Skip to content

সন্তান থাকলে তালাক: বাংলাদেশে হেফাজত, ভরণপোষণ ও দেখা-সাক্ষাতের নিয়ম

তালাক বিয়ে শেষ করে, অভিভাবকত্ব নয়। এই গাইডে বাংলাদেশের আইনে সন্তান কোথায় থাকবে, খরচ কে দেবে, অন্য পক্ষ কীভাবে যোগাযোগ রাখবে এবং তালাক রেজিস্ট্রির আগে কী মিটিয়ে নেবেন তা বলা হয়েছে।

অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন ১৮৯০, ধারা ৭, ১৭, ২৫মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১, ধারা ৭, ৯পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (হিজানত)
শেয়ার করুন
শিশুকে ঘিরে দুটি যুক্ত আংটি, সন্তান থাকলে তালাক গাইড
এক নজরে
  • হেফাজত (হিজানত): সাধারণত ছেলে ৭ বছর ও মেয়ে বয়ঃসন্ধি পর্যন্ত মায়ের কাছে, কল্যাণ সাপেক্ষে
  • অভিভাবকত্ব বাবার থাকে; হেফাজত ও অভিভাবকত্ব আলাদা
  • হেফাজত যার কাছেই থাকুক, বাবাকে সন্তানের ভরণপোষণ দিতে হবে
  • পারিবারিক আদালত এক মামলায় হেফাজত, ভরণপোষণ ও সাক্ষাৎ ঠিক করে
  • সন্তানের কল্যাণ বয়সের নিয়মের ওপরে

এই গাইডে: হেফাজত বনাম অভিভাবকত্ব · আদালত যেভাবে হেফাজত ঠিক করে · সন্তানের ভরণপোষণ · দেখা-সাক্ষাৎ ও বিদেশ ভ্রমণ · তালাকের সময়ই মিটিয়ে নিন · পারিবারিক আদালতের প্রক্রিয়া ও খরচ

সংক্ষেপে উত্তর

বাংলাদেশে প্রযোজ্য মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে মায়ের প্রথম অধিকার সন্তানের হেফাজতে (হিজানত): ছেলে প্রায় সাত বছর ও মেয়ে বয়ঃসন্ধি পর্যন্ত, আর বাবা থাকেন সন্তানের দেহ ও সম্পত্তির স্বাভাবিক অভিভাবক। আদালত অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন ১৮৯০ প্রয়োগ করে প্রতিটি মামলা নাবালকের কল্যাণ (ধারা ১৭) দেখে ঠিক করে, তাই বয়সের নিয়ম সন্তানের স্বার্থের কাছে নতি স্বীকার করে। হেফাজত যার কাছেই থাকুক, বাবাকে সন্তানের ভরণপোষণ (খাবার, পোশাক, বাসস্থান, পড়াশোনা, চিকিৎসা) দিতে হবে, আর হেফাজতে থাকা মা পারিবারিক আদালতে তা দাবি করতে পারেন। হেফাজতবিহীন পক্ষ সমঝোতা বা আদালতের নির্ধারিত দেখা-সাক্ষাৎ পান। তিনটি বিষয়ই তালাকের সময় লিখিত চুক্তিতে মেটানো বা এক পারিবারিক আদালত মামলায় নিষ্পত্তি করা যায়।

হেফাজত বনাম অভিভাবকত্ব

হেফাজত হলো দৈনন্দিন যত্ন: সন্তান কোথায় ঘুমায়, খায়, স্কুলে যায়। অভিভাবকত্ব হলো সন্তানের দেহ ও সম্পত্তির ওপর আইনগত কর্তৃত্ব: পাসপোর্টে সম্মতি, স্কুলে স্বাক্ষর, উত্তরাধিকার ব্যবস্থাপনা। মুসলিম আইনে মায়ের হেফাজতের অধিকার (হিজানত) ও বাবার অভিভাবকত্ব পাশাপাশি চলে। বয়সসীমায় হেফাজত হারানো মা যোগাযোগ হারান না; অভিভাবক বাবা ইচ্ছেমতো সন্তান নিয়ে যেতে পারেন না। হিন্দু ও খ্রিস্টান পরিবারে নিজ নিজ ব্যক্তিগত আইন ও একই ১৮৯০ সালের আইন প্রযোজ্য, যেখানে কল্যাণের মানদণ্ডই মূল।

আদালত যেভাবে হেফাজত ঠিক করে

অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইনের ১৭ ধারায় আদালতকে নাবালকের কল্যাণ দেখতে হয়: বয়স, লিঙ্গ, ধর্ম, প্রস্তাবিত অভিভাবকের চরিত্র ও সামর্থ্য, আত্মীয়তার নৈকট্য, মৃত বাবা-মায়ের ইচ্ছা থাকলে তা, এবং সন্তান যথেষ্ট বড় হলে তার পছন্দ। বাংলাদেশের আদালত বারবার হিজানতের বয়স পেরোনো সন্তানকে মায়ের কাছে রেখেছে, আর স্থিতিশীল ঘর না দিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করা বাবাকে হেফাজত দেয়নি। যা গুরুত্বপূর্ণ: আসলে কে সন্তানের যত্ন নিচ্ছে, পড়াশোনার ধারাবাহিকতা, ঘরের পরিবেশ, সহিংসতার ইতিহাস। সন্তানের অনাত্মীয় কাউকে মায়ের বিয়ে হিজানতে প্রভাব ফেলতে পারে, তবে তা আপনাআপনি অধিকার শেষ করে না।

বাংলাদেশে তালাকের পর সন্তানের হেফাজত ও ভরণপোষণ

সন্তানের ভরণপোষণ

ছেলে সাবালক ও মেয়ে বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত বাবার ভরণপোষণের দায় নিরঙ্কুশ, আর নিজে চলতে অক্ষম সন্তানের জন্য তা চলতেই থাকে। পরিমাণ বাবার সামর্থ্য ও সন্তানের যৌক্তিক প্রয়োজন অনুযায়ী, স্কুলের ফি ও চিকিৎসাসহ; ঢাকার আদালত নিয়মিত মাসিক অঙ্ক ঠিক করে ও বকেয়া পরিশোধের আদেশ দেয়। হেফাজতে থাকা মা পারিবারিক আদালতে ভরণপোষণের মামলা করেন, যেখানে একই মামলায় হেফাজত ও সাক্ষাৎও ঠিক হয়। বাবা ডিক্রি না মানলে আদালত ভূমি রাজস্বের বকেয়ার মতো বা জারির মাধ্যমে আদায় করতে পারে, আর ক্রমাগত খেলাপি তাকে হেফাজত না দেওয়ার কারণ।

দেখা-সাক্ষাৎ ও বিদেশ ভ্রমণ

হেফাজতবিহীন পক্ষ নিয়মিত সাক্ষাতের অধিকারী। চুক্তিতে সাধারণত এক সপ্তাহ পর পর সাপ্তাহিক ছুটি, ঈদের ছুটির অর্ধেক ও প্রতিদিন ফোন বা ভিডিও যোগাযোগ থাকে; পক্ষরা একমত না হলে আদালত সময়সূচি ঠিক করে ও নিরপেক্ষ জায়গায় হস্তান্তরের নির্দেশ দিতে পারে। সন্তানকে বিদেশে নিতে পাসপোর্টে দুই পক্ষের সম্মতি লাগে এবং হেফাজতের মামলা চললে বাস্তবে আদালতের অনুমতি। সম্মতি ছাড়া হেফাজতকারীর কাছ থেকে সন্তান সরালে ১৮৯০ সালের আইনের ২৫ ধারায় প্রতিপাল্য ফেরতের আবেদন এবং গুরুতর ক্ষেত্রে ফৌজদারি অভিযোগ করা যায়।

তালাকের সময়ই মিটিয়ে নিন

মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৭ ধারায় চেয়ারম্যান বা মেয়রের কাছে তালাকের নোটিশ যাওয়ার আগে একটি লিখিত চুক্তি করুন: হেফাজত, বার্ষিক পর্যালোচনাসহ মাসিক ভরণপোষণের অঙ্ক, স্কুল ও চিকিৎসার খরচ, সাক্ষাতের সময়সূচি, সন্তানের পাসপোর্ট ও জন্মসনদ কার কাছে থাকবে। চুক্তিটি পারিবারিক আদালতে দাখিল করে সম্মতির ডিক্রিতে রূপ দেওয়া যায়, যা কার্যকরযোগ্য। একই দলিলে মায়ের দেনমোহর ও ইদ্দতের ভরণপোষণ মিটিয়ে নিন। ৯০ দিনের রেজিস্ট্রির ধাপ আমাদের তালাক প্রক্রিয়া গাইডে আছে।

পারিবারিক আদালতের প্রক্রিয়া ও খরচ

হেফাজত, অভিভাবকত্ব, ভরণপোষণ, দেনমোহর ও দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার সবই সন্তান যে জেলায় থাকে বা পক্ষরা শেষ একসাথে ছিলেন সেই জেলার পারিবারিক আদালতে (সহকারী জজ) যায়। পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩-এ কোর্ট ফি সামান্য নির্ধারিত অঙ্ক, প্রথম ধাপ বাধ্যতামূলক প্রাক-বিচার আপস, আর প্রথম শুনানিতেই অন্তর্বর্তী ভরণপোষণের আদেশ হতে পারে। সাক্ষ্যসহ বিবাদিত হেফাজতের মামলায় সাধারণত এক বছর বা বেশি লাগে; সম্মত মামলায় কয়েক সপ্তাহে ডিক্রি হয়। ৩০ দিনের মধ্যে জেলা জজের কাছে আপিল।

এটি সাধারণ তথ্য, আপনার মামলার পরামর্শ নয়। এখানে আইন ও প্রচলিত প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আপনার কাগজপত্র, ঘটনা ও সংশ্লিষ্ট জেলার চর্চাই ঠিক করবে আপনার ক্ষেত্রে কী প্রযোজ্য।
তালাক রেজিস্ট্রির আগে
১

হেফাজত ও সাক্ষাৎ ঠিক করুন

সন্তান কার কাছে থাকবে ও লিখিত যোগাযোগ সূচি।

২

ভরণপোষণ নির্ধারণ

মাসিক অঙ্ক, স্কুল ও চিকিৎসা, বার্ষিক পর্যালোচনা।

৩

কাগজপত্র

পাসপোর্ট ও জন্মসনদ কার কাছে থাকবে।

৪

দাখিল করুন

চুক্তিকে পারিবারিক আদালতের সম্মতির ডিক্রিতে রূপ দিন।

এখন সই করা চুক্তি পরের দুই বছরের হেফাজত লড়াই বাঁচায়।পরামর্শের সময় নিন

সাধারণ জিজ্ঞাসা

বাংলাদেশে তালাকের পর সন্তান কার কাছে থাকে?

মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে ছেলে প্রায় সাত বছর ও মেয়ে বয়ঃসন্ধি পর্যন্ত মায়ের প্রথম অধিকার, তবে আদালত অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইনের ১৭ ধারায় সন্তানের কল্যাণ দেখে ঠিক করে এবং প্রায়ই বড় সন্তানকেও মায়ের কাছে রাখে।

মায়ের কাছে হেফাজত থাকলে কি বাবাকে ভরণপোষণ দিতে হয়?

হ্যাঁ। বাবার ভরণপোষণের দায় হেফাজতের ওপর নির্ভর করে না। মা পারিবারিক আদালতে মাসিক অঙ্ক ও বকেয়ার মামলা করতে পারেন।

পারিবারিক আদালত সন্তানের ভরণপোষণ কত দেয়?

নির্দিষ্ট হার নেই। আদালত বাবার আয় ও সন্তানের যৌক্তিক প্রয়োজন (স্কুল ফি, চিকিৎসাসহ) দেখে মাসিক অঙ্ক ঠিক করে, যা পরে বদলানো যায়।

মা দ্বিতীয় বিয়ে করলে কি হেফাজত হারান?

সন্তানের অনাত্মীয় কাউকে বিয়ে মুসলিম আইনে হিজানতে প্রভাব ফেলতে পারে, তবে আদালত কল্যাণের মানদণ্ড প্রয়োগ করে এবং স্থিতিশীল ঘর থেকে সন্তানকে আপনাআপনি সরায় না।

হেফাজত ও অভিভাবকত্বের পার্থক্য কী?

হেফাজত সন্তানের দৈনন্দিন যত্ন; অভিভাবকত্ব সন্তানের দেহ ও সম্পত্তির ওপর আইনগত কর্তৃত্ব। ছোট সন্তানের হেফাজত সাধারণত মায়ের, আর বাবা স্বাভাবিক অভিভাবক থাকেন।

সন্তানের সাথে দেখা করার অধিকার কীভাবে পাব?

অন্য পক্ষের সাথে লিখিত চুক্তিতে বা পারিবারিক আদালতের আদেশে, যেখানে সাপ্তাহিক ছুটি, উৎসব ও দৈনিক যোগাযোগ ঠিক করে নিরপেক্ষ জায়গায় হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া যায়।

তালাকের পর এক পক্ষ কি সন্তানকে বিদেশে নিতে পারে?

নাবালকের পাসপোর্টে অভিভাবকের সম্মতি লাগে, আর হেফাজতের মামলা চললে আদালতের অনুমতি। সম্মতি ছাড়া নিলে ১৮৯০ সালের আইনের ২৫ ধারায় প্রতিপাল্য ফেরতের আবেদন করা যায়।

বাংলাদেশে হেফাজত ও ভরণপোষণ কোন আদালত দেখে?

সন্তান যে জেলায় থাকে বা পক্ষরা শেষ একসাথে ছিলেন সেই জেলার পারিবারিক আদালত (সহকারী জজ)। বাধ্যতামূলক আপসের পর এক মামলায় হেফাজত, ভরণপোষণ, দেনমোহর ও সাক্ষাৎ ঠিক করে।

পরিবার ও বিয়ে বিষয়ে আরও পড়ুন

তালাক, বিয়ে, সন্তানের হেফাজত, দেনমোহর ও ভরণপোষণ।

এই বিষয়ের সব লেখা →
শেয়ার করুন

মন্তব্য

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।

মন্তব্য লিখুন

সব মন্তব্য প্রকাশের আগে চেম্বার থেকে যাচাই করা হয়। মামলার গোপন তথ্য, ফোন নম্বর বা লিংক দেবেন না। এখানে দেওয়া উত্তর সাধারণ তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়; নির্দিষ্ট বিষয়ে পরামর্শের জন্য চেম্বারে যোগাযোগ করুন।

সন্তান রেখে তালাক?

তালাকের নোটিশ যাওয়ার আগে হেফাজত ও ভরণপোষণের চুক্তি আমরা লিখে দিই, সমঝোতা অসম্ভব হলে মামলা লড়ি। লিখিত প্রাথমিক মূল্যায়ন বিনামূল্যে।