হেবা দলিল: নিয়ম, খরচ, কাগজপত্র এবং বাতিল করা যায় কি না
অনেক বাবা-মা জীবদ্দশায় একটি সন্তান, স্বামী বা স্ত্রী, কিংবা ভাই-বোনকে জমি বা ফ্ল্যাট দিয়ে যেতে চান। হেবা (দান) দলিল দিয়ে সেটা হয়, আর ঠিকভাবে করলে তা বাতিল করা খুব কঠিন। ভুলভাবে করলে সেটাই পরিবারের পরের মামলা হয়ে দাঁড়ায়। এখানে আছে শর্ত, রেজিস্ট্রেশন ও খরচ, প্রয়োজনীয় কাগজ, আর কখন হেবা চ্যালেঞ্জ করা যায়।
- তিন শর্ত: ঘোষণা, গ্রহণ ও দখল হস্তান্তর
- জমির হেবা রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক
- নিকট আত্মীয়দের জন্য নির্ধারিত সামান্য ফি
- দখল হস্তান্তরের পর বাতিল করা কঠিন
এই গাইডে: বৈধ হেবার তিন শর্ত · রেজিস্ট্রেশন ও হেবা দলিলের খরচ · হেবা দলিল করতে কি কি কাগজ লাগে · ধাপে ধাপে হেবা দলিল করার নিয়ম · হেবা দলিল কি বাতিল করা যায়? · উইল না হেবা: কোনটা করবেন
সংক্ষেপে উত্তর
হেবা হলো জীবদ্দশায় বিনা মূল্যে সম্পত্তি দান। মুসলিম আইনে এর জন্য দাতার স্পষ্ট ঘোষণা, গ্রহীতার গ্রহণ এবং দখল হস্তান্তর লাগে। ২০০৫ সাল থেকে জমি বা ফ্ল্যাটের দান রেজিস্ট্রিকৃত দলিলেও করতে হয়। স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা ও সন্তান, আপন ভাই-বোন এবং দাদা-দাদি বা নানা-নানি ও নাতি-নাতনির মধ্যে রেজিস্ট্রেশনে সম্পত্তির মূল্যের শতাংশ নয়, নির্দিষ্ট সামান্য ফি লাগে। দান সম্পূর্ণ হলে সাধারণত আদালত ছাড়া তা ফেরত নেওয়া যায় না।
বৈধ হেবার তিন শর্ত
| শর্ত | বাস্তবে এর মানে |
|---|---|
| ঘোষণা (ইজাব) | মালিক স্পষ্টভাবে বলেন যে তিনি এখনই, স্বেচ্ছায়, বিনা মূল্যে সম্পত্তিটি দিচ্ছেন। |
| গ্রহণ (কবুল) | গ্রহীতা গ্রহণ করেন, সাধারণত দলিলে সই করে। অপ্রাপ্তবয়স্কের পক্ষে অভিভাবক গ্রহণ করেন। |
| দখল (কবজ) | নিয়ন্ত্রণ গ্রহীতার কাছে যায়: চাবি, ভাড়া, ব্যবহারের অধিকার। আদালত দেখে বাস্তবে কী ঘটেছে। |
দাতাকে প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কের ও সম্পত্তির মালিক হতে হবে। ভবিষ্যতের সম্পত্তি দান করা যায় না। জমির অবিভক্ত অংশ দান বাস্তবে চলে, তবে এতে বিরোধ হয়; সম্ভব হলে আগে ভাগ করে নিন।
রেজিস্ট্রেশন ও হেবা দলিলের খরচ
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ধারা ১২৩ ও রেজিস্ট্রেশন আইনের ধারা ১৭ অনুযায়ী স্থাবর সম্পত্তির দান, সম্পত্তি যে এলাকায় সেখানকার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রি করতে হয়। রেজিস্ট্রি ছাড়া জমির হেবা নামজারি বা আদালতে টেকে না।
- নিকট আত্মীয় (স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা ও সন্তান, আপন ভাই-বোন, দাদা-দাদি বা নানা-নানি ও নাতি-নাতনি): হেবার ঘোষণাপত্র দলিলে মূল্যভিত্তিক খরচ নয়, নির্দিষ্ট রেজিস্ট্রেশন ফি (দীর্ঘদিন ধরে ১০০ টাকা) ও সামান্য নির্দিষ্ট স্ট্যাম্প শুল্ক লাগে।
- অন্য কাউকে দান: সাধারণ হস্তান্তরের খরচ, মোটামুটি বিক্রির মতোই, সম্পত্তির মূল্যের ভিত্তিতে।
- কর: হেবায় উৎসে কর কাটা হয় না। বাবা-মা ও সন্তান, স্বামী-স্ত্রী এবং আপন ভাই-বোনের মধ্যে দানও করমুক্ত; অন্যদের দানের ক্ষেত্রে কর উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলুন।
বাজেটের সঙ্গে সরকারি খরচ বদলায়। সই করার আগে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে বর্তমান তফসিল জেনে নিন; আমরা ক্লায়েন্টকে লিখিত হিসাব দিই।
হেবা দলিল করতে কি কি কাগজ লাগে
- দাতার মূল দলিল ও আগের ধারাবাহিক দলিল।
- সর্বশেষ খতিয়ান এবং দাতার নামে নামজারি খতিয়ান।
- হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ; শহরের সম্পত্তিতে হোল্ডিং ট্যাক্সের রসিদ।
- দাতা ও গ্রহীতার জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট সাইজের ছবি।
- নিকট আত্মীয়ের ফি পেতে সম্পর্কের প্রমাণ (জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র বা পারিবারিক সনদ)।
- জাতীয় পরিচয়পত্রসহ দুজন সাক্ষী।
ধাপে ধাপে হেবা দলিল করার নিয়ম
- মালিকানা যাচাই। দাতাকে রেকর্ডীয় মালিক হতে হবে, নামজারি সম্পন্ন থাকতে হবে। নামজারি না করা জমি দান করলে পরে ঝামেলা হয়।
- দলিলের খসড়া করুন সম্পত্তির তফসিল (মৌজা, দাগ, খতিয়ান, পরিমাণ) ও সম্পর্ক উল্লেখ করে।
- খরচ পরিশোধ করুন সাব-রেজিস্ট্রি অফিস যে পদ্ধতিতে নেয়।
- সাব-রেজিস্ট্রারের সামনে সম্পাদন। দাতা ও গ্রহীতা সই করেন; ছবি ও আঙুলের ছাপ নেওয়া হয়।
- দখল হস্তান্তর করুন ও প্রমাণ রাখুন: চাবি, ভাড়াটিয়াকে গ্রহীতাকে ভাড়া দিতে বলা, বিলের নাম বদল।
- নামজারি করুন ই-নামজারির মাধ্যমে গ্রহীতার নামে।
হেবা দলিল কি বাতিল করা যায়?
দখল হস্তান্তরের আগে মুসলিম দাতা দান ফিরিয়ে নিতে পারেন। দান সম্পূর্ণ হলে শুধু আদালতের ডিক্রিতে তা বাতিল হতে পারে। স্বামী-স্ত্রী বা নিকট রক্তসম্পর্কের আত্মীয়কে দিলে, গ্রহীতা মারা গেলে, কিংবা সম্পত্তি বিক্রি বা রূপান্তর হয়ে গেলে বাস্তবে তা অপ্রত্যাহারযোগ্য।
প্রতারণা, জোরজবরদস্তি, অনুচিত প্রভাব বা প্রকৃত দখল হস্তান্তর না হলে আদালত হেবা বাতিল করতে পারেন। মৃত্যুশয্যায় (মরজুল মওত) করা দান উইলের মতো গণ্য হয় এবং ওয়ারিশদের সম্মতি ছাড়া এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্তই বৈধ। বাতিলের মামলার সময়সীমা আছে, সাধারণত বাদী ঘটনা জানার তিন বছরের মধ্যে, তাই দেরি করবেন না।
উইল না হেবা: কোনটা করবেন
| হেবা (দান) | উইল (অসিয়ত) | |
|---|---|---|
| কখন কার্যকর | এখনই, মালিকের জীবদ্দশায় | শুধু মৃত্যুর পর |
| কতটুকু | যেকোনো পরিমাণ, এমনকি সবটুকু | সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ |
| ওয়ারিশকে | দেওয়া যায় | অন্য ওয়ারিশদের সম্মতি লাগে |
| মালিক কি বদলাতে পারেন? | সম্পূর্ণ হলে সাধারণত না | মৃত্যু পর্যন্ত পারেন |
| রেজিস্ট্রেশন | জমির ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক | ঐচ্ছিক, তবে করা ভালো |
সম্পত্তিতে নিজে থাকতে চাইলে বসবাসের স্পষ্ট ব্যবস্থাসহ হেবা, অথবা এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে উইল বেশি উপযোগী হতে পারে। সই করার আগে পরামর্শ নিন; অন্য ওয়ারিশরা কী পেতেন তা জানতে দেখুন আমাদের উত্তরাধিকার আইনের গাইড।
মালিকানা যাচাই
রেকর্ডীয় মালিক, নামজারি সম্পন্ন, কর পরিশোধিত।
খসড়া ও খরচ
সম্পত্তির তফসিলসহ দলিল; প্রযোজ্য হলে নিকট আত্মীয়ের ফি।
রেজিস্ট্রেশন
সাব-রেজিস্ট্রারের সামনে দুজনের সই।
দখল ও নামজারি
নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর, তারপর গ্রহীতার নামে নামজারি।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
হেবা দলিল কাকে বলে?
যে রেজিস্ট্রিকৃত দলিলে মালিক জীবদ্দশায় বিনা মূল্যে সম্পত্তি দান করেন। মুসলিম আইনে এতে ঘোষণা, গ্রহণ ও দখল হস্তান্তর লাগে।
জমির হেবায় কি রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক?
হ্যাঁ। ২০০৫ সাল থেকে স্থাবর সম্পত্তির দান সম্পত্তি যে এলাকায়, সেখানকার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রি করতে হয়।
নিকট আত্মীয়দের মধ্যে হেবা দলিলের খরচ কত?
স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা ও সন্তান, আপন ভাই-বোন এবং দাদা-দাদি বা নানা-নানি ও নাতি-নাতনির মধ্যে হেবার ঘোষণাপত্রে নির্দিষ্ট রেজিস্ট্রেশন ফি (দীর্ঘদিন ধরে ১০০ টাকা) ও সামান্য স্ট্যাম্প শুল্ক লাগে। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বর্তমান তফসিল মিলিয়ে নিন।
হেবা দলিল করতে কি কি কাগজপত্র লাগে?
মূল ও ধারাবাহিক দলিল, সর্বশেষ খতিয়ান ও নামজারি খতিয়ান, ভূমি করের রসিদ, দাতা ও গ্রহীতার জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি, সম্পর্কের প্রমাণ এবং দুজন সাক্ষী।
হেবা দলিল কি বাতিল করা যায়?
দখল হস্তান্তরের পর শুধু আদালতের ডিক্রিতে, যেমন প্রতারণা, জোরজবরদস্তি বা দখল না দেওয়ার ক্ষেত্রে। স্বামী-স্ত্রী বা নিকট রক্তসম্পর্কের আত্মীয়কে দেওয়া হেবা বাতিল করা খুব কঠিন।
হেবা দলিল কার কার নামে করা যায়?
যে কারও নামে, আত্মীয় হোক বা না হোক। তবে কম ফি শুধু আইনে উল্লিখিত নিকট আত্মীয়দের জন্য।
বাবা কি সব সম্পত্তি এক সন্তানকে হেবা করতে পারেন?
হ্যাঁ, জীবদ্দশায় দখলসহ রেজিস্ট্রিকৃত হেবায়। অন্য সন্তানরা পরে তা উত্তরাধিকার হিসেবে দাবি করতে পারেন না, তবে চাপে বা মৃত্যুশয্যায় করা দান চ্যালেঞ্জ করা যায়।
মৃত্যুশয্যায় করা হেবা কি বৈধ?
এটি উইলের মতো গণ্য হয়: ওয়ারিশরা বেশি দিতে সম্মতি না দিলে সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত বৈধ।
হেবা দলিলের সম্পত্তি কি বিক্রি করা যায়?
হ্যাঁ। হেবা রেজিস্ট্রি, দখল হস্তান্তর ও নামজারি হয়ে গেলে গ্রহীতাই মালিক, তিনি যেকোনো মালিকের মতো বিক্রি, দান বা বন্ধক দিতে পারেন।
হেবা দলিলের জমি কি খারিজ (নামজারি) করা যায়?
হ্যাঁ। রেজিস্ট্রির পর গ্রহীতা হেবা দলিল দিয়ে ই-নামজারির আবেদন করেন, যাতে জমির রেকর্ডে নতুন মালিকের নাম ওঠে।
বাবা নাবালক ছেলেদের হেবা করেছেন; পরে কি তিনি সেই জমি বিক্রি করতে পারবেন?
বৈধ হেবা সম্পন্ন হলে জমি সন্তানদের। অভিভাবক হিসেবে বাবা নাবালকের জমি ইচ্ছামতো বিক্রি করতে পারেন না; সাধারণত আদালতের অনুমতি লাগে, আর বিক্রি হতে হবে সন্তানের স্বার্থে।
উত্তরাধিকার ও ওয়ারিশ বিষয়ে আরও পড়ুন
কে কত অংশ পাবেন, সাকসেশন সার্টিফিকেট ও ওয়ারিশি জমি বণ্টন।
মুসলিম উত্তরাধিকার আইন: স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ে কে কত পাবেন
সম্পত্তি বন্টন ও বণ্টননামা দলিল: ওয়ারিশি জমি ভাগের নিয়ম
ওয়ারিশ সনদ: অনলাইন আবেদন, কি কি লাগে ও যাচাই
মায়ের সম্পত্তি ভাগের নিয়ম: ছেলে, মেয়ে ও স্বামী কে কত পাবেন (২০২৬)
ওয়ারিশ সনদ ও সাকসেশন সার্টিফিকেট: পার্থক্য, খরচ ও প্রক্রিয়া
ফারায়েজ ক্যালকুলেটর: মুসলিম উত্তরাধিকারের অংশ হিসাব
পরিবারে সম্পত্তি দান করতে চান?
আমরা মালিকানা যাচাই করি, হেবা দলিল তৈরি ও রেজিস্ট্রি করি এবং নামজারি করে দিই, যাতে দান পরে টেকে। লিখিত প্রাথমিক মূল্যায়ন বিনামূল্যে।

মন্তব্য (২)
আমার বড় বোন বিদেশি বিয়ে করেছে। তার বাংলাদেশি এন আইডি আছে, সম্পত্তিতেও নাম আছে। তিনি গত বছর মারা যান।
তার ছেলে মেয়ে বিদেশি নাগরিক (বাংলাদেশে র কোন নাগরিকত্ব কার ও নেই), আমরা জানিনা কে কোথায় আছে।
এমতাবস্থায় তাদেরকে ডেকে এনে রাজউক বা সিডিএ তে উপস্থিত করা প্রায় অসম্ভব (ঠিকানা জানি না এবং বিমান টিকেট দিয়ে চাকুরীতে ছুটি নিয়ে বাংলাদেশি দীর্ঘ সূত্রী এই সব কাজ করতে কেউ আসবে না।)
এই কারনে বড় বোন এর ওয়ারিশ সম্পত্তি বিদেশি নাগরিক হিসাবে তারা পবে কি?
মুসলিম ফারাযি আইনে পাচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশি আইনের বাধ্যবধকতা আমরা তাদের উপর বিদেশি হিসাবে চাপাতে পারি না ।
এ ক্ষেত্রে আমাদের করনীয় কি?
আপনার বোনের সন্তানরা বিদেশি নাগরিক হলেও উত্তরাধিকারী হিসেবে সম্পত্তি পাবেন। বাংলাদেশের আইনে বিদেশি নাগরিকত্ব উত্তরাধিকারের পথে কোনো বাধা নয়। মুসলিম ফারায়েজ অনুযায়ী তাদের অংশ তাদেরই থাকবে, অন্য কেউ তা নিতে পারবে না।
তাদের দেশে আসার দরকার নেই। প্রত্যেকে যে দেশে আছেন, সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাসে গিয়ে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি (আমমোক্তারনামা) করে বাংলাদেশে কাউকে প্রতিনিধি বানাতে পারবেন। সেই প্রতিনিধিই ওয়ারিশ সনদ, নামজারি এবং রাজউক বা সিডিএ-তে নাম হস্তান্তরের কাজ করবেন। পরে চাইলে বিক্রিও করতে পারবেন।
দুটি বিষয় খেয়াল রাখবেন। প্রথমত, বোনের ছেলে থাকলে ফারায়েজ অনুযায়ী ভাইবোনেরা সাধারণত অংশ পান না। দ্বিতীয়ত, স্বামী বা সন্তানরা অমুসলিম হলে হিসাব বদলে যেতে পারে। তাই বণ্টন ঠিক করার আগে এই দুটি বিষয় নিশ্চিত হওয়া দরকার।