প্রতারণা মামলা (৪২০ ও ৪০৬ ধারা): কীভাবে করবেন, কীভাবে লড়বেন
থানায় যাওয়া টাকার বিরোধের বেশিরভাগই ৪২০ ও ৪০৬ ধারায় হয়। কিছু সত্যিকারের অপরাধ; অনেকগুলো আসলে অপরাধের রূপ দেওয়া দেওয়ানি পাওনা। কীভাবে চিনবেন আর দুই ক্ষেত্রেই কী করবেন, এখানে।
- ৪২০ ধারা প্রতারণা: শুরু থেকেই ছলনা করে টাকা বা সম্পত্তি নেওয়া।
- ৪০৬ ধারা অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ: বিশ্বাস করে দেওয়া সম্পত্তি আত্মসাৎ।
- ৪২০ জামিনযোগ্য; ৪০৬ জামিন অযোগ্য।
- শুধু ধার ফেরত না দেওয়া সাধারণত দেওয়ানি পাওনা, আর শুধু এমন মামলা আদালত বাতিল করে দেন।
এই গাইডে: ৪২০ আর ৪০৬ পাশাপাশি · প্রতারণা মামলা করার নিয়ম · ৪২০ বা ৪০৬ মামলায় প্রতিরক্ষা · সময় ও খরচ
সংক্ষেপে উত্তর
৪২০ ধারায় প্রতারণা করে সম্পত্তি হস্তগত করার শাস্তি সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও জরিমানা। মূল বিষয় হলো লেনদেনের একেবারে শুরুতেই অসৎ উদ্দেশ্য। ৪০৬ ধারায় অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের শাস্তি: আপনার টাকা বা মাল কারও জিম্মায় দেওয়া হয়েছিল এবং তিনি অসৎভাবে আত্মসাৎ করেছেন; শাস্তি সর্বোচ্চ তিন বছর, জরিমানা বা উভয়।
দুটিই থানায় এজাহার বা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নালিশি মামলা হিসেবে করা যায়। আপনি অভিযুক্ত হলে আর বিরোধটি আসলে অপরিশোধিত ধার বা চুক্তিভঙ্গ হলে হাইকোর্ট বিভাগ ৫৬১ক ধারায় মামলা বাতিল করতে পারেন।
৪২০ আর ৪০৬ পাশাপাশি
| ৪২০ ধারা (প্রতারণা) | ৪০৬ ধারা (বিশ্বাসভঙ্গ) | |
|---|---|---|
| মূল কথা | ছলনায় পড়ে সম্পত্তি দিয়েছেন | জিম্মায় দেওয়া সম্পত্তি আত্মসাৎ হয়েছে |
| মূল প্রমাণ | শুরুতেই অসৎ উদ্দেশ্য | জিম্মা দেওয়া, তারপর অসৎ ব্যবহার |
| সর্বোচ্চ শাস্তি | ৭ বছর ও জরিমানা | ৩ বছর, জরিমানা বা উভয় |
| জামিন | জামিনযোগ্য | জামিন অযোগ্য |
| সাধারণ উদাহরণ | ভুয়া জমি বিক্রি, চাকরি বা ভিসার প্রতারণা, ভুয়া বিনিয়োগ | ব্যবসার পার্টনার টাকা রেখে দেন, এজেন্ট মাল বিক্রি করে টাকা দেন না |
সরকারি কর্মচারী, ব্যাংকার বা এজেন্ট জিম্মার সম্পত্তি আত্মসাৎ করলে ৪০৯ ধারা প্রযোজ্য, যা অনেক গুরুতর এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে যেতে পারে।
প্রতারণা মামলা করার নিয়ম
- প্রমাণ জোগাড়: চুক্তি, রসিদ, ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের রেকর্ড, মেসেজ ও সাক্ষী।
- উকিল নোটিশ পাঠিয়ে টাকা ফেরত চান; জবাব বা নীরবতা দুটোই প্রমাণ হয়।
- মামলা: থানায় এজাহার, অথবা পুলিশ না নিলে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নালিশি মামলা।
- তদন্ত ও চার্জশিট অনুসরণ করুন; পুলিশ মামলা বাদ দিলে নারাজি দিন।
ফৌজদারি মামলা শাস্তি দেয়; এটি নিজে থেকে টাকা ফেরত দেয় না। টাকা আদায়ের জন্য পাশাপাশি দেওয়ানি মামলা বা মীমাংসার কথা ভাবুন।
৪২০ বা ৪০৬ মামলায় প্রতিরক্ষা
- জামিন: ৪২০ জামিনযোগ্য; ৪০৬-এ ম্যাজিস্ট্রেট, তারপর দায়রা জজ বা হাইকোর্ট বিভাগে আবেদন।
- দেওয়ানি বিরোধের যুক্তি: দেখান লেনদেন শুরুতে সৎ ছিল, পরে সমস্যা হয়েছে। এমন মামলা হাইকোর্ট বিভাগ নিয়মিত ৫৬১ক ধারায় বাতিল করেন।
- অব্যাহতি: অভিযোগ গঠনের সময় নথিতে অসৎ উদ্দেশ্যের প্রমাণ না থাকলে অব্যাহতি চান।
- মীমাংসা: টাকা ফেরত দিয়ে আপস করলে প্রায়ই মামলা শেষ হয়; আমাদের আপোষের গাইড দেখুন।
সময় ও খরচ
এজাহারের কোনো ফি নেই। নালিশি মামলায় সামান্য কোর্ট ফি ও আইনজীবীর ফি লাগে। ২০২৬ সালের সংশোধনে ১৭৩খ ধারায় তদন্ত শেষের সময় ৬০ কর্মদিবস, কারণ দেখিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট সময় বাড়াতে পারেন। বিচারে বেশি সময় লাগে, প্রায়ই এক বছরের বেশি।
প্রমাণ জোগাড়
লেনদেন, কাগজ, মেসেজ ও সাক্ষী।
নোটিশ পাঠান
নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে টাকা ফেরত চান।
এজাহার বা নালিশি মামলা
থানা বা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।
টাকা আদায়
পাশাপাশি দেওয়ানি মামলা বা মীমাংসা।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
৪২০ ধারার শাস্তি কী?
সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও জরিমানা।
৪০৬ ধারার শাস্তি কী?
সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয়।
৪২০ ধারা কি জামিনযোগ্য?
হ্যাঁ। ৪২০ ধারা জামিনযোগ্য; ৪০৬ ধারা জামিন অযোগ্য।
প্রতারণা মামলা করার নিয়ম কী?
প্রমাণ জোগাড় করুন, উকিল নোটিশ পাঠান, তারপর থানায় এজাহার দিন বা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নালিশি মামলা করুন।
কেউ ধার নিয়ে ফেরত দেয়নি। এটা কি ৪২০?
সাধারণত না। শুরু থেকে প্রতারণা না থাকলে সাধারণ ধার দেওয়ানি পাওনা। টাকা আদায়ের মামলা করুন, বা চেক বাউন্স করলে চেকের মামলা।
৪০৬ বা ৪২০ মামলা কি বাতিল করা যায়?
যায়। ঘটনায় শুধু দেওয়ানি বা চুক্তির বিরোধ থাকলে হাইকোর্ট বিভাগ ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১ক ধারায় মামলা বাতিল করতে পারেন।
৪২০ মামলা কি আপোষে মেটানো যায়?
যায়, আদালতের অনুমতি নিয়ে। ৪২০ (প্রতারিত ব্যক্তির মাধ্যমে) ও ৪০৬ (সম্পত্তির মালিকের মাধ্যমে) দুটিই ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪৫(২) ধারায় তালিকাভুক্ত। আইনজীবীর মাধ্যমে আপোষের দরখাস্ত দাখিল করুন এবং আদেশে তা লিপিবদ্ধ হয়েছে কি না দেখুন।
৪২০ মামলা করলে কি টাকা ফেরত পাব?
নিজে থেকে নয়। আদালত ক্ষতিপূরণের আদেশ দিতে পারেন, তবে টাকা আদায়ের নির্ভরযোগ্য পথ দেওয়ানি মামলা বা লিখিত মীমাংসা।
ফৌজদারি, পুলিশ ও সাইবার বিষয়ে আরও পড়ুন
গ্রেপ্তার ও জামিন, জিডি ও এজাহার, মিথ্যা মামলা ও সাইবার হয়রানি।
গ্রেপ্তারের পর প্রথম ২৪ ঘণ্টা: অধিকার, রিমান্ড ও জামিন
মিথ্যা মামলা হলে করণীয়: আগাম জামিন, খারিজ ও শাস্তি (২০২৬)
জিডি, এজাহার নাকি নালিশি মামলা: বাংলাদেশে মামলা করার সঠিক নিয়ম
সাইবার হয়রানি ও ফেক ফেসবুক আইডি: অভিযোগ করার সঠিক নিয়ম (২০২৬)
জামিনযোগ্য ও জামিন অযোগ্য ধারা: তালিকা ও ব্যাখ্যা
আগাম জামিন কিভাবে নিতে হয়: নিয়ম, কাগজ ও খরচ
ওয়ারেন্ট হলে করণীয়: আত্মসমর্পণ, জামিন ও রিকল
চার্জশিট, ফাইনাল রিপোর্ট ও নারাজি পিটিশন
মানহানি মামলা করার নিয়ম: ফৌজদারি ও দেওয়ানি
মামলা আপোষের নিয়ম ও আপোষনামা
গ্রেপ্তার হলে: জামিনের জন্য কী নোট করবেন ও আনবেন
সিআরপিসি সংশোধন ২০২৬: গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নতুন সুরক্ষা
প্রতারিত, নাকি প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্ত?
কাগজ পাঠান। এটি অপরাধ নাকি দেওয়ানি দাবি, আর পরের ধাপ কী, আমরা জানাই। লিখিত প্রাথমিক মূল্যায়ন বিনামূল্যে।

মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।