ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধন আইন ২০২৬: গ্রেফতার, রিমান্ড ও পুলিশ তদন্তে কী বদলেছে
২০২৫ সালের দুটি অধ্যাদেশ, যা সংসদে ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোধন) আইন ২০২৬ হিসেবে পাস হয়েছে, ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর সেই অংশগুলো বদলেছে যেগুলোর মুখোমুখি সাধারণ মানুষ প্রথমে হন: গ্রেফতার, ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে প্রথম হাজিরা, রিমান্ড ও পুলিশ রিপোর্ট। এই গাইডে ধারা ধরে নতুন নিয়ম ও কোথায় কী দাবি করবেন তা বলা হয়েছে।
- অফিসারকে পরিচয় দেখাতে ও লিখিত গ্রেফতার মেমো দিতে হবে
- সম্ভব হলে ১২ ঘণ্টায় আইনজীবী; ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পরিবারকে জানানো
- পুলিশ হেফাজত মোট সর্বোচ্চ ১৫ দিন
- তদন্ত ৬০ কর্মদিবসে; অন্তর্বর্তী অব্যাহতি সম্ভব
- মিথ্যা মামলায় ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ
এই গাইডে: গ্রেফতার: ধারা ৪৬ক থেকে ৪৬ঙ · ৫৪ ধারায় গ্রেফতার ও নতুন ৬৭ক ধারা · রিমান্ড: ১৫ দিনের সীমা ও দুইবার ডাক্তারি পরীক্ষা · তদন্তের সময়সীমা: ধারা ১৭৩ক ও ১৭৩খ · জরিমানা, সংক্ষিপ্ত বিচার ও অন্যান্য পরিবর্তন · বাস্তব গ্রেফতারে সংশোধনী কাজে লাগানো
সংক্ষেপে উত্তর
২০২৫ সালের অধ্যাদেশ, এখন ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোধন) আইন ২০২৬, সুপ্রিম কোর্টের ব্লাস্ট নির্দেশনাগুলো সরাসরি আইনে ঢুকিয়েছে। গ্রেফতারকারী অফিসারকে দৃশ্যমান পরিচয়পত্র পরতে ও চাইলে দেখাতে হবে; পরিবারের সদস্য বা স্থানীয় সাক্ষীর স্বাক্ষরসহ লিখিত গ্রেফতার মেমো তৈরি করতে হবে; গ্রেফতার ব্যক্তিকে আত্মীয়কে জানানো ও আইনজীবীর সাথে পরামর্শের সুযোগ দিতে হবে, সম্ভব হলে ১২ ঘণ্টার মধ্যে; আহত বা অসুস্থ হলে চিকিৎসা দিতে হবে। ৫৪ ধারায় গ্রেফতারে কারণ লিখতে হবে, মোট পুলিশ রিমান্ড সর্বোচ্চ ১৫ দিন এবং আগে-পরে ডাক্তারি পরীক্ষা বাধ্যতামূলক, আর তদন্ত শেষ করতে হবে ৬০ কর্মদিবসের মধ্যে, যার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য নেই তাকে আগেই অব্যাহতি দেওয়া যাবে। ম্যাজিস্ট্রেটের জরিমানার ক্ষমতা বেড়েছে, সংক্ষিপ্ত বিচার ঘটনাস্থলে করা যাবে, ২৫০ ধারায় মিথ্যা মামলায় ক্ষতিপূরণ এখন বাধ্যতামূলক, আর নতুন ৬৭ক ধারায় নিয়ম না মানলে অফিসার দায়ী হবেন।
গ্রেফতার: ধারা ৪৬ক থেকে ৪৬ঙ
নতুন ধারাগুলো পরোয়ানাসহ বা ছাড়া, সব গ্রেফতারে প্রযোজ্য।
- পরিচয়। অফিসারকে দৃশ্যমান পরিচয়পত্র পরতে হবে, জিজ্ঞেস করলে পরিচয় বলতে হবে ও চাইলে সরকারি কার্ড দেখাতে হবে। সাদা পোশাকে পরিচয় ছাড়া গ্রেফতার এখন শুধু নির্দেশনা নয়, আইনের লঙ্ঘন।
- গ্রেফতার মেমো। গ্রেফতারের সময়, স্থান ও কারণ লেখা একটি লিখিত মেমো, পরিবারের সদস্য বা সম্মানিত স্থানীয় সাক্ষীর প্রত্যয়ন ও গ্রেফতার ব্যক্তির পাল্টা স্বাক্ষরসহ। সাক্ষী না পাওয়া গেলে কারণ লিখতে হবে। গ্রেফতারের তথ্য থানার জিডিতে লিখে ডিজিটালভাবে প্রদর্শনও করতে হবে।
- যোগাযোগ ও আইনজীবী। আত্মীয় বা বন্ধুকে জানানো ও আইনজীবীর সাথে পরামর্শের অধিকার জানাতে হবে, আইনজীবী সম্ভব হলে ১২ ঘণ্টার মধ্যে; পরিবারের সদস্য বা মনোনীত বন্ধুকে যত দ্রুত সম্ভব, সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জানাতে হবে।
- চিকিৎসা। আহত বা অসুস্থ হলে সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষা ও চিকিৎসা, সম্ভব হলে সরকারি চিকিৎসকের মাধ্যমে, এবং সনদ দিতে হবে।
৫৪ ধারায় গ্রেফতার ও নতুন ৬৭ক ধারা
৫৪ ধারা (সন্দেহে পরোয়ানা ছাড়া গ্রেফতার) কঠোর করা হয়েছে: অফিসারের হাতে সুনির্দিষ্ট কারণ থাকতে ও তা লিখতে হবে, এবং আগের মতোই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে। নতুন ৬৭ক ধারায় নিয়ম না মানা বা অবহেলার জন্য গ্রেফতারকারী কর্তৃপক্ষ জবাবদিহি করবে, ফলে প্রথম হাজিরাতেই ম্যাজিস্ট্রেট ব্যবস্থা নিতে পারেন। মেমো না থাকলে বা কারণ অস্পষ্ট হলে প্রথম জামিন বা রিমান্ড শুনানিতেই তা বলুন; এটি এখন আইনগত ত্রুটি, শুধু অভিযোগ নয়।
রিমান্ড: ১৫ দিনের সীমা ও দুইবার ডাক্তারি পরীক্ষা
জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজত এক মামলায় মোট সর্বোচ্চ ১৫ দিন। এর বেশি হলে জেল হাজত। নতুন উপধারা ১৬৭(২ক) অনুযায়ী পুলিশের হাতে দেওয়ার আগে ও ফেরত আসার পরে ম্যাজিস্ট্রেট ডাক্তারি পরীক্ষা করাবেন, যাতে হেফাজতে আঘাত নথিভুক্ত হয়। ১৬৭ক ধারায় “শ্যোন অ্যারেস্ট” আবেদন শুধু তখনই শোনা যাবে যখন আসামিকে কাগজপত্রসহ সশরীরে হাজির করে শুনানির সুযোগ দেওয়া হয়। তিনটিই দাবি করুন: হাজিরা, কাগজ, শুনানি।
তদন্তের সময়সীমা: ধারা ১৭৩ক ও ১৭৩খ
১৭৩খ ধারায় তথ্য প্রাপ্তি থেকে ৬০ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে। তদন্ত কর্মকর্তা কারণ জানিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে সময় চাইতে পারেন, তাই এটি স্বয়ংক্রিয় খারিজের নিয়ম নয়, তবে অযৌক্তিক দেরিতে ম্যাজিস্ট্রেট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন। ১৭৩ক ধারায় অন্তর্বর্তী তদন্ত রিপোর্টে কারও বিরুদ্ধে সাক্ষ্য না থাকলে আদালত চূড়ান্ত রিপোর্টের আগেই তাকে অব্যাহতি দিতে পারে; নতুন সাক্ষ্য এলে নাম আবার যুক্ত হতে পারে। জামিনে থাকা আসামির অনিশ্চয়তা কমে; বাদীর হাতে চাপ দেওয়ার তারিখ আসে। ৬০তম কর্মদিবস ডায়েরিতে লিখে রাখুন, কিছু না হলে আদালতে আবেদন করুন।
জরিমানা, সংক্ষিপ্ত বিচার ও অন্যান্য পরিবর্তন
- ধারা ৩২: প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট এখন ৫ লাখ, দ্বিতীয় শ্রেণি ৩ লাখ ও তৃতীয় শ্রেণি ২ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারেন, ফলে বেশি মামলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতেই থাকবে।
- ধারা ২৬৪ক: তফসিলভুক্ত অপরাধের সংক্ষিপ্ত বিচার আদালতের এখতিয়ারের যেকোনো জায়গায় বিচারিক কর্মকর্তার মাধ্যমে একই বৈঠকে রায়সহ করা যাবে।
- ধারা ২৫০: ম্যাজিস্ট্রেট অভিযোগ মিথ্যা ও তুচ্ছ বা হয়রানিমূলক পেলে বাদীকে আসামির জন্য ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণের আদেশ দিতে পারেন, আর এই ক্ষমতা এখন বিবেচনা নয়, কর্তব্য।
- ডিজিটাল সমন, অনলাইন জামিননামা, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর সুরক্ষা এবং বেত্রাঘাত শাস্তির বিলোপ একই প্যাকেজে এসেছে।
২০২৫ সালের অধ্যাদেশগুলো ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোধন) আইন ২০২৬ হিসেবে পাস হয়েছে; আমাদের আইনি আপডেট দেখুন। গ্রেফতারের সুরক্ষাগুলো ব্লাস্ট নির্দেশনারও অনুসারী, যা এমনিতেই বাধ্যতামূলক।
বাস্তব গ্রেফতারে সংশোধনী কাজে লাগানো
নিয়ম তখনই কাজে লাগে যখন কেউ তা দাবি করে। পরিবার লিখে রাখবে গ্রেফতারের সময়, অফিসারের নাম ও ইউনিট, মেমো দেওয়া হয়েছে কি না। আইনজীবী প্রথম হাজিরায় ম্যাজিস্ট্রেটকে বলবেন ৪৬ক–৪৬ঙ মানা হয়েছে কি না তা নথিভুক্ত করতে, রিমান্ডের আগে ডাক্তারি পরীক্ষার আদেশ দিতে, রিমান্ড যৌক্তিক দিনে সীমিত রাখতে ও ৬০ কর্মদিবসের সময়সীমা নোট করতে। বাস্তব দিকগুলো আমাদের গ্রেফতারের প্রথম ২৪ ঘণ্টা গাইডে আছে।
তথ্য লিখুন
সময়, স্থান, অফিসার, ইউনিট, মেমো দেওয়া হয়েছে কি না।
১২ ঘণ্টায় আইনজীবী
আইনে এখন তা বলা আছে; কাজে লাগান।
প্রথম হাজিরা
ম্যাজিস্ট্রেটকে নিয়ম মানার রেকর্ড ও ডাক্তারি পরীক্ষার আদেশ দিতে বলুন।
ঘড়ি দেখুন
রিমান্ড সর্বোচ্চ ১৫ দিন; পুলিশ রিপোর্ট ৬০ কর্মদিবস।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
২০২৫ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধনীতে গ্রেফতারে কী বদলেছে?
৪৬ক–৪৬ঙ ধারা যুক্ত হয়েছে: অফিসারকে পরিচয় দেখাতে হবে, সাক্ষীর স্বাক্ষরসহ লিখিত গ্রেফতার মেমো দিতে হবে, পরিবার ও আইনজীবীর সাথে যোগাযোগের সুযোগ (সম্ভব হলে ১২ ঘণ্টায়) এবং আহত বা অসুস্থ হলে চিকিৎসা দিতে হবে।
৫৪ ধারায় পুলিশ কি এখনও পরোয়ানা ছাড়া গ্রেফতার করতে পারে?
পারে, তবে সুনির্দিষ্ট কারণ লিখতে হবে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে, আর নতুন ৬৭ক ধারায় নিয়ম না মানলে অফিসার দায়ী হবেন।
এখন কত দিন পুলিশ রিমান্ড দেওয়া যায়?
এক মামলায় মোট ১৫ দিন। এর বেশি হেফাজত হবে জেল হাজত, এবং পুলিশ হেফাজতের আগে ও পরে ম্যাজিস্ট্রেট ডাক্তারি পরীক্ষার আদেশ দেবেন।
চার্জশিট দিতে পুলিশ কত সময় পায়?
১৭৩খ ধারায় এজাহার থেকে ৬০ কর্মদিবস, সীমিত ক্ষেত্রে বাড়ানো যায়। অকারণ দেরি করলে ম্যাজিস্ট্রেট তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন।
গ্রেফতার মেমো কী?
গ্রেফতারের সময়, স্থান ও কারণের লিখিত রেকর্ড, পরিবারের সদস্য বা স্থানীয় সাক্ষীর প্রত্যয়ন ও গ্রেফতার ব্যক্তির স্বাক্ষরসহ। সাক্ষী না পেলে অফিসারকে কারণ লিখতে হবে।
পুলিশ নতুন নিয়ম না মানলে কী হয়?
এটি আইনের লঙ্ঘন, যার ওপর ম্যাজিস্ট্রেট ৬৭ক ধারাসহ ব্যবস্থা নিতে পারেন। এটি জামিনের পক্ষে যায়, রিমান্ড সীমিত করে এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা হাইকোর্ট বিভাগে অভিযোগের ভিত্তি হয়।
ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জরিমানা কি বদলেছে?
হ্যাঁ। সংশোধিত ৩২ ধারায় প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট ৫ লাখ, দ্বিতীয় শ্রেণি ৩ লাখ ও তৃতীয় শ্রেণি ২ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারেন।
২০২৫ সালের সংশোধনী কি এখনও বলবৎ?
হ্যাঁ। ২০২৫ সালের দুটি অধ্যাদেশ সংসদে ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোধন) আইন ২০২৬ হিসেবে পাস হয়েছে; গ্রেফতারের সুরক্ষাগুলো সুপ্রিম কোর্টের ব্লাস্ট নির্দেশনারও অংশ, যা এমনিতেই পুলিশের জন্য বাধ্যতামূলক।
ফৌজদারি মামলা ও পুলিশ বিষয়ে আরও পড়ুন
গ্রেফতার, জামিন, জিডি ও এজাহার, মিথ্যা মামলা ও সাইবার অভিযোগ।
কেউ গ্রেফতার বা রিমান্ডের মুখে?
এখনই কল করুন। আমরা প্রথম হাজিরায় থাকি, ২০২৫ সালের সুরক্ষাগুলো দাবি করি এবং একই দিনে জামিনের আবেদন করি। লিখিত প্রাথমিক মূল্যায়ন বিনামূল্যে।

মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।