মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১: ধারা ধরে সহজ ব্যাখ্যা
বাংলাদেশে প্রায় প্রতিটি মুসলিম তালাক, দ্বিতীয় বিয়ে ও ভরণপোষণের বিরোধের পেছনে আছে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১। আইনটি ছোট, কিন্তু প্রতিটি ধারায় বাস্তব ফাঁদ আছে। এখানে আছে প্রধান ধারাগুলো কী বলে, সালিশি পরিষদ কীভাবে কাজ করে, আর বৈধ তালাকের নোটিশে কী থাকতে হয়।
- ধারা ৪: আগে মারা যাওয়া ছেলে বা মেয়ের সন্তানরা তাঁদের বাবা-মায়ের অংশ পান
- ধারা ৬: দ্বিতীয় বিয়েতে সালিশি পরিষদের লিখিত অনুমতি লাগে
- ধারা ৭: তালাকে চেয়ারম্যানকে লিখিত নোটিশ লাগে, কার্যকর হয় ৯০ দিন পর
- ধারা ৯ ও ১০: সালিশি পরিষদের মাধ্যমে ভরণপোষণ; অনির্ধারিত দেনমোহর চাহিবামাত্র দেয়
এই গাইডে: ধারা ৪: এতিম নাতি-নাতনির উত্তরাধিকার · ধারা ৬: দ্বিতীয় বিয়ে · ধারা ৭: তালাক, নোটিশ ও ৯০ দিন · ধারা ৮: খুলা ও অর্পিত তালাক · ধারা ৯ ও ১০: ভরণপোষণ ও দেনমোহর
সংক্ষেপে উত্তর
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। ধারা ৪ অনুযায়ী দাদা-দাদি বা নানা-নানির আগে মারা যাওয়া ছেলে বা মেয়ের সন্তানরা তাঁদের বাবা-মায়ের প্রাপ্য অংশ পান। ধারা ৬ অনুযায়ী দ্বিতীয় বিয়েতে সালিশি পরিষদের লিখিত অনুমতি লাগে। ধারা ৭ অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদ বা সিটি কর্পোরেশনের চেয়ারম্যানকে লিখিত নোটিশ ও স্ত্রীকে কপি দেওয়ার ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হয়। ধারা ৮ খুলা ও অর্পিত তালাকে একই পদ্ধতি প্রয়োগ করে। ধারা ৯ ও ১০ ভরণপোষণ ও দেনমোহর নিয়ে।
ধারা ৪: এতিম নাতি-নাতনির উত্তরাধিকার
প্রচলিত হানাফি আইনে দাদা জীবিত ছেলে রেখে মারা গেলে আগে মারা যাওয়া ছেলের সন্তানরা বঞ্চিত হতেন। ধারা ৪ এটি বদলেছে: আগে মারা যাওয়া ছেলে বা মেয়ের সন্তানরা মিলে সেই অংশ পান, যা তাঁদের বাবা বা মা জীবিত থাকলে পেতেন। প্রতিটি উত্তরাধিকারে এটি প্রযোজ্য, আর ওয়ারিশ সনদ ও বণ্টননামায় প্রায়ই বাদ পড়ে যায়।
ধারা ৬: দ্বিতীয় বিয়ে
বিবাহিত পুরুষ সালিশি পরিষদের লিখিত অনুমতি ছাড়া আরেকটি বিয়ে করতে পারেন না। চেয়ারম্যান ও দুই পক্ষের একজন করে প্রতিনিধি নিয়ে সালিশি পরিষদ গঠিত হয়। কারণ উল্লেখ করে এবং বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্মতি আছে কি না জানিয়ে আবেদন করতে হয়। অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে:
- বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের পুরো দেনমোহর সঙ্গে সঙ্গে পরিশোধ করতে হয়;
- এটি অপরাধ, শাস্তি এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অনধিক ১০,০০০ টাকা জরিমানা, বা উভয়; এবং
- বর্তমান স্ত্রী মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন ১৯৩৯ অনুযায়ী বিচ্ছেদ চাইতে পারেন।
দ্বিতীয় বিয়ে নিজে বাতিল হয় না, তবে অনুমতি ছাড়া তা নিবন্ধন করা উচিত নয়।
ধারা ৭: তালাক, নোটিশ ও ৯০ দিন
- তালাক দেওয়া স্বামীকে যত দ্রুত সম্ভব চেয়ারম্যানকে লিখিত নোটিশ দিতে হয়, আর স্ত্রীকে কপি পাঠাতে হয়।
- ৩০ দিনের মধ্যে চেয়ারম্যান সমঝোতার জন্য সালিশি পরিষদ গঠন করেন।
- চেয়ারম্যান নোটিশ পাওয়ার ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হয়, যদি আগে প্রত্যাহার না হয়। স্ত্রী গর্ভবতী হলে ৯০ দিন বা গর্ভাবস্থা শেষ হওয়া, যেটি পরে, তখন কার্যকর হয়।
- নোটিশ না দেওয়া অপরাধ, শাস্তি এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অনধিক ১০,০০০ টাকা জরিমানা, বা উভয়।
- তৃতীয় তালাক পর্যন্ত মাঝখানে অন্য বিয়ে (হিল্লা) ছাড়াই দম্পতি আবার পরস্পরকে বিয়ে করতে পারেন।
তালাকের নোটিশে স্বামী-স্ত্রীর নাম ও ঠিকানা, বিয়ের তারিখ ও কাবিন নিবন্ধনের তথ্য, তালাক দেওয়ার তারিখ, আর স্বামীর সই থাকা উচিত। প্রাপ্তিস্বীকারসহ রেজিস্ট্রি ডাকে পাঠান এবং রসিদ রাখুন।
ধারা ৮: খুলা ও অর্পিত তালাক
স্ত্রীর তালাকের অর্পিত ক্ষমতা থাকলে (তালাক-ই-তাফউইজ, কাবিননামার ১৮ নম্বর ঘর) বা স্বামী-স্ত্রী খুলায় রাজি হলে ধারা ৮ ধারা ৭-এর পদ্ধতি প্রয়োগ করে: চেয়ারম্যানকে লিখিত নোটিশ, অন্য পক্ষকে কপি, আর ৯০ দিন। এরপর কাজীর কাছে তালাক নিবন্ধন হয়।
ধারা ৯ ও ১০: ভরণপোষণ ও দেনমোহর
- ধারা ৯: স্ত্রী ভরণপোষণ না পেলে, বা অন্য স্ত্রীদের সমান না পেলে, চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করতে পারেন। সালিশি পরিষদ অঙ্ক নির্ধারণ করে সনদ দিতে পারে, যা বকেয়া ভূমি রাজস্বের মতো আদায়যোগ্য। বাস্তবে এখন বেশিরভাগ স্ত্রী পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩ অনুযায়ী পারিবারিক আদালতে ভরণপোষণ দাবি করেন।
- ধারা ১০: নিকাহনামায় দেনমোহর কীভাবে পরিশোধ হবে তা না থাকলে পুরো দেনমোহর চাহিবামাত্র পরিশোধযোগ্য ধরা হয়।
লিখিত নোটিশ
চেয়ারম্যানকে, অন্য পক্ষকে কপি।
সালিশি পরিষদ
৩০ দিনের মধ্যে, সমঝোতার জন্য।
৯০ দিন
তালাক কার্যকর, বা গর্ভাবস্থা শেষে।
নিবন্ধন
কাজীর কাছে, তারপর সনদ সংগ্রহ।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ কী?
বাংলাদেশে মুসলিম তালাক, দ্বিতীয় বিয়ে, ভরণপোষণ, দেনমোহর ও এতিম নাতি-নাতনির উত্তরাধিকার নিয়ন্ত্রণকারী প্রধান আইন।
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ধারা ৪ কী বলে?
দাদা-দাদি বা নানা-নানির আগে মারা যাওয়া ছেলে বা মেয়ের সন্তানরা তাঁদের বাবা-মায়ের প্রাপ্য অংশ পান।
ধারা ৬ কী বলে?
আরেকটি বিয়ের জন্য সালিশি পরিষদের লিখিত অনুমতি লাগে। না নিলে বর্তমান দেনমোহর সঙ্গে সঙ্গে দিতে হয় এবং এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অনধিক ১০,০০০ টাকা জরিমানা, বা উভয় হতে পারে।
ধারা ৭ কী বলে?
তালাকে চেয়ারম্যানকে লিখিত নোটিশ ও স্ত্রীকে কপি দিতে হয়; চেয়ারম্যান নোটিশ পাওয়ার ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর।
সালিশি পরিষদ কী?
ইউনিয়ন পরিষদ বা সিটি কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান ও স্বামী-স্ত্রীর একজন করে প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত পরিষদ, যা সমঝোতা ও দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতির কাজ করে।
তালাকের নোটিশ ফরমে কী লিখতে হয়?
স্বামী-স্ত্রীর নাম ও ঠিকানা, বিয়ের তারিখ ও কাবিন নিবন্ধনের তথ্য, তালাকের তারিখ ও স্বামীর সই; রেজিস্ট্রি ডাকে পাঠাতে হয়।
খুলা তালাকেও কি এই আইন প্রযোজ্য?
হ্যাঁ। ধারা ৮ খুলা ও অর্পিত তালাকে ধারা ৭-এর নোটিশ ও ৯০ দিনের পদ্ধতি প্রয়োগ করে।
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ বাংলা পিডিএফ কোথায় পাব?
সরকারি আইন পোর্টালে (bdlaws) আইনটির সরকারি পাঠ আছে। অধ্যাদেশটি ইংরেজিতে প্রণীত; বাংলা অনুবাদ পাওয়া যায়, তবে সরকারি পাঠের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
পরিবার ও বিয়ে বিষয়ে আরও পড়ুন
তালাক, বিয়ে, সন্তানের হেফাজত, দেনমোহর ও ভরণপোষণ।
তালাক দেওয়ার নিয়ম ও ডিভোর্সের খরচ: নোটিশ, ৯০ দিন, খুলা (২০২৬)
দ্বিতীয় বিয়ের আইন: স্ত্রীর অনুমতি, সালিশি পরিষদ ও শাস্তি
তালাক ও বিবাহ বিচ্ছেদ
নারী নির্যাতন মামলা: করার নিয়ম, ধারা, শাস্তি ও খরচ (২০২৬)
মেয়েরা কিভাবে ডিভোর্স দেয়: খুলা ও তালাক-ই-তাফউইজের নিয়ম
পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন ২০১০: সুরক্ষা আদেশ
কাবিননামা: প্রতিটি ঘরের মানে, কপি তোলা ও ভুল সংশোধন
ডিভোর্স পেপার ও তালাকনামা: কোথায় পাবেন, কী থাকে
কোর্ট ম্যারেজ করতে কি কি লাগে: নিয়ম, বয়স ও খরচ (২০২৬)
ডিভোর্সের পর সন্তানের হেফাজত ও অভিভাবকত্ব আইন: মা-বাবার অধিকার
দেনমোহর কি ও কত টাকা: দেনমোহর ও খোরপোষ আদায়ের নিয়ম
হিন্দু বিবাহ রেজিস্ট্রেশন: নিয়ম, ফি, ফরম ও কাগজপত্র
বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭: বিয়ের বয়স ও শাস্তি
পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩: মামলা, কোর্ট ফি ও আপিল
তালাক, দ্বিতীয় বিয়ে বা ভরণপোষণের সমস্যা?
আমরা তালাকের নোটিশ লিখি, সালিশি পরিষদ ও পারিবারিক আদালতে প্রতিনিধিত্ব করি, আর দেনমোহর ও উত্তরাধিকারে পরামর্শ দিই। লিখিত প্রাথমিক মূল্যায়ন বিনামূল্যে।

মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।