ডিভোর্সের পর সন্তানের হেফাজত: মায়ের অধিকার, বাবার অভিভাবকত্ব ও আদালতের মানদণ্ড
পারিবারিক আদালতে হেফাজতের মামলাগুলোই সবচেয়ে কঠিন হয়ে ওঠে। “সাত বছর পর্যন্ত ছেলে মায়ের কাছে থাকে”, “বাবাই সবসময় অভিভাবক” — মানুষ একে অপরকে এসব কথা শোনায়, কিন্তু এগুলো শুধু শুরুর বিন্দু মাত্র। আসল বিষয় হলো সন্তানের কল্যাণ, আর কে কতটা ভালোভাবে সেটা প্রমাণ করতে পারছেন, তার ওপরই মামলার ফল নির্ভর করে।
- হেফাজত (হিজানত) ও অভিভাবকত্ব সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি অধিকার
- মা: ছেলে সাত বছর পর্যন্ত, মেয়ে বয়ঃসন্ধি পর্যন্ত, তবে সন্তানের কল্যাণ সাপেক্ষে
- মামলা যায় পারিবারিক আদালতে
- হেফাজত যার কাছেই থাকুক, বাবাকেই সন্তানের ভরণপোষণ দিতে হবে
এই গাইডে যা আছে: হেফাজত ও অভিভাবকত্ব আলাদা বিষয় · আদালত যেভাবে সিদ্ধান্ত নেয়: কল্যাণের মানদণ্ড · কোথায় মামলা করবেন · দেখাসাক্ষাতের অধিকার · সন্তানের ভরণপোষণ · সন্তানকে বিদেশে নিয়ে যাওয়া · হেফাজতের মামলায় জেতার মতো প্রমাণ
সংক্ষিপ্ত উত্তর
বাংলাদেশের আইনে আলাদা করা হয়েছে হেফাজত (দৈনন্দিন জীবনে সন্তান কার কাছে থাকবে, যাকে হিজানত বলা হয়) এবং অভিভাবকত্ব (আইনি ও সম্পত্তি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত কে নেবেন, যা প্রথাগতভাবে বাবার হাতে থাকে)। হানাফি আইন অনুযায়ী মা ছেলের সাত বছর বয়স পর্যন্ত এবং মেয়ের বয়ঃসন্ধি পর্যন্ত হেফাজত পাওয়ার অধিকারী। তবে অভিভাবকত্ব ও ওয়ার্ডস আইন, ১৮৯০ অনুযায়ী আদালতের কাছে সবচেয়ে বড় বিবেচ্য বিষয় হলো সন্তানের কল্যাণ, আর সন্তানের কল্যাণের প্রয়োজনে বাংলাদেশের আদালত নিয়মিতভাবেই এই বয়সসীমা থেকে সরে আসে।
হেফাজত ও অভিভাবকত্ব আলাদা বিষয়
হেফাজতে থাকা মায়েরও কিছু আইনি বিষয়ে বাবার অংশগ্রহণ প্রয়োজন হয়, আবার স্বাভাবিক অভিভাবক হওয়ার কারণেই বাবা মায়ের হিজানতের সময়কালে সন্তানকে কেড়ে নেওয়ার অধিকার পান না। স্কুল, পাসপোর্ট, ভ্রমণের মতো বাস্তব বিরোধগুলো মূলত এই দুই অধিকারের সংঘর্ষস্থলেই তৈরি হয়।
আদালত যেভাবে সিদ্ধান্ত নেয়: কল্যাণের মানদণ্ড
অভিভাবকত্ব ও ওয়ার্ডস আইনের ধারা ১৭ অনুযায়ী আদালতকে সন্তানের ব্যক্তিগত আইনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে তার কল্যাণ বিবেচনা করতে হয়। আদালত যেসব বিষয় দেখে:
- সন্তানের বয়স ও লিঙ্গ, এবং যথেষ্ট বড় হলে তার নিজের মতামত;
- বাস্তবে কে সন্তানের দেখাশোনা করে আসছে, এবং স্কুল ও বাসস্থানের ধারাবাহিকতা;
- প্রতিটি অভিভাবকের চরিত্র, স্বাস্থ্য, আচরণ ও দেখাশোনার সক্ষমতা;
- বাসার পরিবেশ, নতুন স্বামী বা স্ত্রী থাকলে তাও;
- কোনো সহিংসতা, অবহেলা বা মাদকাসক্তি থাকলে তা।
উল্লেখযোগ্য একটি মামলায় আবু বকর সিদ্দিক বনাম এস.এম.এ. বকর (৩৮ ডিএলআর (এডি) ১০৬)-এ আপিল বিভাগ একজন মাকে সাত বছরের বেশি বয়স হয়ে যাওয়ার পরও ছেলের হেফাজত রাখতে দিয়েছিল, কারণ সেটাই ছিল সন্তানের কল্যাণের পক্ষে। পরবর্তী রায়গুলোতেও বলা হয়েছে যে মায়ের পুনর্বিবাহ হলেই তার হেফাজত এমনিতে শেষ হয়ে যায় না।
কোথায় মামলা করবেন
হেফাজত ও অভিভাবকত্বের মামলা যায় পারিবারিক আদালতে , পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩ অনুযায়ী, সাধারণত যেখানে সন্তান স্বাভাবিকভাবে বসবাস করে সেখানকার আদালতে। যেসব জেলায় বাধ্যতামূলক প্রাক-মামলা মধ্যস্থতা চালু হয়েছে, সেখানে বিরোধ প্রথমে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে যায়। সন্তানকে জোর করে নিয়ে যাওয়া হলে বা বেআইনিভাবে আটকে রাখা হলে, সন্তানকে হাজির করার আদেশের জন্য হাইকোর্ট বিভাগে যাওয়া যায়।
দেখাসাক্ষাতের অধিকার
হেফাজতে না থাকা অভিভাবকও সাধারণত সন্তানের সাথে দেখা করার অধিকার রাখেন। আদালত একটি সময়সূচি ঠিক করে দেয়, যেমন এক সপ্তাহ পরপর, ছুটির দিনে বা ভিডিও কলে, এবং হস্তান্তরের জন্য একটি নিরপেক্ষ জায়গাও নির্ধারণ করে দিতে পারে। সম্মত বা আদালতের নির্দেশিত দেখাসাক্ষাতে বাধা দিলে পরবর্তীতে আদালত সেটিকে বাধাদানকারী অভিভাবকের বিপক্ষে বিবেচনা করবে।
সন্তানের ভরণপোষণ
হেফাজত যার কাছেই থাকুক বা তালাক হয়ে গেলেও, সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব বাবার ওপর বহাল থাকে। পারিবারিক আদালত বাবার সামর্থ্য ও সন্তানের প্রয়োজন — স্কুল ও চিকিৎসার খরচসহ — বিবেচনা করে একটি পরিমাণ নির্ধারণ করে দেয়, এবং বকেয়া থাকলে তা পরিশোধেরও আদেশ দিতে পারে।
সন্তানকে বিদেশে নিয়ে যাওয়া
এখানেই হেফাজতের মামলা জরুরি অবস্থায় রূপ নেয়। আদালতের নিযুক্ত বা ঘোষিত অভিভাবক অনুমতি ছাড়া সন্তানকে আদালতের এখতিয়ারের বাইরে নিয়ে যেতে পারেন না (ধারা ২৬)। সন্তানকে নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে দ্রুত নিষেধাজ্ঞার আবেদন করুন এবং আদালতকে সন্তানের পাসপোর্টের বিষয়টি দেখতে বলুন। বাংলাদেশ হেগ শিশু অপহরণ কনভেনশনের সদস্য নয়, তাই একবার বিদেশে চলে গেলে সন্তানকে ফিরিয়ে আনা ধীর ও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তাই আগে থেকে প্রতিরোধ করাই সবচেয়ে জরুরি।
হেফাজতের মামলায় জেতার মতো প্রমাণ
- স্কুলের রেকর্ড, রিপোর্ট কার্ড ও শিক্ষকদের চিঠি, যা দেখায় কে সন্তানের বিষয়ে যুক্ত আছেন।
- চিকিৎসার নথি ও টিকা কার্ড।
- দৈনন্দিন দেখাশোনার প্রমাণ দেয় এমন ছবি ও বার্তা।
- আয়ের প্রমাণ ও উপযুক্ত বাসস্থানের প্রমাণ।
- সহিংসতার কোনো জিডি, পুলিশি বা চিকিৎসা রেকর্ড থাকলে তা।
প্রমাণ সংগ্রহ করুন
স্কুল, চিকিৎসা ও আর্থিক নথি, সাথে কে দেখাশোনা করে আসছেন তার প্রমাণ।
আগে মধ্যস্থতা করুন
লিখিত অভিভাবকত্ব ব্যবস্থার চেষ্টা করুন, বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক প্রাক-মামলা মধ্যস্থতা সম্পন্ন করুন।
পারিবারিক আদালতে মামলা করুন
হেফাজত, দেখাসাক্ষাত ও ভরণপোষণের জন্য আবেদন করুন, জরুরি হলে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের আবেদনও করুন।
সরিয়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে সুরক্ষা নিন
সন্তানকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকলে ভ্রমণ ও পাসপোর্টের ওপর নিষেধাজ্ঞা চান।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বাংলাদেশে তালাকের পর সন্তানের হেফাজত কে পান?
হানাফি আইন অনুযায়ী মা ছেলের সাত বছর পর্যন্ত এবং মেয়ের বয়ঃসন্ধি পর্যন্ত হেফাজত পান, তবে আদালত সন্তানের কল্যাণ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয় এবং এই সীমা থেকে সরে আসতে পারে।
মা পুনর্বিবাহ করলে কি হেফাজত হারান?
এমনিতেই নয়। প্রথাগত আইনে এমনটা বলা হলেও বাংলাদেশের আদালত সন্তানের কল্যাণ বিবেচনা করে, আর পুনর্বিবাহ তার একটি মাত্র বিবেচ্য বিষয়।
বাবা কি মায়ের কাছ থেকে সন্তান নিয়ে যেতে পারেন?
জোর করে নয়। অভিভাবক হিসেবে বাবাকে পারিবারিক আদালতে আবেদন করতে হবে। সন্তানকে বেআইনিভাবে নিয়ে গেলে মা জরুরি আদালতের আদেশ চাইতে পারেন, প্রয়োজনে হাইকোর্ট বিভাগ থেকেও।
কোন বয়সে সন্তান নিজে কোন অভিভাবকের কাছে থাকবে তা বেছে নিতে পারে?
নির্দিষ্ট কোনো বয়স নেই। যে সন্তান বুদ্ধিমত্তার সাথে নিজের মত গঠন করার মতো যথেষ্ট পরিণত, সাধারণত বয়সে বড় সন্তান, তার পছন্দকে আদালত গুরুত্ব দেয়।
মায়ের কাছে হেফাজত থাকলেও কি বাবাকে ভরণপোষণ দিতে হয়?
হ্যাঁ। হেফাজত যার কাছেই থাকুক, বাবাকে সন্তানের ভরণপোষণ দিতেই হবে।
আমার সাবেক স্বামী/স্ত্রী সন্তানকে বিদেশে নিয়ে যাওয়া কি আমি আটকাতে পারি?
হ্যাঁ, দ্রুত পারিবারিক আদালতে নিষেধাজ্ঞা ও সন্তানের পাসপোর্ট সংক্রান্ত নির্দেশনার জন্য আবেদন করুন। আদালতের নিযুক্ত অভিভাবক অনুমতি ছাড়া সন্তানকে এখতিয়ারের বাইরে নিয়ে যেতে পারেন না।
হেফাজতের মামলা নিষ্পত্তি হতে কত সময় লাগে?
এটি নির্ভর করে আদালতের কার্যভার ও মামলাটি বিতর্কিত কিনা তার ওপর। মূল মামলা চলাকালীনই অন্তর্বর্তীকালীন হেফাজত ও দেখাসাক্ষাতের আদেশ আগেভাগে চাওয়া যায়।
কোন আদালতে হেফাজতের মামলার শুনানি হয়?
পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩ অনুযায়ী পারিবারিক আদালতে, সাধারণত যেখানে সন্তান বসবাস করে সেখানে। আপিল যায় জেলা জজের কাছে।
সন্তানের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে এখানে
হেফাজত, দেখাসাক্ষাত ও সরিয়ে নেওয়া সংক্রান্ত মামলায় এবং মধ্যস্থতার মাধ্যমে অভিভাবকত্ব চুক্তিতে আমরা মা ও বাবা উভয়ের পক্ষেই কাজ করি।
মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।