Skip to content

বাংলাদেশে ওয়ারিশি জমি ভাগের নিয়ম: বণ্টননামা দলিল, বাটোয়ারা মামলা ও প্রি-এম্পশন

বাংলাদেশে দেওয়ানি মামলার সবচেয়ে বড় উৎস অবিভক্ত পারিবারিক জমি। এক ভাই সবার অনুমতি ছাড়া ঘর তোলেন, এক ওয়ারিশ বাইরের কারও কাছে বিক্রি করেন, বোনের অংশ নিঃশব্দে হারিয়ে যায়। বণ্টন এর সমাধান, হয় সবার সই করা রেজিস্ট্রিকৃত দলিলে, নয়তো আদালতের ডিক্রিতে। এই গাইডে দুটো পথ আর যে সময়সীমায় মানুষ আটকে যায়, তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

বাটোয়ারা আইন ১৮৯৩রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮, ধারা ১৭রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০, ধারা ৯৬অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৪৯, ধারা ২৪
শেয়ার করুন
বাংলাদেশে বণ্টননামায় ওয়ারিশি জমি ভাগ বোঝাতে ভাগ করা জমি ও দলিলের চিত্র
এক নজরে
  • বণ্টননামায় প্রত্যেক শরিকের সই লাগবে এবং তা রেজিস্ট্রি করতে হবে
  • একমত না হলে যেকোনো শরিক বাটোয়ারা মামলা করতে পারেন
  • অগ্রক্রয় (কৃষিজমি): নোটিশ থেকে ২ মাস, সর্বোচ্চ ৩ বছর
  • বণ্টনের পর প্রত্যেকের অংশ আলাদাভাবে নামজারি করুন

এই গাইডে: প্রথম পথ: বণ্টননামা · দ্বিতীয় পথ: বাটোয়ারা মামলা · অগ্রক্রয়: শরিক বাইরের কারও কাছে বিক্রি করলে · বণ্টনের আগে ও পরে

সংক্ষেপে উত্তর

ওয়ারিশি জমির শরিকরা দুইভাবে জমি ভাগ করতে পারেন। সমঝোতায়: প্রত্যেক শরিক বণ্টননামা বা বাটোয়ারা দলিলে সই করেন এবং তা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রি হয়। আদালতের মাধ্যমে: যেকোনো শরিক বাটোয়ারা মামলা করেন, আদালত প্রত্যেকের অংশ ঘোষণা করে, জমি জরিপ করে ছাহাম বরাদ্দ দেয় এবং চূড়ান্ত ডিক্রি দেয়। এর কোনোটি না হওয়া পর্যন্ত, যে-ই জমিতে থাকুন, প্রত্যেক শরিক জমির প্রতিটি অংশে অবিভক্ত অংশের মালিক।

প্রথম পথ: বণ্টননামা

পরিবার একমত হলে এটি দ্রুত এবং অনেক কম খরচের।

  • সবাইকে সই করতে হবে। একজন ওয়ারিশ বাদ পড়লে, যেমন বিবাহিত বোন, প্রবাসী ভাই বা আগে মারা যাওয়া ভাইয়ের সন্তান, তিনি পরে পুরো দলিল চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। প্রবাসী ওয়ারিশ যথাযথভাবে সম্পাদিত পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে সই করতে পারেন।
  • আগে অংশ ঠিক করুন। আগে মারা যাওয়া ওয়ারিশের সন্তানসহ ওয়ারিশি অংশ হিসাব করুন। ভুল অংশের ওপর দলিল মানে ভবিষ্যতের মামলা।
  • নাবালকের সুরক্ষা। শুধু কোনো আত্মীয় নাবালকের অংশ নিরাপদে ব্যবস্থা করতে পারেন না। আদালত নিয়োজিত অভিভাবক আদালতের অনুমতি নিয়ে করবেন, নইলে নাবালক বড় হয়ে দলিল বাতিল করাতে পারে।
  • রেজিস্ট্রি করুন। স্থাবর সম্পত্তির বণ্টন রেজিস্ট্রি করতে হয়। পারিবারিক “বোঝাপড়া” বা রেজিস্ট্রিহীন কাগজে নিরাপদ মালিকানা হয় না, যদিও দীর্ঘদিনের আলাদা দখল পরে প্রমাণ হিসেবে কাজে আসতে পারে।
  • প্রতিটি দাগের তফসিল দিন। মৌজা, খতিয়ান ও দাগ নম্বর, আর কে ঠিক কতটুকু পাচ্ছেন, পারলে সবার সই করা একটি নকশাসহ।

বণ্টননামা রেজিস্ট্রির খরচ বিক্রয় দলিলের চেয়ে অনেক কম, কারণ তা ধরা হয় সবচেয়ে বড় অংশটি বাদ দিয়ে বাকি জমির মূল্যের ওপর। রেজিস্ট্রির দিনের আগে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বর্তমান হার জেনে নিন।

বাংলাদেশে আরজি থেকে চূড়ান্ত ডিক্রি পর্যন্ত বাটোয়ারা মামলার ধাপ

দ্বিতীয় পথ: বাটোয়ারা মামলা

সমঝোতা না হলে যেকোনো শরিক জমি যে এলাকায় সেখানকার এখতিয়ারসম্পন্ন দেওয়ানি আদালতে বাটোয়ারা মামলা করতে পারেন। যেসব জেলায় মামলার আগে বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা চালু, সেখানে বিরোধ আগে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে যেতে হয়।

মামলা যেভাবে চলে

  • আরজি। প্রত্যেক শরিককে পক্ষ করা হয়, মালিকানার ইতিহাস ও প্রত্যেকের দাবিকৃত অংশসহ।
  • প্রাথমিক ডিক্রি। আদালত মালিকানা ঠিক করে অংশ ঘোষণা করে।
  • অ্যাডভোকেট কমিশনার। জমি জরিপ করে ঘর, দখল ও চলাচলের পথ বিবেচনায় প্রত্যেকের ছাহাম প্রস্তাব করেন।
  • চূড়ান্ত ডিক্রি। আদালত বরাদ্দ চূড়ান্ত করে। এরপর নামজারি আর প্রয়োজনে দখল বুঝিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তা কার্যকর হয়।

কোনো বাড়ি যুক্তিসংগতভাবে ভাগ করা না গেলে বাটোয়ারা আইন অনুযায়ী আদালত বিক্রি করে টাকা ভাগের আদেশ দিতে পারে, আর কোনো শরিককে বাকিদের অংশ কিনে নেওয়ার সুযোগও দিতে পারে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বাটোয়ারা মামলা প্রায়ই কয়েক বছর চলে। শুধু এই কারণেই বণ্টননামার জন্য জোর চেষ্টা করা উচিত।

অগ্রক্রয়: শরিক বাইরের কারও কাছে বিক্রি করলে

কোনো শরিক অবিভক্ত কৃষি জোতের অংশ বাইরের কারও কাছে বিক্রি করলে, উত্তরাধিকারসূত্রে আরেক শরিক রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০-এর ৯৬ ধারায় বিক্রয়মূল্যে জমিটি নিজে নেওয়ার জন্য আদালতে আবেদন করতে পারেন।

  • বিক্রির নোটিশ পাওয়া বা বিক্রির কথা জানার দুই মাসের মধ্যে, এবং যেকোনো অবস্থায় রেজিস্ট্রির তিন বছরের মধ্যে আবেদন করতে হবে।
  • বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে ২৫ শতাংশ ক্ষতিপূরণ ও বার্ষিক ৮ শতাংশ সরল সুদ জমা দিতে হবে।
  • অকৃষি জমির ক্ষেত্রে অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৪৯-এর ২৪ ধারায় শরিকদের একই ধরনের অধিকার আছে, তার নিজস্ব সময়সীমাসহ।

এই সময়সীমা খুব কড়া। দুই মাস পার হয়ে যাওয়াই অগ্রক্রয় মামলা হারার সবচেয়ে সাধারণ কারণ।

বণ্টনের আগে ও পরে

  • বণ্টনের আগে অবিভক্ত জমির নির্দিষ্ট অংশে ঘর তুলবেন না বা বিক্রি করবেন না। এতে মামলা আর নিষেধাজ্ঞা ডেকে আনা হয়।
  • দলিল তৈরির আগে খতিয়ান ও ওয়ারিশি নামজারি হালনাগাদ করুন।
  • রেজিস্ট্রি বা চূড়ান্ত ডিক্রির পর প্রত্যেক শরিক নিজের দাগের আলাদা নামজারি করুন এবং নিজের নামে ভূমি উন্নয়ন কর দেওয়া শুরু করুন।
এটি সাধারণ তথ্য, আপনার মামলার পরামর্শ নয়। এখানে আইন ও প্রচলিত প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আপনার কাগজপত্র, ঘটনা ও সংশ্লিষ্ট জেলার চর্চাই ঠিক করবে আপনার ক্ষেত্রে কী প্রযোজ্য।
পারিবারিক জমি ভাগের ধাপ
১

মালিকানা ও অংশ যাচাই

খতিয়ান আর ওয়ারিশি অংশ দেখুন, আগে মারা যাওয়া কারও ওয়ারিশসহ।

২

সমঝোতার চেষ্টা

মধ্যস্থতা বা পারিবারিক আলোচনা, সবার সই করা একটি নকশাসহ।

৩

রেজিস্ট্রি বা মামলা

সবার সইসহ রেজিস্ট্রিকৃত বণ্টননামা, নয়তো বাটোয়ারা মামলা।

৪

নামজারি ও দখল

প্রতিটি দাগের আলাদা নামজারি, তারপর আলাদা খাজনা।

একজনের সই বাদ পড়লে কয়েক বছর পর পুরো বণ্টননামা বাতিল হতে পারে।পরামর্শের সময় নিন

সাধারণ জিজ্ঞাসা

ওয়ারিশি জমি কীভাবে ভাগ করা হয়?

সব শরিকের সইসহ রেজিস্ট্রিকৃত বণ্টননামায়, অথবা বাটোয়ারা মামলায় যেখানে আদালত অংশ ঘোষণা করে ছাহাম বরাদ্দ দেয়।

বণ্টননামা রেজিস্ট্রি কি বাধ্যতামূলক?

হ্যাঁ। স্থাবর সম্পত্তির বণ্টন দলিল রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮ অনুযায়ী রেজিস্ট্রি করতে হয়।

একজন ওয়ারিশ সই করতে না চাইলে?

তাঁকে ছাড়া দলিল হবে না। আগে মধ্যস্থতার চেষ্টা করুন; তবুও রাজি না হলে যেকোনো শরিক বাটোয়ারা মামলা করতে পারেন, আদালত জমি ভাগ করে দেবে।

বাটোয়ারা মামলায় কত সময় লাগে?

প্রাথমিক ডিক্রি, জরিপ ও চূড়ান্ত ডিক্রির কারণে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মামলা প্রায়ই কয়েক বছর চলে। আপস হলে অনেক কম লাগে।

বণ্টনের আগে কি একজন ওয়ারিশ জমি বিক্রি করতে পারেন?

শুধু নিজের অবিভক্ত অংশ। ক্রেতা সেই অবিভক্ত অংশই পান, আর শরিকদের অগ্রক্রয়ের অধিকার থাকতে পারে।

অগ্রক্রয়ের সময়সীমা কত?

কৃষিজমির ক্ষেত্রে বিক্রির নোটিশ বা জানার দুই মাসের মধ্যে, আর কোনো অবস্থাতেই রেজিস্ট্রির তিন বছরের বেশি নয়।

বণ্টননামায় নাবালকের অংশ কীভাবে হবে?

আদালত নিয়োজিত অভিভাবক আদালতের অনুমতি নিয়ে করবেন। নইলে নাবালক প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে দলিল চ্যালেঞ্জ করতে পারে।

বাটোয়ারা মামলার আগে কি মধ্যস্থতা লাগে?

যেসব জেলায় মামলার আগে বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা চালু, সেখানে লাগে। বিরোধ আগে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে যায়।

বণ্টননামা দলিল করতে কত টাকা লাগে?

সরকারি খরচ বর্তমান তফসিল অনুযায়ী সম্পত্তির মূল্যের ওপর নির্ভর করে: নিবন্ধন ফি, স্ট্যাম্প শুল্ক ও অন্যান্য কর, সঙ্গে দলিল লেখক বা আইনজীবীর ফি। সই করার আগে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে তফসিল দেখে নিন; আমরা প্রতিটি দলিলের লিখিত খরচের হিসাব দিই।

মামলা ছাড়া কি ওয়ারিশরা সম্পত্তি বন্টন করতে পারেন?

হ্যাঁ। সব ওয়ারিশ রাজি থাকলে নিবন্ধিত বণ্টননামা দলিলেই আদালতে না গিয়ে জমি ভাগ করা যায়। এক বা একাধিক ওয়ারিশ রাজি না হলেই কেবল বাটোয়ারা মামলা লাগে।

বাটোয়ারা মামলা চলাকালে অন্য শরিকরা নামজারি করে ফেলেছেন; কী করব?

নামজারি মালিকানা নির্ধারণ করে না। এসি ল্যান্ডকে মামলার কপি দিয়ে পুনর্বিবেচনা বা মিস কেস করুন; শেষ পর্যন্ত বাটোয়ারার ডিক্রি সব পক্ষকে আবদ্ধ করবে।

আইন লাইব্রেরি

এই গাইডের পেছনের আইন ও ফরম

বিডি অ্যাডভোকেসিতে সংরক্ষিত প্রামাণিক পাঠ। ধারা নম্বরগুলো এই গাইডে ব্যবহৃত।

বণ্টননামা দলিল নমুনা খসড়া
চেম্বারের নমুনা খসড়া চাইলে আমরা পাঠিয়ে দেব; আপনার ঘটনার জন্য খসড়াটি মিলিয়ে নিতে হবে।
শেয়ার করুন

মন্তব্য

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।

মন্তব্য লিখুন

সব মন্তব্য প্রকাশের আগে চেম্বার থেকে যাচাই করা হয়। মামলার গোপন তথ্য, ফোন নম্বর বা লিংক দেবেন না। এখানে দেওয়া উত্তর সাধারণ তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়; নির্দিষ্ট বিষয়ে পরামর্শের জন্য চেম্বারে যোগাযোগ করুন।

পারিবারিক জমি এখনো অবিভক্ত?

আমরা বণ্টননামা তৈরি ও রেজিস্ট্রি করি, বাটোয়ারা ও প্রি-এম্পশন মামলা পরিচালনা করি, এবং অংশীদারদের বিরোধ মিটিয়ে দিই। লিখিত প্রাথমিক মূল্যায়ন বিনামূল্যে।