বাবার সম্পত্তি ভাগের নিয়ম: ছেলে, মেয়ে ও স্ত্রী কে কত পাবেন
বাবা মারা গেলে তাঁর জমি ও টাকা নির্দিষ্ট অংশে ওয়ারিশদের কাছে যায়। মুসলমানদের ক্ষেত্রে এই অংশ আসে কুরআনভিত্তিক ফারায়েজের নিয়ম থেকে, যা বাংলাদেশের আদালত প্রয়োগ করেন। এখানে আছে কে কত পাবেন, উদাহরণসহ হিসাব, ছেলে না থাকলে কী বদলায়, আর জমি ওয়ারিশদের নামে আনার ধাপ।
- স্ত্রী: সন্তান থাকলে ১/৮, না থাকলে ১/৪
- বাকিটা ছেলেমেয়েরা পান, ছেলে মেয়ের দ্বিগুণ
- সন্তান থাকলে মৃতের জীবিত বাবা-মা প্রত্যেকে ১/৬
- ছেলে না থাকলে মেয়েরা ১/২ বা ২/৩, বাকিটা অন্য আত্মীয়দের
এই গাইডে: বাবার সম্পত্তি কে কতটুকু পাবে: মুসলিম আইনে অংশ · উদাহরণ: ৬০ শতাংশ জমি কীভাবে ভাগ হবে · বাবার সম্পত্তি ভাগের নিয়ম ছেলে না থাকলে · বাবা জীবিত থাকতে কি এক সন্তানকে সম্পত্তি দিতে পারেন? · হিন্দু বাবার সম্পত্তি ভাগের নিয়ম (দায়ভাগ) · বাবা মারা যাওয়ার পর করণীয়: ওয়ারিশ সনদ থেকে আলাদা জমি
সংক্ষেপে উত্তর
বাংলাদেশে মুসলিম আইনে বাবার সম্পত্তি ভাগ হয় দাফন-কাফনের খরচ, দেনা ও স্ত্রীর অপরিশোধিত দেনমোহর মেটানোর পর। সন্তান থাকলে স্ত্রী পান ১/৮ (সন্তান না থাকলে ১/৪)। মৃতের বাবা ও মা জীবিত থাকলে প্রত্যেকে ১/৬। বাকিটা পান সন্তানেরা, প্রত্যেক ছেলে প্রত্যেক মেয়ের দ্বিগুণ। ছেলে না থাকলে এক মেয়ে পান ১/২, দুই বা তার বেশি মেয়ে মিলে ২/৩, আর বাকিটা যায় মৃতের বাবা বা ভাইয়ের মতো অন্য আত্মীয়দের কাছে। বাবা জীবিত থাকতে কেউ ওয়ারিশ হন না।
বাবার সম্পত্তি কে কতটুকু পাবে: মুসলিম আইনে অংশ
| ওয়ারিশ | অংশ |
|---|---|
| স্ত্রী | সন্তান থাকলে ১/৮; না থাকলে ১/৪। একাধিক স্ত্রী থাকলে এই অংশ সমান ভাগ। |
| মৃতের বাবা | সন্তান থাকলে ১/৬; ছেলে না থাকলে বাকি অংশও পান |
| মৃতের মা | সন্তান থাকলে ১/৬ |
| ছেলে ও মেয়ে একসঙ্গে | বাকি সম্পত্তি, প্রত্যেক ছেলে প্রত্যেক মেয়ের দ্বিগুণ |
| শুধু এক মেয়ে, ছেলে নেই | ১/২ |
| দুই বা তার বেশি মেয়ে, ছেলে নেই | ২/৩, সমান ভাগে |
| বাবার আগে মারা যাওয়া ছেলে বা মেয়ের সন্তান | তাদের বাবা বা মায়ের অংশ (মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১, ধারা ৪) |
বিবাহিত মেয়ে অবিবাহিত মেয়ের মতোই ওয়ারিশ। ভাগের আগে দাফন-কাফনের খরচ ও দেনা মেটাতে হয়, বিধবার অপরিশোধিত দেনমোহরসহ, যা সম্পত্তির ওপর দেনা। এরপর বৈধ অসিয়ত (সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ)। ওয়ারিশদের পুরো তালিকা দেখুন মুসলিম উত্তরাধিকার আইন গাইডে, অথবা ব্যবহার করুন ফারায়েজ ক্যালকুলেটর।
উদাহরণ: ৬০ শতাংশ জমি কীভাবে ভাগ হবে
| রেখে যাওয়া পরিবার | ৬০ শতাংশের ভাগ |
|---|---|
| ক. স্ত্রী, ২ ছেলে, ১ মেয়ে | স্ত্রী ৭.৫; প্রত্যেক ছেলে ২১; মেয়ে ১০.৫ |
| খ. স্ত্রী, ১ ছেলে, ১ মেয়ে, মৃতের বাবা ও মা জীবিত | স্ত্রী ৭.৫; বাবা ১০; মা ১০; ছেলে ২১.৬৭; মেয়ে ১০.৮৩ |
| গ. স্ত্রী, ২ মেয়ে, মা জীবিত, এক আপন ভাই; ছেলে নেই, বাবা মৃত | স্ত্রী ৭.৫; মা ১০; প্রত্যেক মেয়ে ২০; ভাই ২.৫ |
| ঘ. স্ত্রী ও ১ মেয়ে, মৃতের বাবা জীবিত | স্ত্রী ৭.৫; মেয়ে ৩০; বাবা ২২.৫ (নিজের ১০ ও বাকি ১২.৫) |
উদাহরণ ক-এর হিসাব: স্ত্রী পান ৬০-এর ১/৮, অর্থাৎ ৭.৫। বাকি থাকে ৫২.৫। প্রত্যেক ছেলেকে ২ ভাগ আর মেয়েকে ১ ভাগ ধরলে মোট ৫ ভাগ। এক ভাগ ১০.৫, তাই প্রত্যেক ছেলে ২১ আর মেয়ে ১০.৫ শতাংশ।
এগুলো সহজ উদাহরণ। দেনা, অসিয়ত, জীবদ্দশার দান, আগে মারা যাওয়া সন্তান বা দূরের আত্মীয় থাকলে হিসাব বদলায়। বণ্টননামা বা দলিলে সইয়ের আগে হিসাব যাচাই করিয়ে নিন।
বাবার সম্পত্তি ভাগের নিয়ম ছেলে না থাকলে
এটাই সবচেয়ে বেশি খোঁজা প্রশ্ন, আর উত্তর অনেক পরিবারকে অবাক করে। মেয়েরা আপনা-আপনি সবটা পান না।
- মেয়েদের নির্ধারিত অংশ: এক মেয়ে ১/২; দুই বা বেশি মেয়ে মিলে ২/৩।
- স্ত্রী ও মৃতের বাবা-মা তাঁদের অংশ পান: স্ত্রী ১/৮, বাবা ১/৬, মা ১/৬।
- বাকি অংশ যায় পিতৃকুলের নিকটতম পুরুষ আত্মীয়ের কাছে: প্রথমে মৃতের বাবা জীবিত থাকলে তিনি, না থাকলে আপন ভাই, তারপর বৈমাত্রেয় ভাই, তারপর ভাতিজা, এভাবে।
- এমন কেউ না থাকলে বাকি অংশ মেয়েরা ও অন্য রক্তসম্পর্কের অংশীদাররা তাঁদের অংশের অনুপাতে ফেরত পান। স্ত্রী এই ফেরত অংশ পান না।
তাই উপরের উদাহরণ গ-তে দুই মেয়ে থাকা সত্ত্বেও মৃতের ভাই অংশ পান। বাবা চাইলে জীবদ্দশায় হেবা করে মেয়েদের বেশি দিতে পারেন, নিচে দেখুন। দাদার আগে বাবা বা মা মারা গেলে নাতি-নাতনিরা মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ৪ ধারায় তাদের বাবা বা মায়ের অংশ পায়।
বাবা জীবিত থাকতে কি এক সন্তানকে সম্পত্তি দিতে পারেন?
পারেন, তবে সীমার মধ্যে। বাবা জীবিত থাকা পর্যন্ত সম্পত্তি তাঁর, কোনো সন্তান অংশ দাবি করতে পারে না। ছেলে, মেয়ে বা জামাই আগেভাগে ওয়ারিশি অংশ চাইতে পারেন না।
- হেবা (দান): বাবা জীবদ্দশায় যেকোনো সন্তানকে, অসমানভাবেও, জমি দান করতে পারেন। এজন্য স্পষ্ট ঘোষণা, গ্রহণ ও দখল হস্তান্তর লাগে, রেজিস্টার্ড দলিলে। দেখুন হেবা দলিলের নিয়ম।
- অসিয়ত (উইল): মুসলমান সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ সম্পত্তি অসিয়ত করতে পারেন। কোনো ওয়ারিশের, যেমন এক ছেলের, পক্ষে অসিয়ত কার্যকর হয় কেবল মৃত্যুর পর অন্য ওয়ারিশরা সম্মতি দিলে।
- মৃত্যুশয্যার দান: মৃত্যুর রোগে থাকা অবস্থায় দান অসিয়তের মতো গণ্য হয়, তাই এক-তৃতীয়াংশ ও ওয়ারিশদের সম্মতির নিয়ম খাটে।
- বিক্রি: প্রকৃত দামে সন্তানের কাছে প্রকৃত বিক্রি অন্য যেকোনো বিক্রির মতোই বৈধ।
অন্য ওয়ারিশদের বঞ্চিত করতে করা দান প্রায়ই জাল, চাপে করা বা কার্যকর হয়নি বলে আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়। প্রকাশ্যে দখল বুঝিয়ে দিয়ে ও নামজারি করে দান করলে সবাই নিরাপদ থাকেন।
হিন্দু বাবার সম্পত্তি ভাগের নিয়ম (দায়ভাগ)
বাংলাদেশের হিন্দুরা দায়ভাগ মত অনুসরণ করেন, যা ভারতের মতো বিধিবদ্ধ হয়নি। সংক্ষেপে:
- ছেলেরা, এবং আগে মারা যাওয়া ছেলের ছেলেরা, প্রথমে ওয়ারিশ হন।
- বিধবা স্ত্রী হিন্দু নারীর সম্পত্তির অধিকার আইন ১৯৩৭ অনুযায়ী একজন ছেলের সমান অংশ পান, তবে সীমিত স্বত্বে: জীবনভর ভোগ করতে পারেন, বিক্রি করতে পারেন কেবল আইনগত প্রয়োজনে। ২০২০ সালে হাইকোর্ট বিভাগের এক রায়ে বলা হয়েছে, এটি কৃষি জমিতেও প্রযোজ্য।
- মেয়েরা ওয়ারিশ হন কেবল ছেলে, ছেলের ছেলে বা বিধবা না থাকলে। অবিবাহিত মেয়ে ও পুত্রসন্তান আছে এমন মেয়ে অগ্রাধিকার পান, আর মেয়েও সীমিত স্বত্ব পান।
হিন্দু উত্তরাধিকারে অনেক সূক্ষ্ম বিষয় আছে। দলিলের আগে নির্দিষ্ট পরিবারের ব্যাপারে পরামর্শ নিন।
বাবা মারা যাওয়ার পর করণীয়: ওয়ারিশ সনদ থেকে আলাদা জমি
- দেনা মেটান, মায়ের অপরিশোধিত দেনমোহরসহ, আর কোনো অসিয়ত বা দান থাকলে তা লিখে রাখুন।
- ওয়ারিশ সনদ নিন ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন থেকে। দেখুন ওয়ারিশ সনদ গাইড।
- নামজারি: ই-নামজারির মাধ্যমে ওয়ারিশদের নাম খতিয়ানে তুলুন, যৌথভাবে বা অংশ অনুযায়ী। দেখুন নামজারি কীভাবে করবেন।
- জমি ভাগ: একমত হলে রেজিস্টার্ড বণ্টননামা, না হলে বাটোয়ারা মামলা।
- ভাগের পর আলাদা নামজারি ও খাজনা প্রত্যেক ওয়ারিশের অংশের জন্য।
বিদেশে থাকা ওয়ারিশকে প্রতিটি ধাপে দেশে আসতে হয় না; রেজিস্টার্ড বিদেশ থেকে পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি দিয়ে বিশ্বস্ত কাউকে দায়িত্ব দেওয়া যায়। বণ্টনের আগে কোনো ওয়ারিশ তাঁর অবিভক্ত অংশ বিক্রি করতে পারেন, কিন্তু ক্রেতার অগ্রক্রয় ও বাটোয়ারার ঝুঁকি থাকে, তাই বেশিরভাগ ক্রেতা আগে ভাগ হওয়া জমি পছন্দ করেন।
আগে দেনা
দাফন-কাফন, দেনা ও বিধবার দেনমোহর।
ওয়ারিশ সনদ
প্রত্যেক ওয়ারিশের নাম সঠিকভাবে।
অংশ হিসাব
ফারায়েজ অনুযায়ী, যাচাই করিয়ে।
বণ্টননামা ও নামজারি
দলিলে ভাগ, তারপর প্রত্যেক অংশের নামজারি।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বাবার সম্পত্তি ভাগের নিয়ম কী?
মুসলিম আইনে দেনা ও দেনমোহর মেটানোর পর সন্তান থাকলে স্ত্রী ১/৮, মৃতের বাবা-মা জীবিত থাকলে প্রত্যেকে ১/৬, আর বাকিটা সন্তানেরা পান, প্রত্যেক ছেলে প্রত্যেক মেয়ের দ্বিগুণ।
বাবার সম্পত্তি মেয়েরা কতটুকু পাবে?
ছেলে থাকলে প্রত্যেক মেয়ে বাকি অংশ থেকে ছেলের অর্ধেক পান। ছেলে না থাকলে এক মেয়ে ১/২, দুই বা বেশি মেয়ে মিলে ২/৩। বিবাহিত ও অবিবাহিত মেয়ের অধিকার একই।
ছেলে না থাকলে বাবার সম্পত্তি কিভাবে বন্টন হবে?
মেয়েরা তাঁদের নির্ধারিত ১/২ বা ২/৩, স্ত্রী ও মৃতের বাবা-মা নিজেদের অংশ পান, আর বাকিটা যায় পিতৃকুলের নিকটতম পুরুষ আত্মীয়, যেমন মৃতের বাবা বা ভাইয়ের কাছে। এমন কেউ না থাকলে বাকিটা মেয়েরা ও অন্য রক্তসম্পর্কের অংশীদাররা ফেরত পান।
বাবার সম্পত্তি মা কতটুকু পাবে?
স্বামীর কোনো সন্তান থাকলে বিধবা স্ত্রী পান ১/৮, সন্তান না থাকলে ১/৪। একাধিক স্ত্রী থাকলে এই অংশ সমান ভাগ। তাঁর অপরিশোধিত দেনমোহর ভাগের আগে দেনা হিসেবে আলাদা পরিশোধ হয়।
বাবা জীবিত থাকতে কি ওয়ারিশি অংশ চাওয়া যায়?
না। ওয়ারিশি অধিকার জন্মায় মৃত্যুর পর। বাবা জীবিত থাকা পর্যন্ত সম্পত্তি তাঁর, তিনি বিক্রি বা দান করতে পারেন। তাঁর জীবদ্দশায় কোনো সন্তানের আইনগত দাবি নেই।
বাবা কি সব সম্পত্তি এক ছেলেকে দিয়ে যেতে পারেন?
জীবদ্দশায় দখলসহ রেজিস্টার্ড হেবা করে দান করতে পারেন। অসিয়ত এক-তৃতীয়াংশে সীমিত, আর কোনো ওয়ারিশের পক্ষে হলে অন্য ওয়ারিশদের সম্মতি লাগে। মৃত্যুশয্যার দান অসিয়তের মতো গণ্য হয়।
দাদার আগে বাবা মারা গেলে নাতি-নাতনি কি অংশ পাবে?
হ্যাঁ। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ৪ ধারায় দাদার আগে মারা যাওয়া ছেলে বা মেয়ের সন্তানেরা তাদের বাবা বা মায়ের প্রাপ্য অংশ পায়।
হিন্দু আইনে বাবার সম্পত্তি কিভাবে ভাগ হয়?
দায়ভাগ মতে ছেলেরা প্রথমে ওয়ারিশ হন, আর বিধবা সীমিত স্বত্বে একজন ছেলের সমান অংশ পান। ছেলে, ছেলের ছেলে বা বিধবা না থাকলে মেয়েরা ওয়ারিশ হন, তাঁরাও সীমিত স্বত্বে।
জমি ও সম্পত্তি বিষয়ে আরও পড়ুন
নিরাপদে জমি কেনা, নামজারি ও বেদখল জমি উদ্ধার।
বাবার সম্পত্তি ভাগ করছেন?
আমরা ওয়ারিশ ও অংশ যাচাই করি, বণ্টননামা লিখি এবং নামজারি করে দিই, যাতে প্রত্যেক ওয়ারিশ পরিষ্কার মালিকানা পান। লিখিত প্রাথমিক মূল্যায়ন বিনামূল্যে।

মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।