Skip to content

কে কত পাবেন: বাংলাদেশে স্ত্রী, মেয়ে, ছেলে ও বাবা-মায়ের ওয়ারিশি অংশ

কারও মৃত্যুর পর বেশিরভাগ পরিবারে প্রথম প্রশ্ন, কে কত পাবে। উত্তর ঠিক করে দেয় আইন, বড় ভাই নন, আর চাপ দিয়ে তা বদলানো যায় না। এখানে আছে অংশগুলো, একটি হিসাবের উদাহরণ, জীবদ্দশায় বাবা-মা কী করতে পারেন আর কী পারেন না, এবং যেসব ফাঁদে পরিবার পড়ে।

মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (হানাফি ফারায়েজ)মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১, ধারা ৪হিন্দু নারীর সম্পত্তির অধিকার আইন ১৯৩৭
শেয়ার করুন
বাংলাদেশের আইনে ওয়ারিশি অংশ বোঝাতে ভাগ করা বৃত্ত ও পারিবারিক বংশতালিকার চিত্র
এক নজরে
  • স্ত্রী: সন্তান থাকলে ১/৮, না থাকলে ১/৪
  • ছেলে পায় মেয়ের দ্বিগুণ
  • আগে ঋণ ও অপরিশোধিত দেনমোহর পরিশোধ
  • এতিম নাতি-নাতনি তাদের বাবা-মায়ের অংশ পায়

এই গাইডে: মুসলিম আইনে প্রধান অংশগুলো · একটি হিসাবের উদাহরণ · এতিম নাতি-নাতনি · জীবদ্দশায় ও উইলে বাবা-মা কী করতে পারেন · যেসব ফাঁদে পরিবার পড়ে · হিন্দু উত্তরাধিকার · ওয়ারিশ প্রমাণ ও সম্পত্তি ভাগ

সংক্ষেপে উত্তর

মুসলিমদের ক্ষেত্রে ওয়ারিশি অংশ ঠিক হয় ফারায়েজ অনুযায়ী, বাংলাদেশের আদালত যেভাবে হানাফি আইন প্রয়োগ করে। কিছু ভাগ করার আগে সম্পত্তি থেকে দাফনের খরচ, ঋণ, বিধবা স্ত্রীর অপরিশোধিত দেনমোহর আর এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত বৈধ উইল পরিশোধ করতে হয়। এরপর স্বামী বা স্ত্রী ও বাবা-মা নির্দিষ্ট অংশ পান, আর বাকিটা সন্তানরা ভাগ করেন, প্রতিটি ছেলে প্রতিটি মেয়ের দ্বিগুণ।

মুসলিম আইনে প্রধান অংশগুলো

ওয়ারিশঅংশ
স্ত্রী (বিধবা)মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে ১/৮; না থাকলে ১/৪। একাধিক স্ত্রী থাকলে তাঁরা এই অংশ সমান ভাগ করেন।
স্বামীমৃতার সন্তান থাকলে ১/৪; না থাকলে ১/২।
মেয়ে, ছেলে না থাকলেএকজন মেয়ে ১/২; দুই বা বেশি মেয়ে মিলে ২/৩।
ছেলে ও মেয়ে একসঙ্গেঅবশিষ্টাংশ, প্রতিটি ছেলে প্রতিটি মেয়ের দ্বিগুণ।
মাসন্তান, বা দুই বা বেশি ভাইবোন থাকলে ১/৬; না থাকলে ১/৩।
বাবাসন্তান থাকলে ১/৬; শুধু মেয়ে থাকলে বা কোনো সন্তান না থাকলে অবশিষ্টাংশও পান।

সন্তান না থাকলে ভাইবোনেরা ওয়ারিশ হতে পারেন, তখন হিসাব অনেক বদলে যায়। যাচাই করিয়ে নিন।

বাংলাদেশে স্ত্রী, স্বামী, ছেলে, মেয়ে, মা ও বাবার মুসলিম ওয়ারিশি অংশের ছক

একটি হিসাবের উদাহরণ

একজন পুরুষ মারা গেলেন, রেখে গেলেন স্ত্রী, মা, এক ছেলে ও দুই মেয়ে। তাঁর বাবা আগেই মারা গেছেন।

  • স্ত্রী: ১/৮, কারণ সন্তান আছে।
  • মা: ১/৬, কারণ সন্তান আছে।
  • সন্তানদের জন্য থাকে ১৭/২৪, ভাগ হবে ২ : ১ : ১ অনুপাতে।
  • ছেলে: ১৭/৪৮, প্রায় ৩৫.৪ শতাংশ। প্রত্যেক মেয়ে: ১৭/৯৬, প্রায় ১৭.৭ শতাংশ।

৩০ শতাংশ জমিতে এর মানে মোটামুটি স্ত্রী ৩.৭৫ শতাংশ, মা ৫, ছেলে ১০.৬ আর প্রত্যেক মেয়ে ৫.৩ শতাংশ।

এতিম নাতি-নাতনি

প্রচলিত আইনে দাদা-দাদি বা নানা-নানির আগে যে সন্তান মারা গেছেন, তাঁর সন্তানরা বাদ পড়ত। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ৪ ধারা বাংলাদেশে তা বদলেছে: আগে মারা যাওয়া ছেলে বা মেয়ের সন্তানরা সেই অংশ পায় যা তাদের বাবা বা মা পেতেন। পরিবারগুলো এখনো এটি ভুলে যায়, আর এ কারণেই অনেক বণ্টন পরে আবার খোলা হয়।

জীবদ্দশায় ও উইলে বাবা-মা কী করতে পারেন

  • হেবা (দান)। একজন মুসলিম জীবদ্দশায় যে কাউকে, এমনকি একটি সন্তানকেও, রেজিস্ট্রিকৃত হেবা দলিলে দখল হস্তান্তরসহ সম্পত্তি দান করতে পারেন। অন্য ওয়ারিশরা পরে সেই সম্পত্তি উত্তরাধিকার হিসেবে দাবি করতে পারেন না। মৃত্যুশয্যায় করা দান উইলের মতো গণ্য হয়।
  • উইল (অসিয়ত)। একজন মুসলিম উইলে সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ দিতে পারেন, তবে কোনো ওয়ারিশকে নয়, যদি না মৃত্যুর পর অন্য ওয়ারিশরা সম্মতি দেন।
  • তাই উইল দিয়ে বাবা-মা মেয়েকে বঞ্চিত করতে পারেন না। জীবদ্দশায় সম্পত্তি দান করে দিলেই শুধু তাঁর অংশ কমে, আর চাপ দিয়ে বা মৃত্যুশয্যায় করা দান আদালত কড়াভাবে দেখে।

যেসব ফাঁদে পরিবার পড়ে

  • চাপে পড়ে বোনদের অংশ ছেড়ে দেওয়া। পারিবারিক চাপে সই করা হস্তান্তর বা হেবা চ্যালেঞ্জ করা যায়। বোন স্বেচ্ছায় অংশ দিতে চাইলে তা রেজিস্ট্রিকৃত দলিলে হওয়া উচিত।
  • অবিভক্ত জমির নির্দিষ্ট দাগ একজন ওয়ারিশের বিক্রি। এতে বাটোয়ারা ও অগ্রক্রয়ের বিরোধ তৈরি হয়।
  • বিধবার দেনমোহর ভুলে যাওয়া। এটি সম্পত্তির ওপর ঋণ, ভাগের আগে পরিশোধ করতে হয়।
  • সৎ বা পালিত সন্তান ওয়ারিশ ভাবা। মুসলিম আইনে তারা ওয়ারিশ নয়, যদি না দান বা এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে উইলে তাদের জন্য ব্যবস্থা করা হয়।

হিন্দু উত্তরাধিকার

বাংলাদেশের বেশিরভাগ হিন্দু দায়ভাগ মত অনুসরণ করেন। ছেলেরা নিরঙ্কুশভাবে ওয়ারিশ হন। হিন্দু নারীর সম্পত্তির অধিকার আইন ১৯৩৭ অনুযায়ী বিধবা স্বামীর সম্পত্তিতে জীবনস্বত্ব পান, আর ২০২০ সালে হাইকোর্ট বিভাগ বলেছে এই অধিকার কৃষিজমিতেও প্রযোজ্য। মেয়েদের অধিকার সীমিত এবং পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। হিন্দু উত্তরাধিকারের প্রশ্নে নির্দিষ্ট পরিবারের তথ্য দিয়ে পরামর্শ নিন।

ওয়ারিশ প্রমাণ ও সম্পত্তি ভাগ

ওয়ারিশ সনদে ওয়ারিশদের তালিকা থাকে, যা নামজারিতে লাগে। ব্যাংকের টাকা ও শেয়ারের জন্য সাধারণত আদালতের সাকসেশন সার্টিফিকেট লাগে। এরপর ওয়ারিশরা জমির নামজারি করে রেজিস্ট্রিকৃত বণ্টননামা দিয়ে ভাগ করেন, একমত না হলে বাটোয়ারা মামলা করেন।

এটি সাধারণ তথ্য, আপনার মামলার পরামর্শ নয়। এখানে আইন ও প্রচলিত প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আপনার কাগজপত্র, ঘটনা ও সংশ্লিষ্ট জেলার চর্চাই ঠিক করবে আপনার ক্ষেত্রে কী প্রযোজ্য।
উত্তরাধিকার মীমাংসার ধাপ
১

ওয়ারিশ ও সম্পদের তালিকা

মৃত্যুসনদ, ওয়ারিশ সনদ, আর জমি, অ্যাকাউন্ট ও ঋণের তালিকা।

২

আগে ঋণ পরিশোধ

দাফনের খরচ, ঋণ ও অপরিশোধিত দেনমোহর ভাগের আগে।

৩

অংশের হিসাব

ফারায়েজ বা প্রযোজ্য ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী, এতিম নাতি-নাতনিসহ।

৪

নামজারি ও বণ্টন

ওয়ারিশদের নামে নামজারি, তারপর রেজিস্ট্রিকৃত বণ্টননামা বা বাটোয়ারা মামলা।

কোনো দলিল তৈরির আগে হিসাবটি যাচাই করিয়ে নিন। ভুল শোধরানো ব্যয়বহুল।পরামর্শের সময় নিন

সাধারণ জিজ্ঞাসা

স্বামীর সম্পত্তিতে স্ত্রী কত পান?

মুসলিম আইনে সন্তান থাকলে ১/৮, না থাকলে ১/৪, ঋণ ও তাঁর অপরিশোধিত দেনমোহর পরিশোধের পরে। একাধিক স্ত্রী এই অংশ ভাগ করেন।

বাবার সম্পত্তিতে মেয়ের অংশ কত?

ছেলে না থাকলে একজন মেয়ে ১/২, দুই বা বেশি মেয়ে মিলে ২/৩। ছেলে থাকলে সন্তানরা অবশিষ্টাংশ ভাগ করে, প্রতিটি ছেলে প্রতিটি মেয়ের দ্বিগুণ।

ভাইয়েরা কি বোনকে অংশ থেকে বঞ্চিত করতে পারেন?

না। মেয়ে আইনগত ওয়ারিশ, তাঁর অংশ কেড়ে নেওয়া যায় না। অংশ ছাড়তে হলে তা স্বেচ্ছায় ও যথাযথ দলিলে হতে হবে।

বাবা কি সব সম্পত্তি ছেলেকে দিয়ে দিতে পারেন?

জীবদ্দশায় রেজিস্ট্রিকৃত হেবা দলিলে দখলসহ দিতে পারেন। উইলে পারেন না, কারণ ওয়ারিশকে উইলে দিতে অন্য ওয়ারিশদের সম্মতি লাগে।

বাবা-মা আগে মারা গেলে নাতি-নাতনি কি ওয়ারিশ হয়?

হ্যাঁ। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ৪ ধারা অনুযায়ী তারা তাদের বাবা বা মায়ের প্রাপ্য অংশ পায়।

স্ত্রীর সম্পত্তিতে স্বামী কত পান?

সন্তান থাকলে ১/৪, না থাকলে ১/২।

সৎ বা পালিত সন্তান কি ওয়ারিশ হয়?

মুসলিম আইনে হয় না। জীবদ্দশায় দান বা এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত উইলে তাদের জন্য ব্যবস্থা করা যায়।

হিন্দুরা কীভাবে উত্তরাধিকার পান?

দায়ভাগ মতে ছেলেরা নিরঙ্কুশভাবে পান, আর বিধবা জীবনস্বত্ব পান, কৃষিজমিসহ। মেয়েদের অধিকার সীমিত; নির্দিষ্ট পরামর্শ নিন।

মায়ের সম্পত্তি ছেলে মেয়ে কতটুকু পাবে?

মুসলিম আইনে মা মারা গেলে স্বামী জীবিত থাকলে তিনি এক-চতুর্থাংশ পান, বাকিটা সন্তানেরা পায়; প্রত্যেক ছেলে মেয়ের দ্বিগুণ পায়। স্বামী না থাকলে পুরো সম্পত্তি সন্তানেরা একই ২:১ অনুপাতে ভাগ করে। তার আগে দেনা ও বৈধ উইল মেটাতে হয়।

ফারায়েজ কি, আর ফারায়েজ ক্যালকুলেটরের ওপর কি ভরসা করা যায়?

ফারায়েজ হলো উত্তরাধিকারের নির্ধারিত অংশের ইসলামি বিধান। অনলাইন ক্যালকুলেটর প্রাথমিক ধারণা দেয়, তবে ১৯৬১ সালের এতিম নাতি-নাতনির বিধান, দেনা, জীবদ্দশার দান ও ওয়ারিশ নিয়ে বিরোধ প্রায়ই বাদ পড়ে। বণ্টননামা বা বিক্রির আগে আইনজীবী দিয়ে হিসাব মিলিয়ে নিন।

উইল করে কি উত্তরাধিকারের অংশ বদলানো যায়?

আংশিক। একজন মুসলিম উইলে সম্পত্তির সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ দিতে পারেন, আর কোনো ওয়ারিশকে উইল করলে অন্য ওয়ারিশদের সম্মতি লাগে। বাকি দুই-তৃতীয়াংশ সব সময় নির্ধারিত অংশ অনুযায়ী ভাগ হয়।

আইন লাইব্রেরি

এই গাইডের পেছনের আইন ও ফরম

বিডি অ্যাডভোকেসিতে সংরক্ষিত প্রামাণিক পাঠ। ধারা নম্বরগুলো এই গাইডে ব্যবহৃত।

শেয়ার করুন

মন্তব্য

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।

মন্তব্য লিখুন

সব মন্তব্য প্রকাশের আগে চেম্বার থেকে যাচাই করা হয়। মামলার গোপন তথ্য, ফোন নম্বর বা লিংক দেবেন না। এখানে দেওয়া উত্তর সাধারণ তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়; নির্দিষ্ট বিষয়ে পরামর্শের জন্য চেম্বারে যোগাযোগ করুন।

পারিবারিক সম্পত্তি ভাগাভাগি নিয়ে সমস্যায়?

আমরা অংশ হিসাব করি, বণ্টননামা তৈরি করি এবং যেসব ওয়ারিশের অংশ আটকে রাখা হয়েছে তাদের পক্ষে লড়ি। লিখিত প্রাথমিক মূল্যায়ন বিনামূল্যে।