬ তুলে দিয়েছে |
| জীবন বিমার প্রিমিয়াম (নিজের, স্বামী/স্ত্রীর, সন্তানের) | বছরে প্রকৃত পরিশোধিত প্রিমিয়াম; বিমাকৃত অঙ্কের ১০%-এর দীর্ঘদিনের সীমা যাচাই করা হচ্ছে |
| ডিপোজিট পেনশন স্কিম (ডিপিএস) বা অনুরূপ ব্যাংক আমানত স্কিম | মাসে ১০,০০০, বছরে ১,২০,০০০ টাকা পর্যন্ত |
| সরকারি বা স্বীকৃত প্রভিডেন্ট ফান্ডে চাঁদা (কর্মী ও নিয়োগকর্তার অংশ), সুপারঅ্যানুয়েশন, কল্যাণ ও গ্রুপ বিমা তহবিল | ২০২৬-২৭ থেকে তহবিল স্বীকৃত হতে হবে |
| নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে দান (ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, অটিজমসহ কিছু দাতব্য প্রতিষ্ঠান) | ২০২৬-এর সংশোধনীতে ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত রেয়াতযোগ্য |
ব্যাংক এফডিআর, জমি, স্বর্ণ, ফ্ল্যাট ও অতালিকাভুক্ত শেয়ার গণ্য হয় না। ৩০ জুন ২০২৬-এর পরের বিনিয়োগও নয় — সেটি পরের বছরের রিটার্নের।
একটি উদাহরণ: পুরনো নিয়ম বনাম নতুন
৯,০০,০০০ টাকা মোট আয়ের একজন শিক্ষক বছরে ৩,০০,০০০ টাকার সঞ্চয়পত্র কেনেন ও ৬০,০০০ টাকা ডিপিএস দেন। রেয়াতযোগ্য বিনিয়োগ: ৩,৬০,০০০ টাকা।
| কর বছর ২০২৫-২৬ (পুরনো) | কর বছর ২০২৬-২৭ (নতুন) | |
|---|---|---|
| আয়ের ৩% | ২৭,০০০ টাকা | ২৭,০০০ টাকা |
| হার × বিনিয়োগ | ১৫% = ৫৪,০০০ | ১০% = ৩৬,০০০ |
| সর্বোচ্চ | ১০,০০,০০০ | ৭,৫০,০০০ |
| রেয়াত (সবচেয়ে কম) | ২৭,০০০ টাকা | ২৭,০০০ টাকা |
এই করদাতার কিছুই বদলায়নি, কারণ আয়ের ৩%-এর অঙ্কটিই আগে থেকে বাঁধা ছিল। কাটছাঁটের ধাক্কা লাগে আয়ের তুলনায় বেশি বিনিয়োগকারীর গায়ে — ৯ লাখ আয়ে ২ লাখ বিনিয়োগ করা কেউ ২৭,০০০-এর বদলে পান ২০,০০০ (১৫%-এ হতো ৩০,০০০, ৩%-এ আটকে ২৭,০০০; এখন ১০%-এ ২০,০০০)। অঙ্কটি এক বড় ক্রয়ের বদলে কয়েক বছরে বিনিয়োগ ছড়ানোর পক্ষে।
সঞ্চয়পত্রের সুদ আর "চূড়ান্ত" কর নয়
কর বছর ২০২৫-২৬ পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রের মুনাফায় উৎসে কাটা ১০%-ই ছিল ওই আয়ের চূড়ান্ত কর: বেশি দিতেও হতো না, ফেরতও মিলত না। অর্থ আইন ২০২৬-এ প্রতিস্থাপিত ধারা ১৬৩ ১ জুলাই ২০২৬ থেকে তা শেষ করেছে। এখন “আর্থিক সম্পদ থেকে আয়”-এ মোট মুনাফা দেখাবেন, স্ল্যাব হারে কর হিসাব করবেন, আর কাটা ১০% সমন্বয় করবেন (মোট বিনিয়োগ ৫ লাখ টাকা বা কম হলে ৫%, ৫ লাখ পর্যন্ত পেনশনার সঞ্চয়পত্রে শূন্য — এনবিআরের ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী)।
যে অবসরভোগীর একমাত্র আয় করমুক্ত সীমার নিচের সঞ্চয়পত্রের সুদ, তাঁর পুরো কর্তনই ফেরত; এনবিআরের নিজের উদাহরণ — ৫০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রে ৫ লাখ মুনাফা, ৫০,০০০ কর্তন, প্রদেয় কর ৪০,০০০, ফেরত ১০,০০০। ফেরতের দাবি ই-রিটার্নের ভেতরের অনলাইন ফরমে ব্যাংক হিসাবের তথ্যসহ। উচ্চ হারের করদাতার জন্য এর মানে কর কম নয়, বেশি। একই পরিবর্তন এফডিআর ও ট্রেজারি সিকিউরিটির সুদে।
ই-রিটার্নে রেয়াত দাবি, আর ক্লব্যাক
- রিটার্নের Rebate অংশ খুলে প্রতিটি বিনিয়োগ — জীবন বিমা, ডিপিএস, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার — অঙ্ক ও তারিখসহ লিখুন। সঞ্চয়পত্রের অঙ্ক আয়ের অংশ থেকে “Sync from Income” দিয়ে আনা যায়।
- প্রমাণ রাখুন: সঞ্চয়পত্র ক্রয়ের রসিদ, বিমা কোম্পানির প্রিমিয়াম রসিদ, ডিপিএস স্টেটমেন্ট, বিও হিসাবের স্টেটমেন্ট। সার্কেল যেকোনোটি চাইতে পারে।
- হিসাবকৃত রেয়াত তিন অঙ্কের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন। পোর্টাল নিজেই সবচেয়ে কমটি নেয়; error এলে সাধারণত তারিখ আয়বর্ষের বাইরে, বা ইস্যুর তারিখ সঞ্চয়পত্রের সঙ্গে মিলছে না।
নতুন ক্লব্যাক। ২০২৬-২৭ থেকে যে বিনিয়োগে রেয়াত নেওয়া হয়েছে তা মেয়াদ পর্যন্ত রাখতে হবে। সঞ্চয়পত্র, ডিপিএস বা পলিসি আগে ভাঙালে বা সমর্পণ করলে তার রেয়াত আনুপাতিক হারে, ভাঙানোর বছরে, বাড়তি কর হিসেবে ফেরত দিতে হয়। পাঁচ বছরের সঞ্চয়পত্র দ্বিতীয় বছরে ভাঙানোর আগে জেনে নিন রেয়াতের দাম কত ছিল।
দেরিতে দাখিলকারী। পুরনো আইনে দেরির রিটার্নে রেয়াত হারাতে হতো। ২০২৬-এর সংশোধনী দেরির ব্যবস্থাটি দাখিলের সময়সীমা দিয়ে বদলেছে (দেখুন আমাদের রিটার্ন দাখিল গাইড); ৩০ জুন ২০২৭-এর পরে দাখিল করলে রেয়াত হারাবেন কি না — তা আমরা ২০২৬-২৭ পরিপত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত করছি। ২০২৬-এর আরও দুটি কথা: ভবিষ্য তহবিলের চাঁদা কেবল স্বীকৃত তহবিলে গোনা হয়, আর মেয়াদের আগে তোলায় আনুপাতিক বাড়তি কর লাগে; ইউনিট সার্টিফিকেট, মিউচুয়াল ফান্ড ও ইটিএফের ৫ লাখ টাকার সীমা অর্থ আইন ২০২৬ তুলে দিয়েছে; সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্টে দান বিয়োজনযোগ্য, আর এগারোটি নামাঙ্কিত দাতব্য সংস্থায় দানে ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত রেয়াত। সময়মতো দিলে প্রশ্নটিই ওঠে না।
কর অনুমান
প্রত্যাশিত আয়ে স্ল্যাব কর হিসাব করে দেখাই সূত্রের কোন অঙ্কটি আপনার বেলায় বাঁধা।
বিনিয়োগের মাপ
কত টাকার পর বাড়তি বিনিয়োগে বাড়তি রেয়াত আসে না, তা জানাই।
উপকরণ বাছাই
সঞ্চয়পত্র, ডিপিএস, বিমা ও তালিকাভুক্ত ফান্ডের লক-ইন ও ক্লব্যাকের ঝুঁকি আলাদা; আপনার পরিকল্পনার সঙ্গে মেলাই।
প্রমাণসহ দাখিল
রসিদ ফাইলে রেখে রিটার্নে রেয়াত দাবি করি।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
২০২৬-২৭-এ বিনিয়োগ কর রেয়াত কীভাবে হিসাব হয়?
অর্থ আইন ২০২৬-এ সংশোধিত ধারা ৭৮ অনুযায়ী মোট আয়ের ৩%, বছরের রেয়াতযোগ্য বিনিয়োগের ১০% ও ৭.৫ লাখ টাকা — এই তিনের মধ্যে সবচেয়ে কম।
আগে হার কত ছিল?
কর বছর ২০২৫-২৬ পর্যন্ত রেয়াতযোগ্য বিনিয়োগের ১৫%, সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা।
কোন বিনিয়োগ গণ্য হয়?
সঞ্চয়পত্র ও সরকারি সিকিউরিটি, তালিকাভুক্ত শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড, জীবন বিমার প্রিমিয়াম, প্রভিডেন্ট ও স্বীকৃত তহবিলের চাঁদা, বছরে ১,২০,০০০ টাকা পর্যন্ত ডিপিএস, নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে দান। এফডিআর, জমি, স্বর্ণ ও অতালিকাভুক্ত শেয়ার নয়।
ডিপিএসে কি এখনো সীমা আছে?
হ্যাঁ — মাসে ১০,০০০, বছরে ১,২০,০০০ টাকা।
সঞ্চয়পত্রে কাটা কর কি চূড়ান্ত?
১ জুলাই ২০২৬ থেকে নয়। এখন তা অগ্রিম পরিশোধ; মোট মুনাফা দেখিয়ে কর্তন সমন্বয় করে বাকি দেবেন বা ফেরত চাইবেন।
সঞ্চয়পত্র আগে ভাঙালে কী হয়?
২০২৬-এর সংশোধনীতে তাতে নেওয়া রেয়াত আনুপাতিক হারে ভাঙানোর বছরে বাড়তি কর হিসেবে ফেরত দিতে হয়।
রেয়াতে কি ফেরত পাওয়া যায়?
না। এটি করকে সর্বনিম্ন ন্যূনতম কর পর্যন্ত কমায়; নিজে থেকে ঋণাত্মক অঙ্ক তৈরি করে না। ফেরত আসে কেবল উৎসে কর্তিত বা অগ্রিম পরিশোধিত কর থেকে।
জুলাই ২০২৬-এর বিনিয়োগ কি এই রিটার্নে গণ্য?
না। কর বছর ২০২৬-২৭-এ ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ৩০ জুন ২০২৬-এর বিনিয়োগ গণ্য। জুলাই ২০২৬-এর ক্রয় পরের বছরের।
কর, ভ্যাট ও কাস্টমস বিষয়ে আরও পড়ুন
আয়কর রিটার্ন, টিন, ভ্যাট ও বিন, মূসক ফরম, কাস্টমস শুল্ক এবং এনবিআরের নোটিশ পেলে করণীয়।
কর বাঁচাতে বিনিয়োগ করছেন? আগে অঙ্কটা মিলিয়ে নিন।
কত টাকায় পুরো রেয়াত মেলে — আর কখন বড় ক্রয়ে কিছুই আসে না — আমরা জানিয়ে দেব। লিখিত প্রাথমিক মূল্যায়ন বিনামূল্যে।

মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।