অগ্রক্রয় (প্রিয়েমশন) মামলা: কে করতে পারে, সময়সীমা ও বাঁচার উপায়
যৌথ জমির কোনো শরিক তাঁর অংশ বাইরের কারও কাছে বিক্রি করলে আইন অন্য শরিককে একই দামে সেই জমি নিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিতে পারে। একেই অগ্রক্রয়, প্রিয়েমশন বা হকশুফা বলে। সময়সীমা খুব কম, জমার অঙ্ক বড়, আর ক্রেতা টাকা দিয়েও জমি হারাতে পারেন। তাই দুই পক্ষেরই নিয়মগুলো জানা দরকার।
- কৃষি জমিতে ৯৬ ধারায় মামলা করতে পারেন শুধু উত্তরাধিকার সূত্রে শরিক
- নোটিশ বা জানার ২ মাসের মধ্যে, রেজিস্ট্রির ৩ বছর পর কখনোই নয়
- মামলার সময় দাম, ২৫% ক্ষতিপূরণ ও বছরে ৮% সরল সুদ জমা দিতে হয়
- হেবা, বিনিময় ও বসতবাড়ির জমি ৯৬ ধারার বাইরে
এই গাইডে: অগ্রক্রয় বা প্রিয়েমশন মামলা কি? · অগ্রক্রয় মামলা কে করতে পারে? · অগ্রক্রয় মামলা কত দিনের মধ্যে করতে হবে ও কত টাকা জমা দিতে হয় · প্রিয়েমশন মামলা করার নিয়ম: আদালতে মামলা কীভাবে চলে · অগ্রক্রয় মামলা থেকে বাঁচার উপায়: ক্রেতার আইনসম্মত সুরক্ষা
সংক্ষেপে উত্তর
অগ্রক্রয় মামলায় একজন শরিক বাইরের ক্রেতার কাছে বিক্রি হওয়া জমি আদালতের মাধ্যমে নিজে কিনে নিতে পারেন। কৃষি জমির ক্ষেত্রে আইন হলো রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০-এর ৯৬ ধারা। ২০০৬ সালের সংশোধনের পর শুধু উত্তরাধিকার সূত্রে শরিকই মামলা করতে পারেন। বিক্রির নোটিশ পাওয়ার বা বিক্রির কথা জানার ২ মাসের মধ্যে মামলা করতে হবে, আর দলিল রেজিস্ট্রির ৩ বছর পর কোনো মামলা চলবে না। মামলার সঙ্গেই দলিলে লেখা পুরো দাম, ২৫% ক্ষতিপূরণ এবং বছরে ৮% সরল সুদ আদালতে জমা দিতে হয়। অকৃষি জমির নিয়ম আলাদা আইনে, আলাদা শর্তে।
অগ্রক্রয় বা প্রিয়েমশন মামলা কি?
অগ্রক্রয় মানে ক্রেতার জায়গায় নিজে ক্রেতা হওয়ার অধিকার। কোনো শরিক তাঁর অবিভক্ত অংশ জোতের বাইরের কারও কাছে বিক্রি করলে অন্য শরিক দাম পরিশোধ করে সেই অংশ নিজের নামে নেওয়ার জন্য আদালতে আবেদন করতে পারেন। উদ্দেশ্য হলো পারিবারিক যৌথ জমিতে বাইরের লোক ঢুকে জমি টুকরো হওয়া ঠেকানো।
জমির ধরন অনুযায়ী তিনটি আইন প্রযোজ্য হতে পারে:
| জমি | আইন | মূল নিয়ম |
|---|---|---|
| কৃষি জোত (রায়তি জমি) | রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০, ধারা ৯৬ | শুধু উত্তরাধিকার সূত্রে শরিক; ২ মাস; সর্বোচ্চ ৩ বছর |
| অকৃষি জমি (শহরের প্লট, বাণিজ্যিক জমি) | অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৪৯, ধারা ২৪ | যেকোনো শরিক; নোটিশ বা জানার ৪ মাস; ৫% ক্ষতিপূরণ |
| উপরের আইনে না পড়া কিছু বিক্রি | মুসলিম আইন (হকশুফা) | ৯৬(১৭) ধারায় টিকে আছে, তবে কঠোর আনুষ্ঠানিক দাবির শর্তে, ব্যবহার কম |
বসতবাড়ির জমিতে ৯৬ ধারা প্রযোজ্য নয় (ধারা ৯৬(১৬))। জমি কৃষি, অকৃষি না বসতবাড়ি, মামলায় প্রায়ই প্রথম তর্ক এটাই। তাই খতিয়ান, দলিল ও জমির বাস্তব ব্যবহার মিলিয়ে দেখুন।
অগ্রক্রয় মামলা কে করতে পারে?
কৃষি জমি (ধারা ৯৬)। ২০০৬ সালের সংশোধনে অধিকারটি সীমিত হয়েছে। এখন আবেদনকারীকে হতে হবে:
- একই জোতের উত্তরাধিকার সূত্রে শরিক, কিনে শরিক হওয়া ব্যক্তি নন; এবং
- ৯০ ধারার জমির সর্বোচ্চ সীমার মধ্যে থেকে জমিটি কিনতে পারেন এমন ব্যক্তি।
বিক্রিটিও হতে হবে জোতের শরিক নন এমন কারও কাছে। এক শরিক অন্য শরিকের কাছে বিক্রি করলে অগ্রক্রয় চলে না। পাশের জমির মালিকের ৯৬ ধারায় কোনো অধিকার নেই।
অকৃষি জমি (ধারা ২৪)। যেকোনো শরিক, কিনে শরিক হওয়া ব্যক্তিসহ, আবেদন করতে পারেন। তবে কিছু হস্তান্তর বাদ: উত্তরাধিকার সূত্রে শরিকের কাছে হস্তান্তর, বিনিময়, বণ্টন, ওয়াকফ, আর স্বামী বা স্ত্রী বা নিকট রক্তসম্পর্কের আত্মীয়কে দান (হেবাসহ)।
মুসলিম আইন (হকশুফা)। প্রচলিত মুসলিম আইনে সহ-মালিক এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রতিবেশীরও অগ্রক্রয়ের অধিকার আছে, কিন্তু তা পেতে সঙ্গে সঙ্গে এবং সাক্ষীর সামনে আনুষ্ঠানিক দাবি করতে হয়। আদালত এসব শর্ত কঠোরভাবে দেখেন, এই ভিত্তিতে মামলা কম। ভরসা করার আগে পরামর্শ নিন।
অগ্রক্রয় মামলা কত দিনের মধ্যে করতে হবে ও কত টাকা জমা দিতে হয়
৯৬ ধারার সময়সীমা। একই আইনের ৮৯ ধারায় বিক্রির নোটিশ আপনার ওপর জারির তারিখ থেকে ২ মাসের মধ্যে মামলা করুন। নোটিশ না এলে বিক্রির কথা জানার তারিখ থেকে ২ মাস। আর যেকোনো অবস্থায় বিক্রয় দলিল রেজিস্ট্রির ৩ বছর পর আবেদন চলবে না। সময় পেরোলে দাবি শেষ।
৯৬(৩) ধারার জমা। মামলা দায়েরের সময়েই আদালতে জমা দিতে হবে:
- নোটিশ বা বিক্রয় দলিলে লেখা দাম;
- সেই দামের ২৫% ক্ষতিপূরণ; এবং
- দলিল সম্পাদনের তারিখ থেকে মামলা দায়েরের তারিখ পর্যন্ত দামের ওপর বছরে ৮% সরল সুদ।
উদাহরণ: দলিলে দাম ১০,০০,০০০ টাকা, আর সম্পাদনের ১৮ মাস পর মামলা করছেন। ক্ষতিপূরণ ২,৫০,০০০ টাকা, সুদ ১,২০,০০০ টাকা, মোট জমা ১৩,৭০,০০০ টাকা। ক্রেতার দেওয়া খাজনা বা উন্নয়ন খরচের জন্য আদালত পরে আরও টাকা জমা দিতে বলতে পারেন।
মামলার সময়েই পুরো টাকা জমা দিতে হবে। সিভিল রিভিশন নং ৪৫১৭/২০২৩ (রায় ১৬ জুলাই ২০২৫)-এ হাইকোর্ট বিভাগ একটি অগ্রক্রয় আদেশ বাতিল করেছেন, কারণ শুরুতে টাকার একাংশ জমা হয়েছিল এবং বাকিটা পরে আদালতের অনুমতি ছাড়া জমা দেওয়া হয়।
অকৃষি জমি (ধারা ২৪): নোটিশ বা জানার ৪ মাসের মধ্যে, দামের সঙ্গে ৫% ক্ষতিপূরণ।
প্রিয়েমশন মামলা করার নিয়ম: আদালতে মামলা কীভাবে চলে
- জেলা দেখে নিন। যেসব জেলায় বাধ্যতামূলক মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা চালু, সেখানে অগ্রক্রয়ের বিরোধ আগে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে যায়। সময় কম বলে এ বিষয়ে সঙ্গে সঙ্গে পরামর্শ নিন।
- আবেদন দায়ের করুন সেই দেওয়ানি আদালতে, যেখানে ওই জমির দখলের মামলা চলত। ক্রেতা ও উত্তরাধিকার সূত্রে অন্য সব শরিককে পক্ষ করুন (ধারা ৯৬(২))।
- একই সময়ে পুরো টাকা জমা দিন।
- নোটিশ ও যোগদান। আদালত ক্রেতা ও শরিকদের নোটিশ দেন। অন্য শরিকেরা আইনে দেওয়া সময়ের মধ্যে মামলায় যোগ দিতে পারেন; যিনি যোগ দেন না, তাঁর অধিকার শেষ।
- তদন্ত ও আদেশ। আদালত শুনানি নেন, ক্রেতার খরচ যাচাই করেন এবং সিদ্ধান্ত দেন। একাধিক শরিক জিতলে জমি তাঁদের মধ্যে ভাগ হয়।
- বিক্রয় দলিল। ক্রেতাকে ৬০ দিনের মধ্যে বিজয়ী শরিকের নামে দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রি করে দিতে হয়, এই রেজিস্ট্রিতে কোনো কর বা ফি লাগে না। ক্রেতা না দিলে আদালত নিজেই দলিল করে দেন এবং দখলও বুঝিয়ে দিতে পারেন।
ক্রেতা জমা টাকা থেকে তাঁর পাওনা পান। যেকোনো পক্ষ সাধারণ দেওয়ানি আপিল আদালতে আপিল করতে পারেন, তারপর আইনের প্রশ্নে হাইকোর্ট বিভাগে সিভিল রিভিশন চলতে পারে।
অগ্রক্রয় মামলা থেকে বাঁচার উপায়: ক্রেতার আইনসম্মত সুরক্ষা
শরিকের আইনি অধিকার ক্রেতা মুছে দিতে পারেন না, তবে সাবধানে কেনা আর সঠিক আইনি জবাব অনেক পার্থক্য গড়ে দেয়।
কেনার আগে:
- খতিয়ান ও বংশতালিকা দেখে উত্তরাধিকার সূত্রে সব শরিক খুঁজে বের করুন। দেখুন জমি কেনার আগে করণীয়।
- সম্ভব হলে সব শরিকের কাছ থেকে একসঙ্গে কিনুন, অথবা রেজিস্টার্ড বণ্টননামা হওয়ার পর কিনুন।
- রেজিস্ট্রির সময় ৮৯ ধারার নোটিশ দাখিল ও জারি নিশ্চিত করুন, যাতে ২ মাসের সময় গণনা শুরু হয়, আর প্রমাণ রাখুন।
- দলিলে প্রকৃত দাম লিখুন। অগ্রক্রয়কারী দলিলের দামই জমা দেন, তাই দাম কম দেখালে আপনি ফেরতও কম পান।
- খাজনা ও উন্নয়ন খরচের রসিদ রাখুন; আদালত এগুলো ফেরত দেওয়ার আদেশ দিতে পারেন।
মামলা হলে আইনজীবী যা যাচাই করবেন: সময়ের মধ্যে মামলা হয়েছে কি না; আবেদনের সঙ্গে পুরো টাকা জমা হয়েছে কি না; আবেদনকারী উত্তরাধিকার সূত্রে শরিক কি না; আপনি আগে থেকেই শরিক ছিলেন কি না; জমি বসতবাড়ি বা অকৃষি কি না; হস্তান্তরটি আসলে বিক্রি কি না; প্রয়োজনীয় সব পক্ষ আছে কি না; আর আবেদনকারী অধিকার ছেড়ে দিয়েছিলেন কি না। প্রকৃত দান বা বিনিময় ৯৬ ধারায় বিক্রি নয়, কিন্তু টাকা নিয়ে করা “দান” আদালত বিক্রি হিসেবে ধরতে পারেন। কাগজের কৌশলে যাবেন না।
যোগ্যতা দেখুন
উত্তরাধিকার সূত্রে শরিক; বাইরের লোকের কাছে বিক্রি; বসতবাড়ি নয়।
দিন গুনুন
নোটিশ বা জানার ২ মাস; সর্বোচ্চ ৩ বছর।
পুরো টাকা জমা
দাম, ২৫% ক্ষতিপূরণ ও বছরে ৮% সুদ।
দায়ের ও তদারকি
সব শরিক ও ক্রেতাকে পক্ষ করুন; প্রতি তারিখে হাজির থাকুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
অগ্রক্রয় মামলা কত দিনের মধ্যে করতে হবে?
কৃষি জমিতে বিক্রির নোটিশ জারির তারিখ থেকে ২ মাস, নোটিশ না এলে বিক্রির কথা জানার তারিখ থেকে ২ মাস। দলিল রেজিস্ট্রির ৩ বছর পর আর মামলা চলে না। অকৃষি জমিতে সময় ৪ মাস।
প্রিয়েমশন মামলা কে করতে পারে?
কৃষি জমিতে শুধু একই জোতের উত্তরাধিকার সূত্রে শরিক, এবং কেবল তখনই, যখন জমি শরিক নন এমন কারও কাছে বিক্রি হয়েছে। অকৃষি জমিতে আইনে বলা ব্যতিক্রম ছাড়া যেকোনো শরিক আবেদন করতে পারেন।
প্রিয়েমশন মামলায় কত টাকা জমা দিতে হয়?
৯৬ ধারায় নোটিশ বা দলিলে লেখা দাম, তার ২৫% ক্ষতিপূরণ, আর দলিলের তারিখ থেকে মামলার তারিখ পর্যন্ত বছরে ৮% সরল সুদ। পুরো টাকা মামলা দায়েরের সময়েই জমা দিতে হয়।
দানপত্র বা হেবা দলিল কি প্রিয়েমশন করা যায়?
৯৬ ধারা শুধু বিক্রিতে প্রযোজ্য, তাই প্রকৃত হেবা বা বিনিময়ে এই ধারায় অগ্রক্রয় চলে না। তবে তথাকথিত দান যদি আসলে টাকার বিনিময়ে হয়, আদালত তাকে বিক্রি ধরতে পারেন। অকৃষি জমিতে স্বামী বা স্ত্রী ও নিকট আত্মীয়কে দান স্পষ্টভাবে বাদ।
অগ্রক্রয় মামলা কখন করা যায় না?
সময় পেরিয়ে গেলে, বসতবাড়ির জমিতে, ক্রেতা আগে থেকেই শরিক হলে, কৃষি জমিতে কিনে শরিক হওয়া ব্যক্তির পক্ষে, আর প্রকৃত দান বা বিনিময়ের মতো বিক্রি নয় এমন হস্তান্তরে অগ্রক্রয় মামলা চলে না।
পাশের জমির মালিক কি অগ্রক্রয় মামলা করতে পারেন?
৯৬ ধারায় পারেন না। বর্তমান আইনে অধিকার শুধু একই জোতের উত্তরাধিকার সূত্রে শরিকদের। মুসলিম আইনে প্রতিবেশীর অধিকার তাত্ত্বিকভাবে আছে, তবে তার জন্য কঠোর আনুষ্ঠানিক দাবি লাগে এবং এমন মামলা বিরল।
অগ্রক্রয় মামলার কোর্ট ফি কত?
আবেদনের কোর্ট ফি নিজে সামান্য। মূল খরচ হলো আইনে নির্ধারিত দাম, ক্ষতিপূরণ ও সুদের জমা, সঙ্গে আইনজীবীর ফি। আপনার আদালতের বর্তমান ফি আইনজীবীর কাছ থেকে নিশ্চিত হয়ে নিন।
প্রিয়েমশন মামলার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার নিয়ম কী?
রায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ দেওয়ানি আপিল আদালতে, সাধারণত জেলা জজ আদালতে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল করা যায়। আপিলের পর আইনের প্রশ্নে হাইকোর্ট বিভাগে সিভিল রিভিশন করা যেতে পারে।
জমি ও সম্পত্তি বিষয়ে আরও পড়ুন
নিরাপদে জমি কেনা, নামজারি ও বেদখল জমি উদ্ধার।
অগ্রক্রয় মামলা করবেন, নাকি মামলার মুখোমুখি?
আমরা দ্রুত সময়, জমার হিসাব ও আপনার অধিকার যাচাই করি, কারণ অগ্রক্রয়ে প্রতিটি দিন গুরুত্বপূর্ণ। লিখিত প্রাথমিক মূল্যায়ন বিনামূল্যে।

মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।