জামিনযোগ্য ও জামিন অযোগ্য ধারা: প্রচলিত ধারার তালিকা ও ব্যাখ্যা
ধারা জামিনযোগ্য হলে জামিন আপনার অধিকার, না হলে আদালতের কাছে আবেদন। সবচেয়ে বেশি আসা ধারাগুলো আর প্রতিটি ক্ষেত্রে করণীয় এখানে।
- জামিনযোগ্য অপরাধে জামিন অধিকার: পুলিশ বা আদালত মুচলেকায় ছাড়তে বাধ্য।
- জামিন অযোগ্য অপরাধেও জামিন হয়, তবে সিদ্ধান্ত আদালতের।
- ৪২০ ও ৩২৩ জামিনযোগ্য; ৪০৬, ৩০৭, ৩২৬ ও ৩৭৯ জামিন অযোগ্য।
- নারী, ১৬ বছরের কম বয়সী শিশু এবং অসুস্থ বা অক্ষম ব্যক্তি জামিন অযোগ্য মামলায়ও বিশেষ বিবেচনা পান।
এই গাইডে: প্রচলিত ধারাগুলো এক নজরে · জামিনযোগ্য মানে বাস্তবে কী · জামিন অযোগ্য মামলায় জামিন পাওয়ার উপায় · একাধিক ধারা থাকলে কী হয়
সংক্ষেপে উত্তর
ফৌজদারি কার্যবিধির দ্বিতীয় তফসিলে প্রতিটি অপরাধ জামিনযোগ্য বা জামিন অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত। অপরাধ জামিনযোগ্য হলে ৪৯৬ ধারা অনুযায়ী জামিন আপনার অধিকার: কর্মকর্তা বা আদালত জামিনদারসহ বা ছাড়া মুচলেকায় ছেড়ে দিতে বাধ্য। জামিন অযোগ্য হলে ৪৯৭ ধারায় আদালত জামিন দিতে পারেন, তবে অভিযোগের গুরুত্ব, প্রমাণ আর পালিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বিবেচনা করেন।
নিচের টেবিলে মানুষ সবচেয়ে বেশি যেসব ধারা খোঁজেন সেগুলো আছে। এজাহার বা চার্জশিটে ঠিক কোন কোন ধারা আছে দেখে নিন, কারণ তালিকায় একটি গুরুতর ধারা থাকলেই বাস্তবে পুরো মামলা জামিন অযোগ্য হিসেবে চলে।
প্রচলিত ধারাগুলো এক নজরে
| ধারা (দণ্ডবিধি) | অপরাধ | জামিনযোগ্য? | সর্বোচ্চ শাস্তি |
|---|---|---|---|
| ১৪৩ | বেআইনি সমাবেশের সদস্য হওয়া | হ্যাঁ | ৬ মাস, জরিমানা বা উভয় |
| ১৪৭ / ১৪৮ | দাঙ্গা / মারাত্মক অস্ত্রসহ দাঙ্গা | হ্যাঁ | ২ বছর / ৩ বছর |
| ৩২৩ | ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত | হ্যাঁ | ১ বছর বা ১,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা |
| ৩২৪ | বিপজ্জনক অস্ত্র দিয়ে আঘাত | হ্যাঁ | ৩ বছর |
| ৩২৫ | ইচ্ছাকৃতভাবে গুরুতর আঘাত | না (ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোধন) আইন, ২০২৬ থেকে) | ৭ বছর ও জরিমানা |
| ৩২৬ | বিপজ্জনক অস্ত্র দিয়ে গুরুতর আঘাত | না | যাবজ্জীবন বা ১০ বছর |
| ৩৪১ / ৩৪২ | অন্যায়ভাবে বাধা / অন্যায়ভাবে আটক | হ্যাঁ | ১ মাস / ১ বছর |
| ৩৫৪ | শ্লীলতাহানির উদ্দেশ্যে নারীকে আক্রমণ | হ্যাঁ | ২ বছর |
| ৩৭৯ / ৩৮০ | চুরি / বসতবাড়িতে চুরি | না | ৩ বছর / ৭ বছর |
| ৪০৬ | অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ | না | ৩ বছর, জরিমানা বা উভয় |
| ৪০৯ | সরকারি কর্মচারী, ব্যাংকার বা এজেন্টের বিশ্বাসভঙ্গ | না | যাবজ্জীবন বা ১০ বছর |
| ৪১৭ / ৪২০ | প্রতারণা / প্রতারণা করে সম্পত্তি হস্তগত করা | হ্যাঁ | ১ বছর / ৭ বছর ও জরিমানা |
| ৪৪৭ / ৪৪৮ | অপরাধমূলক অনধিকার প্রবেশ / গৃহে অনধিকার প্রবেশ | হ্যাঁ | ৩ মাস / ১ বছর |
| ৫০০ | মানহানি | হ্যাঁ | ২ বছর, জরিমানা বা উভয় |
| ৫০৪ | শান্তিভঙ্গে উসকানি দিতে ইচ্ছাকৃত অপমান | হ্যাঁ | ২ বছর |
| ৫০৬ | অপরাধমূলক ভীতি প্রদর্শন | হ্যাঁ (নোট দেখুন) | ২ বছর; হত্যা বা গুরুতর আঘাতের হুমকি হলে ৭ বছর |
| ৫০৯ | কথা বা অঙ্গভঙ্গিতে নারীর শ্লীলতাহানি | হ্যাঁ | ১ বছর |
| ৩০৭ | খুনের চেষ্টা | না | ১০ বছর; আঘাত হলে যাবজ্জীবন |
| ৩০২ | খুন | না | মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন |
সূত্র: ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর দ্বিতীয় তফসিল, বিচার বিভাগের জামিনযোগ্য অপরাধের তালিকা অনুযায়ী। ৫০৬ ধারা নিয়ে নোট: তালিকায় ভীতি প্রদর্শনকে জামিনযোগ্য দেখানো হয়েছে; তবে হত্যার হুমকির ক্ষেত্রে আদালত অনেক কঠোর থাকেন, তাই শুনানিতে বিরোধিতা আশা করুন।
জামিনযোগ্য মানে বাস্তবে কী
জামিনযোগ্য মামলায় থানা থেকেই মুচলেকায় ছাড়া পাওয়া যায়, অথবা প্রথম হাজিরায় ম্যাজিস্ট্রেট জামিন দেন। আদালত মুচলেকার অঙ্ক ও জামিনদারের সংখ্যা ঠিক করেন, কিন্তু জামিন পুরোপুরি নামঞ্জুর করতে পারেন না। জামিনযোগ্য ধারার অনেক মামলা গ্রেপ্তার দিয়ে নয়, সমন দিয়ে শুরু হয়।
জামিন মানে মামলা শেষ নয়। প্রতিটি তারিখে হাজির থাকতে হবে, অথবা আইনজীবীর মাধ্যমে হাজিরা মওকুফের আবেদন করতে হবে; নইলে জামিন বাতিল হয়ে ওয়ারেন্ট হতে পারে।
জামিন অযোগ্য মামলায় জামিন পাওয়ার উপায়
- প্রথম আদালত: হাজির করা বা আত্মসমর্পণের সময় ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন।
- নামঞ্জুর হলে: দায়রা জজ, তারপর হাইকোর্ট বিভাগ।
- আদালত যা দেখেন: অভিযুক্তের কথিত ভূমিকা, নথির প্রমাণ, কত দিন হাজতে আছেন, স্বাস্থ্য, বয়স আর সাক্ষীকে প্রভাবিত করার ঝুঁকি।
- বিশেষ ক্ষেত্র: ৪৯৭ ধারায় গুরুতর মামলায়ও নারী, ১৬ বছরের কম বয়সী শিশু বা অসুস্থ ও অক্ষম ব্যক্তিকে আদালত জামিন দিতে পারেন।
গ্রেপ্তারের আগে উপযুক্ত ক্ষেত্রে হাইকোর্ট বিভাগ আগাম জামিন দিতে পারেন। আমাদের আগাম জামিনের গাইড দেখুন।
একাধিক ধারা থাকলে কী হয়
বেশিরভাগ এজাহারে কয়েকটি ধারা থাকে, যেমন ৩২৩/৩২৪/৫০৬ বা ৪০৬/৪২০। ওই পর্যায়ে আদালত যে সবচেয়ে গুরুতর ধারা গ্রহণ করেন, জামিন তার ভিত্তিতেই ঠিক হয়। পরে চার্জশিটে পুলিশ কোনো ধারা বাদ দিলে আবার আবেদন করুন: অবস্থা আপনার পক্ষে বদলাতে পারে।
এজাহার পড়ুন
কোন কোন ধারা আছে লিখে রাখুন; সবচেয়ে গুরুতর ধারাই জামিনের পথ ঠিক করে।
টেবিল মিলিয়ে নিন
জামিনযোগ্য হলে মুচলেকায় মুক্তি চান; জামিন অযোগ্য হলে যুক্তি ও কাগজ প্রস্তুত করুন।
জামিনদার ঠিক করুন
জাতীয় পরিচয়পত্র ও ঠিকানার প্রমাণসহ জামিনদার, প্রয়োজনে ডাক্তারি কাগজ আনুন।
প্রতিটি তারিখ রক্ষা করুন
প্রতিটি শুনানিতে হাজির থাকুন বা আগেই হাজিরা মওকুফ চান, যাতে জামিন বাতিল না হয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
৪২০ ধারা কি জামিনযোগ্য?
হ্যাঁ। ফৌজদারি কার্যবিধির দ্বিতীয় তফসিল অনুযায়ী ৪২০ ধারার প্রতারণা জামিনযোগ্য, তাই জামিন পাওয়া অধিকার। শাস্তি সর্বোচ্চ সাত বছর ও জরিমানা।
৪০৬ ধারা কি জামিনযোগ্য?
না। ৪০৬ ধারার অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ জামিন অযোগ্য, জামিন আদালতের বিবেচনা। প্রায়ই এটি ৪২০ ধারার সঙ্গে দেওয়া হয়।
৩২৩ ও ৫০৬ ধারা কি জামিনযোগ্য?
হ্যাঁ, দুটিই জামিনযোগ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত। তবে ৫০৬ ধারায় হত্যার হুমকির অভিযোগ থাকলে বাস্তবে আদালত অনেক কঠোর থাকেন, রাষ্ট্রপক্ষ জামিনের বিরোধিতা করবে বলে ধরে নিন।
৩০৭ ধারা কি জামিনযোগ্য?
না। খুনের চেষ্টা জামিন অযোগ্য, শাস্তি সর্বোচ্চ দশ বছর, আঘাত হলে যাবজ্জীবন। জামিনের জন্য শক্ত আবেদন লাগে, অনেক সময় হাইকোর্ট বিভাগে যেতে হয়।
জামিন অযোগ্য অপরাধে কি জামিন হয়?
হয়। ৪৯৭ ধারায় আদালত জামিন দিতে পারেন। প্রমাণ, আপনার ভূমিকা, হাজতে থাকার সময় আর পালানোর ঝুঁকি দেখা হয়। নারী, ১৬ বছরের কম বয়সী শিশু ও অসুস্থ ব্যক্তি বিশেষ বিবেচনা পান।
জামিন অযোগ্য ধারা কোনগুলো?
প্রচলিত গুলো হলো ৩০২, ৩০৪, ৩০৭, ৩২৬, ৩৭৬, ৩৭৯, ৩৮০, ৩৯২, ৩৯৫, ৪০৬ ও ৪০৯। পূর্ণ অবস্থান ফৌজদারি কার্যবিধির দ্বিতীয় তফসিলে আছে।
জামিন নিতে কত টাকা লাগে?
জামিনের কোনো সরকারি ফি নেই। খরচ হলো আইনজীবীর ফি, আর আদালত যে অঙ্ক ঠিক করেন, সেই অঙ্কের মুচলেকায় জামিনদার সই করেন।
জামিন কি বাতিল হতে পারে?
পারে, যদি হাজিরা না দেন, সাক্ষীকে হুমকি দেন, প্রমাণ নষ্ট করেন বা জামিনের শর্ত ভাঙেন। তখন আদালত ওয়ারেন্ট দিতে পারেন।
ফৌজদারি, পুলিশ ও সাইবার বিষয়ে আরও পড়ুন
গ্রেপ্তার ও জামিন, জিডি ও এজাহার, মিথ্যা মামলা ও সাইবার হয়রানি।
গ্রেপ্তারের পর প্রথম ২৪ ঘণ্টা: অধিকার, রিমান্ড ও জামিন
মিথ্যা মামলা হলে করণীয়: আগাম জামিন, খারিজ ও শাস্তি (২০২৬)
জিডি, এজাহার নাকি নালিশি মামলা: বাংলাদেশে মামলা করার সঠিক নিয়ম
সাইবার হয়রানি ও ফেক ফেসবুক আইডি: অভিযোগ করার সঠিক নিয়ম (২০২৬)
আগাম জামিন কিভাবে নিতে হয়: নিয়ম, কাগজ ও খরচ
ওয়ারেন্ট হলে করণীয়: আত্মসমর্পণ, জামিন ও রিকল
প্রতারণা মামলা (৪২০ ও ৪০৬ ধারা): করার নিয়ম ও প্রতিরক্ষা
চার্জশিট, ফাইনাল রিপোর্ট ও নারাজি পিটিশন
মানহানি মামলা করার নিয়ম: ফৌজদারি ও দেওয়ানি
মামলা আপোষের নিয়ম ও আপোষনামা
গ্রেপ্তার হলে: জামিনের জন্য কী নোট করবেন ও আনবেন
সিআরপিসি সংশোধন ২০২৬: গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নতুন সুরক্ষা
আজই জামিন দরকার?
এজাহার বা মামলার নম্বর পাঠান; কোন পথে জামিন হবে আর কী আনতে হবে, আমরা জানাব। লিখিত প্রাথমিক মূল্যায়ন বিনামূল্যে।

মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।