মানহানি মামলা করার নিয়ম: ফৌজদারি নালিশ, দেওয়ানি মামলা ও ফেসবুক পোস্ট
মিথ্যা কথায় সুনাম নষ্ট হলে দুইভাবে জবাব দেওয়া যায়: ফৌজদারি নালিশ বা ক্ষতিপূরণের দেওয়ানি মামলা। কোনটি কীভাবে চলে, আর অপর পক্ষ কী প্রতিরক্ষা দেবে, এখানে।
- ফৌজদারি মানহানি: সর্বোচ্চ দুই বছর, জরিমানা বা উভয় (৫০০ ধারা)।
- ফৌজদারি নালিশ শুধু মানহানির শিকার ব্যক্তিই ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে করতে পারেন।
- দেওয়ানি মামলায় সুনামহানির জন্য টাকা চাওয়া হয়; প্রকাশের এক বছরের মধ্যে করতে হয়।
- জনকল্যাণে সত্য কথা, ন্যায্য সমালোচনা ও সরল বিশ্বাসে অভিযোগ স্বীকৃত ব্যতিক্রম।
এই গাইডে: ফৌজদারি নাকি দেওয়ানি: কোন পথ · যা প্রমাণ করতে হবে · অপর পক্ষ যে প্রতিরক্ষা দেবে · ফেসবুক ও অনলাইন পোস্ট
সংক্ষেপে উত্তর
দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় মানহানি মানে কারও সুনামের ক্ষতি হবে জেনে বা উদ্দেশ্যে তার সম্পর্কে অভিযোগ তোলা বা প্রকাশ করা। ৫০০ ধারায় শাস্তি সর্বোচ্চ দুই বছর, জরিমানা বা উভয়। এটি শুধু নালিশে চলা অপরাধ: পুলিশ নিজে থেকে শুরু করতে পারে না, আর ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৮ ধারায় শুধু সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিই ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নালিশ করতে পারেন।
এর বাইরে দেওয়ানি আদালতে ক্ষতিপূরণের মামলা করা যায়। অনেকে দুটোই করেন: চাপ ও জবাবদিহির জন্য ফৌজদারি নালিশ, ক্ষতিপূরণের জন্য দেওয়ানি মামলা।
ফৌজদারি নাকি দেওয়ানি: কোন পথ
| ফৌজদারি নালিশ | ক্ষতিপূরণের দেওয়ানি মামলা | |
|---|---|---|
| কোথায় | ম্যাজিস্ট্রেট আদালত | দেওয়ানি আদালত (দাবির অঙ্ক অনুযায়ী) |
| কে করবেন | মানহানির শিকার ব্যক্তি | মানহানির শিকার ব্যক্তি |
| ফল | সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় | টাকায় ক্ষতিপূরণ, কখনো নিষেধাজ্ঞা |
| খরচ | সামান্য কোর্ট ফি ও আইনজীবীর ফি | দাবির অঙ্কের ওপর কোর্ট ফি |
| সময়সীমা | দ্রুত করুন | প্রকাশের এক বছরের মধ্যে |
যা প্রমাণ করতে হবে
- কথা, ছবি বা পোস্টটি আপনার সম্পর্কে এবং আপনাকে চেনা যায়।
- অন্তত আরেকজনের কাছে তা প্রকাশিত হয়েছে।
- এতে অন্যদের চোখে আপনার সুনাম কমেছে।
শুরুতেই প্রমাণ রাখুন: লিংক, তারিখ ও সময়সহ স্ক্রিনশট, সাক্ষীর বক্তব্য, পত্রিকা বা লিফলেটের কপি।
অপর পক্ষ যে প্রতিরক্ষা দেবে
৪৯৯ ধারায় দশটি ব্যতিক্রম আছে। সাধারণগুলো: জনকল্যাণে বলা সত্য কথা; জনসম্পৃক্ত আচরণের ন্যায্য সমালোচনা; আদালতের কার্যক্রমের ন্যায্য বিবরণ; আর আইনগত কর্তৃপক্ষের কাছে, যেমন পুলিশ বা নিয়োগকর্তার কাছে, সরল বিশ্বাসে অভিযোগ। ভালো মামলা আগেই এগুলোর জবাব ভেবে রাখে।
ফেসবুক ও অনলাইন পোস্ট
অনলাইনে মানহানির আলাদা সাইবার অপরাধটি (সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩-এর ২৯ ধারা) ২০২৫ সালে বাতিল হয়েছে। বর্তমান সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এ অনলাইন মানহানির কোনো সাধারণ অপরাধ নেই। তবু অনলাইনের কোনো বক্তব্য দণ্ডবিধির ৪৯৯ ও ৫০০ ধারায় ফৌজদারি মানহানি হতে পারে, ধারাগুলোর শর্ত ও ব্যতিক্রম সাপেক্ষে; আর ক্ষতিপূরণের দেওয়ানি মামলাও করা যায়।
ব্ল্যাকমেইল, যৌন হয়রানি বা আইনে নির্দিষ্টভাবে নিষিদ্ধ অন্য আচরণ থাকলে আলাদা সাইবার অপরাধ প্রযোজ্য হতে পারে। শুধু সুনামহানি সেগুলোর জন্য যথেষ্ট নয়। হয়রানি, ফেক আইডি বা হুমকির জন্য আমাদের সাইবার গাইড দেখুন।
প্রমাণ রাখুন
লিংক ও সময়সহ স্ক্রিনশট, কপি, সাক্ষী।
প্রত্যাহার চান
পোস্ট সরানো ও ক্ষমা চেয়ে উকিল নোটিশ প্রায়ই কাজ করে।
পথ বেছে নিন
ফৌজদারি নালিশ, দেওয়ানি মামলা, বা দুটোই।
সময়মতো মামলা
দেওয়ানি দাবি প্রকাশের এক বছরের মধ্যে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
মানহানি মামলা করার নিয়ম কী?
মানহানির শিকার ব্যক্তি হিসেবে প্রমাণসহ দণ্ডবিধির ৪৯৯ ও ৫০০ ধারায় ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নালিশ করুন। টাকায় ক্ষতিপূরণের জন্য দেওয়ানি মামলা করুন।
মানহানির শাস্তি কী?
৫০০ ধারায় সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয়।
অন্য কেউ কি আমার হয়ে মানহানির মামলা করতে পারেন?
সাধারণত না। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৮ ধারায় সীমিত ব্যতিক্রম ছাড়া শুধু সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিই নালিশ করতে পারেন।
মানহানি কি জামিনযোগ্য?
হ্যাঁ। ৫০০ ধারার মানহানি জামিনযোগ্য, আর মানহানির শিকার ব্যক্তি আপস করতে পারেন।
কত দিনের মধ্যে মামলা করতে হয়?
ক্ষতিপূরণের দেওয়ানি মামলা প্রকাশের এক বছরের মধ্যে। ফৌজদারি নালিশও দ্রুত করুন।
ফেসবুক পোস্টের জন্য কি মামলা করা যায়?
যায়, দণ্ডবিধির ৪৯৯ ও ৫০০ ধারায় ফৌজদারি মানহানি হিসেবে, বা ক্ষতিপূরণের দেওয়ানি মামলা হিসেবে। সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এ অনলাইন মানহানির সাধারণ কোনো অপরাধ নেই; এর সাইবার অপরাধগুলো ব্ল্যাকমেইল বা যৌন হয়রানির মতো নির্দিষ্ট আচরণে প্রযোজ্য।
সত্য কথা কি মানহানির প্রতিরক্ষা?
দণ্ডবিধিতে শুধু সত্য হলেই চলে না; কথাটি জনকল্যাণে বলা হতে হবে। ন্যায্য সমালোচনা ও সরল বিশ্বাসে অভিযোগও ব্যতিক্রম।
আগে কি উকিল নোটিশ পাঠাব?
প্রায়ই হ্যাঁ। পোস্ট সরানো ও ক্ষমা চেয়ে নোটিশে অনেক সময় বিষয়টি মিটে যায়, আর আদালত দেখেন আপনি যুক্তিসংগত আচরণ করেছেন।
ফৌজদারি, পুলিশ ও সাইবার বিষয়ে আরও পড়ুন
গ্রেপ্তার ও জামিন, জিডি ও এজাহার, মিথ্যা মামলা ও সাইবার হয়রানি।
গ্রেপ্তারের পর প্রথম ২৪ ঘণ্টা: অধিকার, রিমান্ড ও জামিন
মিথ্যা মামলা হলে করণীয়: আগাম জামিন, খারিজ ও শাস্তি (২০২৬)
জিডি, এজাহার নাকি নালিশি মামলা: বাংলাদেশে মামলা করার সঠিক নিয়ম
সাইবার হয়রানি ও ফেক ফেসবুক আইডি: অভিযোগ করার সঠিক নিয়ম (২০২৬)
জামিনযোগ্য ও জামিন অযোগ্য ধারা: তালিকা ও ব্যাখ্যা
আগাম জামিন কিভাবে নিতে হয়: নিয়ম, কাগজ ও খরচ
ওয়ারেন্ট হলে করণীয়: আত্মসমর্পণ, জামিন ও রিকল
প্রতারণা মামলা (৪২০ ও ৪০৬ ধারা): করার নিয়ম ও প্রতিরক্ষা
চার্জশিট, ফাইনাল রিপোর্ট ও নারাজি পিটিশন
মামলা আপোষের নিয়ম ও আপোষনামা
গ্রেপ্তার হলে: জামিনের জন্য কী নোট করবেন ও আনবেন
সিআরপিসি সংশোধন ২০২৬: গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নতুন সুরক্ষা
মানহানির শিকার, নাকি অভিযুক্ত?
কথাগুলো আর কোথায় প্রকাশ হয়েছে পাঠান। সবচেয়ে ভালো পথ নিয়ে আমরা পরামর্শ দিই। লিখিত প্রাথমিক মূল্যায়ন বিনামূল্যে।

মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।