কে কত পাবেন: বাংলাদেশে স্ত্রী, মেয়ে, ছেলে ও বাবা-মায়ের ওয়ারিশি অংশ
পরিবারে কারও মৃত্যুর পর সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি ওঠে, তা হলো—কে কত অংশ পাবেন? এই অংশ ঠিক করে দেয় আইন, বড় ভাই নন, আর চাপ দিয়েও তা বদলানো যায় না। এখানে থাকছে অংশগুলোর হিসাব, একটি বাস্তব উদাহরণ, আর পরিবারগুলো যেসব ফাঁদে পড়ে তার খতিয়ান।
- স্ত্রী: সন্তান থাকলে ১/৮, না থাকলে ১/৪
- ছেলে মেয়ের দ্বিগুণ অংশ পান
- প্রথমে ঋণ ও বকেয়া দেনমোহর পরিশোধ হয়
- মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ধারা ৪ অনুযায়ী এতিম নাতি-নাতনিরাও উত্তরাধিকার পান
এই গাইডে যা আছে: মূল অংশগুলো (মুসলিম আইন) · একটি বাস্তব উদাহরণ · এতিম নাতি-নাতনি · পরিবারগুলো যেসব ফাঁদে পড়ে · হিন্দু উত্তরাধিকার · ওয়ারিশ প্রমাণের উপায় · অংশ জানার পর
সংক্ষেপে উত্তর
মুসলিমদের ক্ষেত্রে অংশ ঠিক হয় কোরআনের উত্তরাধিকার বিধান (ফরায়েজ) অনুযায়ী, যা বাংলাদেশের আদালতে হানাফি আইন মেনে প্রয়োগ করা হয়। মানুষ যে মূল নিয়মটি জানে, ছেলে মেয়ের দ্বিগুণ অংশ পান—তা ঠিক, কিন্তু পুরো নিয়মের একটি অংশ মাত্র। প্রথমে স্বামী-স্ত্রী ও বাবা-মা তাদের নির্দিষ্ট অংশ পান, তারপর বাকিটা সন্তানরা ভাগ করে নেন। ভাগ করার আগে সম্পত্তি থেকে পরিশোধ করতে হয় দাফন-কাফনের খরচ, ঋণ, স্ত্রীর বকেয়া দেনমোহরএবং সম্পত্তির সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত বৈধ অসিয়ত।
মূল অংশগুলো (মুসলিম আইন)
| ওয়ারিশ | অংশ |
|---|---|
| স্ত্রী (বিধবা) | সন্তান থাকলে ১/৮, না থাকলে ১/৪। একাধিক স্ত্রী থাকলে এই অংশ সবার মধ্যে সমান ভাগ হয়। |
| স্বামী (বিপত্নীক) | সন্তান থাকলে ১/৪, না থাকলে ১/২। |
| মেয়ে, ছেলে না থাকলে | একজন মেয়ে হলে ১/২, দুই বা তার বেশি মেয়ে হলে সবাই মিলে ২/৩। |
| ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে থাকলে | তারা অবশিষ্ট অংশ পান, যেখানে প্রতিটি ছেলে প্রতিটি মেয়ের দ্বিগুণ পান। |
| মা | সন্তান থাকলে (বা দুই বা ততোধিক ভাইবোন থাকলে) ১/৬, না থাকলে ১/৩। |
| বাবা | সন্তান থাকলে ১/৬; শুধু মেয়ে থাকলে বা কোনো সন্তান না থাকলে অবশিষ্ট অংশও তিনি পান। |
একটি বাস্তব উদাহরণ
ধরা যাক, একজন ব্যক্তি মারা গেলেন, রেখে গেলেন স্ত্রী, মা, এক ছেলে ও দুই মেয়ে। তার বাবা আগেই মারা গিয়েছিলেন।
- স্ত্রী: 1/8 (সন্তান থাকায়)।
- মা: 1/6 (সন্তান থাকায়)।
- বাকি ১৭/২৪ অংশ পান সন্তানরা, যা ভাগ হয় ২ : ১ : ১ অনুপাতে।
- ছেলে: 17/48 (প্রায় ৩৫.৪%)। প্রতিটি মেয়ে: 17/96 (প্রায় ১৭.৭%)।
৩০ শতাংশ জমির হিসাবে এটি দাঁড়ায় মোটামুটি—স্ত্রী ৩.৭৫ শতাংশ, মা ৫ শতাংশ, ছেলে ১০.৬ শতাংশ এবং প্রতিটি মেয়ে ৫.৩ শতাংশ। বাস্তব ক্ষেত্রে প্রায়ই ভাইবোন, নাতি-নাতনি বা আগে মারা যাওয়া কোনো ওয়ারিশ থাকেন, যা হিসাব বদলে দেয়—তাই বণ্টননামা তৈরির আগে হিসাবটি যাচাই করিয়ে নিন।
এতিম নাতি-নাতনি
প্রচলিত ধ্রুপদী আইনে যে নাতি-নাতনির বাবা বা মা দাদা-দাদির আগেই মারা যেতেন, তারা উত্তরাধিকার থেকে বাদ পড়তেন। বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ধারা ৪ এই নিয়ম বদলে দিয়েছে: প্রয়াত ছেলে বা মেয়ের সন্তানরা এখন তাদের বাবা বা মা যে অংশ পেতেন, সেই অংশই পান। পরিবারগুলো এখনো প্রায়ই এই নিয়মটি ভুলে যায়, আর এ কারণেই পরে বণ্টন নিয়ে নতুন করে বিরোধ দেখা দেয়।
পরিবারগুলো যেসব ফাঁদে পড়ে
- চাপে পড়ে মেয়েদের নিজের অংশ “দান” করে দেওয়া। পারিবারিক চাপে সই করা হেবা বা অংশত্যাগের দলিল পরে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যায়। কোনো বোন নিজের ইচ্ছায় নিজের অংশ দিতে চাইলে তা হতে হবে স্বেচ্ছায়, সঠিকভাবে রেজিস্ট্রি করা দলিলের মাধ্যমে।
- নামজারি ও বণ্টনের আগেই জমি বিক্রি করে দেওয়া। কোনো এক ওয়ারিশ অবিভক্ত জমির একটি নির্দিষ্ট দাগ বিক্রি করে দিলে তা পরে বাটোয়ারা ও প্রি-এম্পশন মামলার জন্ম দেয়।
- বিধবা স্ত্রীর দেনমোহরের কথা ভুলে যাওয়া। এটি মৃতের সম্পত্তির ওপর একটি ঋণ, যা বণ্টনের আগেই পরিশোধ করতে হয়।
- সৎসন্তান বা দত্তক সন্তানও উত্তরাধিকার পাবে ভেবে নেওয়া। মুসলিম আইনে তারা উত্তরাধিকার পান না, তবে জীবদ্দশায় দান করে বা এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে অসিয়ত করে তাদের জন্য ব্যবস্থা রাখা যায়।
হিন্দু উত্তরাধিকার
বাংলাদেশের বেশিরভাগ হিন্দু দায়ভাগ মতবাদ অনুসরণ করেন। এখানে ছেলেরা সম্পূর্ণ মালিকানাসহ সম্পত্তি পান। বিধবা স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তিতে সীমিত ও আজীবনের জন্য একটি অধিকার পান, আর মেয়েদের অধিকার সীমিত এবং পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। এই ক্ষেত্রে আদালতের ব্যাখ্যা ক্রমেই বদলাচ্ছে—সম্প্রতি আপিল বিভাগের এক রায়ে বলা হয়েছে, মায়ের স্ত্রীধনে মেয়েরা সম্পূর্ণ অধিকার পান। হিন্দু উত্তরাধিকারের প্রশ্নে মামলাভেদে আলাদা পরামর্শ প্রয়োজন।
ওয়ারিশ প্রমাণের উপায়
A ওয়ারিশ সনদ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা সিটি করপোরেশন কাউন্সিলরের কাছ থেকে নেওয়া হয়, তাতে আইনগত ওয়ারিশদের তালিকা থাকে এবং তা নামজারিসহ নানা সরকারি কাজে লাগে। ব্যাংকের জমা টাকা, সঞ্চয়পত্র বা শেয়ার সংগ্রহ করতে প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত আদালতের একটি সাকসেশন সার্টিফিকেটচায়। আমাদের সাকসেশন সার্টিফিকেট গাইড এই দুইয়ের পার্থক্য বুঝিয়ে দেয়।
অংশ জানার পর
ওয়ারিশরা সাধারণত নামজারির মাধ্যমে নিজেদের অংশ রেকর্ড করান, এরপর রেজিস্ট্রি করা বণ্টননামা দিয়ে জমি ভাগ করেন, অথবা একমত না হলে বাটোয়ারা মামলা করেন। দেখুন আমাদের গাইড নামজারি ও পারিবারিক জমি বণ্টন.
ওয়ারিশ ও সম্পদের তালিকা করুন
মৃত্যু সনদ, ওয়ারিশ সনদ, আর জমি, হিসাব ও ঋণের একটি তালিকা।
সম্পত্তির দায়-দেনা মেটান
দাফন-কাফনের খরচ, ঋণ ও বকেয়া দেনমোহর—বণ্টনের আগে এসব মেটাতে হয়।
অংশ হিসাব করুন
ফরায়েজ বা প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী হিসাব করুন, এতিম নাতি-নাতনিদের অংশও ধরে।
নামজারি ও বণ্টন করুন
ওয়ারিশদের নামে নামজারি করান, তারপর রেজিস্ট্রি করা বণ্টননামা বা প্রয়োজনে বাটোয়ারা মামলা।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বাংলাদেশে স্বামীর সম্পত্তি থেকে স্ত্রী কত অংশ পান?
মুসলিম আইনে, সন্তান থাকলে ১/৮ এবং না থাকলে ১/৪—তবে তার আগে ঋণ ও স্ত্রীর বকেয়া দেনমোহর মেটাতে হয়। একাধিক স্ত্রী থাকলে এই অংশ তাদের মধ্যে সমান ভাগ হয়।
বাবার সম্পত্তিতে মেয়ের অংশ কত?
ছেলে না থাকলে একজন মেয়ে পান ১/২, আর দুই বা তার বেশি মেয়ে মিলে পান ২/৩। ছেলে থাকলে সন্তানরা মিলে অবশিষ্ট অংশ ভাগ করেন, যেখানে প্রতিটি ছেলে প্রতিটি মেয়ের দ্বিগুণ পান।
বাবার সম্পত্তিতে কি বোনও অংশ পান?
হ্যাঁ। মুসলিম আইনে মেয়ে একজন নির্ধারিত অংশীদার, ভাইয়েরা তার অংশ কেড়ে নিতে পারেন না।
বাবা বা মা আগে মারা গেলে কি নাতি-নাতনিরা উত্তরাধিকার পান?
হ্যাঁ। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ধারা ৪ অনুযায়ী তারা তাদের প্রয়াত বাবা বা মা যে অংশ পেতেন, সেই অংশই পান।
স্ত্রীর সম্পত্তিতে স্বামীর অংশ কত?
সন্তান থাকলে ১/৪, না থাকলে ১/২।
সৎসন্তান বা দত্তক সন্তান কি উত্তরাধিকার পান?
মুসলিম আইনে পান না। তবে জীবদ্দশায় দান করে বা সম্পত্তির সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ অসিয়ত করে তাদের জন্য ব্যবস্থা রাখা যায়।
বাংলাদেশে হিন্দুরা কীভাবে সম্পত্তির উত্তরাধিকার পান?
দায়ভাগ মতবাদ অনুযায়ী ছেলেরা সম্পূর্ণ মালিকানাসহ সম্পত্তি পান, বিধবা স্ত্রী পান আজীবনের একটি অধিকার, আর মেয়েদের অধিকার সীমিত। এক্ষেত্রে মামলাভেদে সুনির্দিষ্ট পরামর্শ জরুরি।
ওয়ারিশ সনদ ও সাকসেশন সার্টিফিকেটের পার্থক্য কী?
স্থানীয় সরকার থেকে নেওয়া ওয়ারিশ সনদ ওয়ারিশদের পরিচয় নিশ্চিত করে। আর সাকসেশন সার্টিফিকেট হলো আদালতের একটি নথি, যা ব্যাংক জমা বা শেয়ারের মতো ঋণ ও সিকিউরিটি সংগ্রহ করতে প্রয়োজন হয়।
পারিবারিক সম্পত্তি ভাগাভাগি নিয়ে সমস্যায়?
আমরা অংশ হিসাব করি, বণ্টননামা তৈরি করি এবং যেসব ওয়ারিশের অংশ আটকে রাখা হয়েছে তাদের পক্ষে লড়ি।
মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।