মামলা আপোষের নিয়ম: আপোষযোগ্য ধারা ও আপোষনামা লেখার নিয়ম
অনেক ফৌজদারি মামলা মীমাংসায় শেষ হয়। তবে সব অপরাধ আপোষযোগ্য নয়, আর অসাবধানে লেখা আপোষনামা আপনাকে ঝুঁকিতে রাখতে পারে। ঠিকভাবে কীভাবে করবেন, এখানে।
- শুধু ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪৫ ধারায় তালিকাভুক্ত অপরাধ আপোষযোগ্য: ৩৪৫(১)-এর অপরাধ সাধারণত আদালতের অনুমতি ছাড়া, ৩৪৫(২)-এর অপরাধ কেবল অনুমতি নিয়ে।
- খুন, খুনের চেষ্টা, ধর্ষণ ও দস্যুতার মতো গুরুতর অপরাধ আপোষযোগ্য নয়।
- মামলা শেষ করতে আপোষ আদালতে দাখিল করে আদেশে লিপিবদ্ধ করাতে হয়।
- আপোষ অযোগ্য মামলায়ও মীমাংসা জামিন, সাজা বা হাইকোর্টে মামলা বাতিলের আবেদনে কাজে লাগে।
এই গাইডে: তিন ধরনের অপরাধ · আপোষনামা লেখার নিয়ম · আপোষের পর আবার মামলা হলে · আপোষ ও লিগ্যাল এইড
সংক্ষেপে উত্তর
আপোষ মানে ভুক্তভোগী মীমাংসায় রাজি হন আর আদালত তা লিপিবদ্ধ করে খালাস দেন। কোন অপরাধ আপোষযোগ্য তা ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪৫ ধারায় তালিকাভুক্ত। উদাহরণ হলো দণ্ডবিধির ৩২৩, ৩৪১, ৫০০ ও ৫০৪ ধারার অপরাধ। ৩৪৫(১) ধারায় নির্দিষ্ট ব্যক্তি এগুলো আপোষ করতে পারেন, ধারার শর্ত এবং আদালতের অনুমতি বা অনুমোদনের বিধান সাপেক্ষে। ৩৪৫(২) ধারার অপরাধ, যেমন প্রতারণা (৪২০) ও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ (৪০৬), কেবল আদালতের অনুমতিতে আপোষ করা যায়। কোনো তালিকায় না থাকা অপরাধ পক্ষগুলো যতই রাজি থাকুক, আপোষ করা যায় না।
নালিশি মামলায় চূড়ান্ত আদেশের আগে আদালতের অনুমতিতে বাদী মামলা প্রত্যাহার করলেও মামলা শেষ হতে পারে (২৪৮ ধারা)।
তিন ধরনের অপরাধ
| ধরন | উদাহরণ | কীভাবে শেষ হয় |
|---|---|---|
| ৩৪৫(১) ধারা: সাধারণত অনুমতি লাগে না | সাধারণ আঘাত (৩২৩), অন্যায়ভাবে বাধা (৩৪১), মানহানি (৫০০), অপমান (৫০৪) | নির্দিষ্ট ব্যক্তি আপোষনামা দাখিল করেন; আদালত লিপিবদ্ধ করে খালাস দেন |
| ৩৪৫(২) ধারা: আদালতের অনুমতি লাগে | প্রতারণা (৪২০), প্রতারিত ব্যক্তির মাধ্যমে; বিশ্বাসভঙ্গ (৪০৬), সম্পত্তির মালিকের মাধ্যমে; এবং তালিকার অন্যান্য অপরাধ | যৌথ দরখাস্ত; আদালত অনুমতি দেবেন কি না ঠিক করেন |
| আপোষযোগ্য নয় | খুন (৩০২), খুনের চেষ্টা (৩০৭), ধর্ষণ, দস্যুতা | মীমাংসায় মামলা শেষ হয় না; জামিন বা সাজায় বিবেচিত হতে পারে |
আদালতের অনুমতি কখনো লাগবে না, এমন ধরে নেবেন না। ৩৪৫(১)-এর অপরাধেও আপোষের অধিকারী ব্যক্তির পক্ষে অন্য কেউ, যেমন নাবালকের পক্ষে কেউ, আপোষ করলে অনুমতি লাগে (৩৪৫(৪) ধারা); আর অভিযুক্তকে বিচারে সোপর্দ করা হলে বা দণ্ডের পর আপিল চলমান থাকলে আদালতের অনুমোদন লাগে (৩৪৫(৫) ধারা)।
২০২৬ সালে একটি সংযোজন: হস্তান্তরযোগ্য দলিল (সংশোধন) আইন ২০২৬ অনুযায়ী ১৩৮ ধারার চেক ডিজঅনার মামলা এখন যেকোনো পর্যায়ে আপোষে নিষ্পত্তি করা যায়। চেকদাতা টাকা দিলে আর প্রাপক রাজি হলে আদালত আপোষ লিপিবদ্ধ করে মামলা শেষ করেন; রায় পর্যন্ত যেতে হয় না।
আপোষনামা লেখার নিয়ম
- মামলা নম্বর, আদালত ও অভিযোগের ধারা।
- বাদী ও আসামির নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বরসহ।
- শর্তগুলো: কত টাকা দেওয়া হয়েছে বা হবে, তারিখ, কে কী প্রত্যাহার করবেন।
- আপোষ স্বেচ্ছায়, চাপ বা প্রতারণা ছাড়া হয়েছে, এমন বক্তব্য।
- উভয় পক্ষ ও দুজন সাক্ষীর সই; আইনজীবীদের সই থাকলে ভালো।
যৌথ দরখাস্তসহ দাখিল করুন। আদালত যেন আদেশে আপোষ লিপিবদ্ধ করেন, তা চান; পরে সেই আদেশই আপনার সুরক্ষা।
আপোষের পর আবার মামলা হলে
আদালতে লিপিবদ্ধ আপোষ সেই মামলার পক্ষগুলোকে বাধ্য করে, আর একই ঘটনায় নতুন মামলার বিরুদ্ধে শক্ত প্রমাণ হয়। আইনজীবী এটি দিয়ে নতুন মামলা খারিজ চাইতে পারেন, বা আইনের অপব্যবহার হিসেবে ৫৬১ক ধারায় হাইকোর্ট বিভাগে বাতিলের আবেদন করতে পারেন।
আপোষ ও লিগ্যাল এইড
যৌতুক দাবি ও পারিবারিক বিষয়ের মতো কিছু বিরোধ এখন যেসব জেলায় ব্যবস্থা চালু হয়েছে সেখানে মামলার আগে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতায় যায়। সেখানে হওয়া মীমাংসা লিখিত হয় এবং মধ্যস্থতাকারীর সামনে সই হয়।
ধারা যাচাই
প্রতিটি ধারা আপোষযোগ্য কি না, অনুমতি লাগবে কি না নিশ্চিত হোন।
শর্ত ঠিক করুন
টাকার অঙ্ক, তারিখ, আর কে কী প্রত্যাহার করবেন।
আপোষনামায় সই
উভয় পক্ষ ও সাক্ষী, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যসহ।
দাখিল ও লিপিবদ্ধ
যৌথ দরখাস্ত; আদেশে আপোষ লিপিবদ্ধ হয়েছে কি না দেখুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
কোন ফৌজদারি মামলা আপোষ করা যায়?
ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪৫ ধারায় তালিকাভুক্ত অপরাধ। ৩৪৫(১)-এর অপরাধ, যেমন সাধারণ আঘাত বা মানহানি, নির্দিষ্ট ব্যক্তি সাধারণত অনুমতি ছাড়াই আপোষ করতে পারেন; ৩৪৫(২)-এর অপরাধ, যেমন প্রতারণা (৪২০) ও বিশ্বাসভঙ্গ (৪০৬), আদালতের অনুমতিতে। খুন বা ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধ আপোষযোগ্য নয়।
আপোষনামা লেখার নিয়ম কী?
মামলা নম্বর ও ধারা, পক্ষগুলোর বিবরণ, সম্মত শর্ত, স্বেচ্ছায় আপোষের বক্তব্য, আর উভয় পক্ষ ও সাক্ষীদের সই দিন। যৌথ দরখাস্তসহ দাখিল করুন।
৩০৭ ধারার মামলা কি আপোষ করা যায়?
না। খুনের চেষ্টা আপোষযোগ্য নয়। তবে জামিন, সাজা বা হাইকোর্টের আবেদনে মীমাংসার কথা বিবেচিত হতে পারে।
আপোষের পর কি মামলা প্রত্যাহার করা যায়?
নালিশি মামলায় চূড়ান্ত আদেশের আগে আদালতের অনুমতিতে বাদী প্রত্যাহার চাইতে পারেন। আপোষযোগ্য অপরাধে আপোষ নিজেই খালাসে গড়ায়।
আপোষের পরও আবার মামলা করেছে। এখন কী করব?
লিপিবদ্ধ আপোষ দিয়ে নতুন মামলা খারিজ চান, অথবা আইনের অপব্যবহার হিসেবে হাইকোর্ট বিভাগে বাতিলের আবেদন করুন।
আপোষ হলে কি খালাস হয়?
হ্যাঁ, অপরাধ আপোষযোগ্য হলে আর আদালত আপোষ লিপিবদ্ধ করলে তা খালাসের সমান।
আপোষের শর্তে কি জামিন হয়?
আপোষ চলমান থাকলে আদালত কখনো জামিন দেন, তবে অপরাধ ও ঘটনাই ঠিক করে। যে শর্ত পূরণ করতে পারবেন না, তাতে সই করবেন না।
আদালতের বাইরে আপোষ করলেই কি যথেষ্ট?
না। আদালতে দাখিল করে লিপিবদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত মামলা চলতে থাকে।
ফৌজদারি, পুলিশ ও সাইবার বিষয়ে আরও পড়ুন
গ্রেপ্তার ও জামিন, জিডি ও এজাহার, মিথ্যা মামলা ও সাইবার হয়রানি।
গ্রেপ্তারের পর প্রথম ২৪ ঘণ্টা: অধিকার, রিমান্ড ও জামিন
মিথ্যা মামলা হলে করণীয়: আগাম জামিন, খারিজ ও শাস্তি (২০২৬)
জিডি, এজাহার নাকি নালিশি মামলা: বাংলাদেশে মামলা করার সঠিক নিয়ম
সাইবার হয়রানি ও ফেক ফেসবুক আইডি: অভিযোগ করার সঠিক নিয়ম (২০২৬)
জামিনযোগ্য ও জামিন অযোগ্য ধারা: তালিকা ও ব্যাখ্যা
আগাম জামিন কিভাবে নিতে হয়: নিয়ম, কাগজ ও খরচ
ওয়ারেন্ট হলে করণীয়: আত্মসমর্পণ, জামিন ও রিকল
প্রতারণা মামলা (৪২০ ও ৪০৬ ধারা): করার নিয়ম ও প্রতিরক্ষা
চার্জশিট, ফাইনাল রিপোর্ট ও নারাজি পিটিশন
মানহানি মামলা করার নিয়ম: ফৌজদারি ও দেওয়ানি
গ্রেপ্তার হলে: জামিনের জন্য কী নোট করবেন ও আনবেন
সিআরপিসি সংশোধন ২০২৬: গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নতুন সুরক্ষা
মামলা আপোষ করতে চান?
মামলার বিস্তারিত পাঠান। আমরা ধারা যাচাই করে আপোষনামা তৈরি করি। লিখিত প্রাথমিক মূল্যায়ন বিনামূল্যে।

মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।