Skip to content
হোম/আইনি গাইড/কোর্ট ম্যারেজের আইনি নিয়ম
পারিবারিক

কোর্ট ম্যারেজের আইনি নিয়ম: বৈধতা, বয়স, কাজী নিবন্ধন ও খরচ

প্রতি সপ্তাহেই কোনো না কোনো দম্পতি নোটারির অফিসে গিয়ে “কোর্ট ম্যারেজ” চান। অনেকেই একটি এফিডেভিট হাতে নিয়ে ফেরেন এবং ভাবেন তারা বিয়ে করে ফেলেছেন। আসলে তা নয়। আইন আসলে কী চায়, এফিডেভিট কী কাজে লাগে, আর পরিবার আপত্তি তুললে নিজেদের কীভাবে সুরক্ষিত রাখবেন — এই গাইডে তা বলা হলো।

মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭বিশেষ বিবাহ আইন, ১৮৭২
শেয়ার করুন
বাংলাদেশে কোর্ট ম্যারেজের জন্য নিকাহ নিবন্ধন বই ও বিয়ের এফিডেভিট
এক নজরে
  • শুধু এফিডেভিট বিয়ে হিসেবে গণ্য হয় না
  • সর্বনিম্ন বয়স: পুরুষের ২১, নারীর ১৮
  • মুসলিম বিয়ে অবশ্যই কাজীর কাছে নিবন্ধন করাতে হয়
  • নিবন্ধন না করালে: সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড বা ৩,০০০ টাকা জরিমানা, অথবা উভয়ই

এই গাইডে যা আছে: মুসলিম বিয়ে বৈধ হওয়ার শর্ত · নিবন্ধন বাধ্যতামূলক · তাহলে মানুষ এফিডেভিট করে কেন? · পরিবার মামলা করলে · ভিন্ন ধর্মের মধ্যে বিয়ে · হিন্দু ও খ্রিস্টান বিয়ে · বয়স না হতেই বিয়ে

সংক্ষিপ্ত উত্তর

বাংলাদেশে “কোর্ট ম্যারেজ” নামে আলাদা কোনো আইনি প্রক্রিয়া নেই। এই কথাটি দিয়ে সাধারণত বোঝানো হয় নোটারি পাবলিকের সামনে করা একটি এফিডেভিট , যেখানে দুই প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ঘোষণা দেন যে তারা নিজেদের ইচ্ছায় বিয়ে করেছেন। এই এফিডেভিট সম্মতির প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগে, তবে এটি নিজে থেকে কোনো বিয়ে নয়। বৈধ বিয়ের জন্য আপনার ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী নির্ধারিত অনুষ্ঠান লাগে, আর মুসলিমদের ক্ষেত্রে নিকাহ রেজিস্ট্রারের (কাজী) কাছে নিবন্ধনও লাগে।

মুসলিম বিয়ে বৈধ হওয়ার শর্ত

  • দুই পক্ষই আইনি বয়সে পৌঁছেছেন: পুরুষের ক্ষেত্রে ২১ ও নারীর ক্ষেত্রে ১৮ (বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭)।
  • একই বৈঠকে স্পষ্ট প্রস্তাব ও তাতে সম্মতি (ইজাব-কবুল)।
  • দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম সাক্ষী (দুইজন পুরুষ, বা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী)।
  • দেনমোহর নির্ধারণ ও তা লিখিতভাবে নথিভুক্ত।
  • কোনো আইনি বাধা না থাকা, যেমন নিকট রক্তসম্পর্ক বা নারীর আগে থেকেই বিবাহিত থাকা।

বাংলাদেশে প্রচলিত হানাফি আইন অনুযায়ী একজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নারীর বিয়ের জন্য অভিভাবকের সম্মতির দরকার নেই। পরিবারের অনুমোদন সামাজিক বিষয়, আইনি শর্ত নয়।

নিবন্ধন বাধ্যতামূলক

প্রতিটি মুসলিম বিয়ে লাইসেন্সপ্রাপ্ত নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাছে নিবন্ধন করাতে হবে। নিবন্ধন না করালে সর্বোচ্চ দুই বছরের সাধারণ কারাদণ্ড, ৩,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডই হতে পারে। নিবন্ধন না হলেই যে বিয়ে বাতিল হয়ে যায়, তা নয়, তবে তা প্রমাণ করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে — আর এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় স্ত্রীর, কারণ দেনমোহর, ভরণপোষণ, উত্তরাধিকার ও সন্তানের কাগজপত্র — সবকিছুই নির্ভর করে প্রমাণের ওপর।

কাজীর ফি নির্ধারণ হয় দেনমোহরের ওপর ভিত্তি করে। বর্তমান বিধি অনুযায়ী তা প্রায় ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত দেনমোহরের প্রতি ১,০০০ টাকায় ১৪ টাকা, এরপর প্রতি অতিরিক্ত লাখে ১০০ টাকা, তবে সর্বনিম্ন ফি ২০০ টাকা (মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯, ডিসেম্বর ২০২২-এ সংশোধিত)। সবসময় সরকারি রশিদ ও নিকাহনামার প্রত্যয়িত কপি চেয়ে নিন।

বাংলাদেশে কোর্ট ম্যারেজের এফিডেভিট ও নিকাহ নিবন্ধনের মধ্যে পার্থক্য

তাহলে মানুষ এফিডেভিট করে কেন?

পরিবার আপত্তি করলে অনেক দম্পতি নিকাহ করে কাজীর কাছে নিবন্ধন করান, এরপর একটি এফিডেভিট করেন যেখানে বলা হয় তারা প্রাপ্তবয়স্ক ও স্বেচ্ছায় বিয়ে করেছেন। এভাবে ব্যবহার করলে এফিডেভিট একটি বাড়তি প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগে, বিশেষ করে মেয়ের পরিবার পরে অপহরণের অভিযোগে মামলা করলে। এখানে ক্রমটি গুরুত্বপূর্ণ: আগে নিকাহ ও নিবন্ধন, তারপর এফিডেভিট.

পরিবার মামলা করলে

আপত্তি তোলা পরিবারের একটি সাধারণ প্রতিক্রিয়া হলো নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে অপহরণ বা ধর্ষণের অভিযোগ আনা। আপনারা দুজনেই প্রাপ্তবয়স্ক এবং বৈধভাবে বিবাহিত হলে:

  • প্রত্যয়িত নিকাহনামা, এফিডেভিট, দুজনের এনআইডি বা জন্মসনদ এবং বিয়ের অনুষ্ঠানের ছবি সংরক্ষণ করুন।
  • ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে স্ত্রীর নিজের জবানবন্দিতে তিনি স্বেচ্ছায় বিয়ে করেছেন বলে জানানোটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।
  • স্বামী ও তার পরিবারের জন্য আগাম জামিন নিয়ে দ্রুত আইনি পরামর্শ নিন। বিস্তারিত দেখুন আমাদের মিথ্যা মামলা সংক্রান্ত গাইডে.

ভিন্ন ধর্মের মধ্যে বিয়ে

মুসলিম আইনে একজন মুসলিম পুরুষ একজন খ্রিস্টান বা ইহুদি নারীকে বিয়ে করতে পারেন। অন্য ধর্মের মধ্যে বিয়ে হয় বিশেষ বিবাহ আইন, ১৮৭২ অনুযায়ী, যাতে বিবাহ নিবন্ধকের কাছে নোটিশ, একটি অপেক্ষার সময়কাল, তিনজন সাক্ষী এবং দুই পক্ষের একটি ঘোষণাপত্র লাগে। এই আইনের প্রচলিত ফর্মে বলতে হয় যে পক্ষদ্বয় নির্দিষ্ট কিছু ধর্মে বিশ্বাসী নন, যার পারিবারিক ও উত্তরাধিকার অধিকারের ওপর প্রভাব পড়ে, তাই এই পথ বেছে নেওয়ার আগে পরামর্শ নিয়ে নিন।

হিন্দু ও খ্রিস্টান বিয়ে

হিন্দু বিয়ে সম্পন্ন হয় ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী। হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন, ২০১২ অনুযায়ী নিবন্ধন ঐচ্ছিক, তবে পাসপোর্ট, ভিসা ও উত্তরাধিকারের জন্য তা করিয়ে রাখাই ভালো। খ্রিস্টান বিয়ে সম্পন্ন হয় খ্রিস্টান বিবাহ আইন, ১৮৭২ অনুযায়ী, অনুমোদিত যাজক বা নিবন্ধকের মাধ্যমে।

বয়স না হতেই বিয়ে

নারীর বয়স ১৮-এর কম বা পুরুষের বয়স ২১-এর কম হলে সেটি বাল্যবিবাহ হিসেবে গণ্য হয়। যে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি একটি শিশুকে বিয়ে করেন, যেসব বাবা-মা এই বিয়ে ঠিক করেন, এবং যিনি এই বিয়ে সম্পন্ন বা নিবন্ধন করেন — সবাইকেই কারাদণ্ড ও জরিমানার মুখে পড়তে হতে পারে। বাল্যবিবাহ নিবন্ধন করা কাজীরও লাইসেন্স হারানোর ঝুঁকি থাকে। ভুয়া জন্মসনদের ওপর ভরসা করবেন না — এতে জড়িত সবার ওপরই ঝুঁকি এসে পড়ে।

এটি সাধারণ তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়। আপনার বিয়েতে আপত্তি থাকলে, বা ভিন্ন ধর্ম বা ভিন্ন দেশের মধ্যে বিয়ে করতে চাইলে, অনুষ্ঠানের আগেই পরামর্শ নিন — মামলা হওয়ার পরে নয়।
বৈধভাবে বিয়ে করুন
1

বয়স ও কাগজপত্র যাচাই

উভয়ের এনআইডি বা জন্মসনদ, যাতে পুরুষের বয়স ২১+ ও নারীর বয়স ১৮+ প্রমাণিত হয়।

2

সাক্ষীসহ নিকাহ

দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষীর সামনে প্রস্তাব ও কবুল, দেনমোহর ঠিক করে।

3

কাজীর কাছে নিবন্ধন

একই দিনে নিবন্ধন করান, রশিদ নিয়ে ফি পরিশোধ করুন এবং প্রত্যয়িত নিকাহনামা সংগ্রহ করুন।

4

প্রয়োজনে এফিডেভিট

পরিবার আপত্তি করলে স্বেচ্ছা সম্মতির একটি নোটারিকৃত এফিডেভিট যোগ করুন এবং কপি সংরক্ষণ করুন।

শুধু এফিডেভিট আপনাদের স্বামী-স্ত্রী বানায় না। মূল কাজটা করে নিবন্ধনই।পরামর্শের সময় নিন

সাধারণ জিজ্ঞাসা

বাংলাদেশে কোর্ট ম্যারেজ কি বৈধ?

যাকে সাধারণত কোর্ট ম্যারেজ বলা হয়, সেই এফিডেভিট একটি ঘোষণাপত্র হিসেবে বৈধ, তবে এটি নিজে থেকে বিয়ে নয়। আপনার ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী বিয়ে করতে হবে, আর মুসলিমদের ক্ষেত্রে কাজীর কাছে নিবন্ধন করাতে হবে।

বাংলাদেশে বিয়ের আইনি বয়স কত?

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী পুরুষের ক্ষেত্রে ২১ ও নারীর ক্ষেত্রে ১৮।

বাংলাদেশে কোর্ট ম্যারেজের খরচ কেমন?

কাজীর নিবন্ধন ফি নির্ভর করে দেনমোহরের ওপর, বর্তমানে প্রায় ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত দেনমোহরের প্রতি ১,০০০ টাকায় ১৪ টাকা। এফিডেভিট ও নোটারির খরচ এবং আইনজীবীর ফি আলাদা।

বাংলাদেশে মেয়েরা কি বাবা-মায়ের সম্মতি ছাড়া বিয়ে করতে পারে?

হানাফি আইন অনুযায়ী একজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নারী (১৮ বা তার বেশি বয়সী) অভিভাবকের সম্মতি ছাড়াই বিয়ে করতে পারেন। তবে বিয়েটি অবশ্যই যথাযথভাবে সম্পন্ন ও নিবন্ধিত হতে হবে।

নিবন্ধনহীন বিয়ে কি বৈধ?

নিবন্ধনহীন মুসলিম বিয়ে এমনিতে বাতিল হয়ে যায় না, তবে নিবন্ধন না করানো একটি অপরাধ, আর দেনমোহর, ভরণপোষণ ও উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে এই বিয়ে প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিয়ে নিবন্ধনের জন্য কী কী কাগজপত্র লাগে?

সাধারণত কনে-বর দুজনের এনআইডি বা জন্মসনদ, পাসপোর্ট আকারের ছবি এবং সাক্ষীদের বিবরণ ও পরিচয়পত্র লাগে। আগে বিবাহবিচ্ছেদ বা স্বামী/স্ত্রী মারা যাওয়া ব্যক্তির ক্ষেত্রে তালাক নিবন্ধন বা মৃত্যুসনদ সঙ্গে আনতে হবে।

বাংলাদেশে কি একজন মুসলিম একজন হিন্দুকে বিয়ে করতে পারেন?

মুসলিম পারিবারিক আইনে তা সম্ভব নয়। এমন দম্পতিরা সাধারণত বিশেষ বিবাহ আইন, ১৮৭২ ব্যবহার করেন, যার নির্দিষ্ট শর্ত ও প্রভাব রয়েছে, তাই আগে আইনি পরামর্শ নিয়ে নিন।

বিয়ের পর মেয়ের পরিবার অপহরণের মামলা করলে কী হবে?

নিবন্ধিত নিকাহনামা ও এফিডেভিট সংরক্ষণ করুন এবং দ্রুত আগাম জামিন নিয়ে পরামর্শ নিন। প্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রীর নিজের বক্তব্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে তিনি স্বেচ্ছায় বিয়ে করেছেন বলে জানানোই মূল প্রমাণ।

শেয়ার করুন

মন্তব্য

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।

মন্তব্য লিখুন

সব মন্তব্য প্রকাশের আগে চেম্বার থেকে যাচাই করা হয়। মামলার গোপন তথ্য, ফোন নম্বর বা লিংক দেবেন না। এখানে দেওয়া উত্তর সাধারণ তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়; নির্দিষ্ট বিষয়ে পরামর্শের জন্য চেম্বারে যোগাযোগ করুন।

পরিবারের অনুমোদন ছাড়া বিয়ে করছেন?

আমরা যথাযথভাবে বিয়ে নিবন্ধন করি, এফিডেভিট তৈরি করি এবং প্রতিশোধমূলক মামলার বিরুদ্ধে দম্পতিদের পক্ষে লড়ি।