Skip to content

খতিয়ান কী ও কত প্রকার: সিএস, এসএ, আরএস, বিএস খতিয়ান বোঝার নিয়ম

বাংলাদেশে জমির যেকোনো কাজ শুরু হয় খতিয়ান দিয়ে। ক্রেতা, ব্যাংক, আদালত, ভূমি অফিস সবাই খতিয়ান চায়, অথচ অনেক মালিকই জানেন না তাঁর হাতে কোন খতিয়ান আর তা কী প্রমাণ করে। এই গাইডে আছে খতিয়ানের প্রকারভেদ, খতিয়ান পড়ার নিয়ম, অনলাইনে কপি তোলা আর কোন রেকর্ডের গুরুত্ব কতটা।

রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০, ধারা ১৪৩, ১৪৪, ১৪৪কবঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন ১৮৮৫ (সিএস রেকর্ড)
শেয়ার করুন
বাংলাদেশে খতিয়ানের প্রকারভেদ: সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস রেকর্ড
এক নজরে
  • খতিয়ান হলো মৌজাভিত্তিক স্বত্বের রেকর্ড: কে জমি ধারণ করেন, কত অংশ, কোন দাগ, কত জমি
  • সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস ধারাবাহিক সরকারি জরিপের রেকর্ড; পরের হস্তান্তর ওঠে নামজারি খতিয়ানে
  • ভূমি মন্ত্রণালয়ের পোর্টাল বা রেকর্ড রুম থেকে সার্টিফায়েড কপি তোলা যায়
  • খতিয়ান দখলের জোরালো প্রমাণ ও আইনত সঠিক বলে ধরা হয়, তবে এটি মালিকানার দলিল নয়

এই গাইডে: খতিয়ান কি, আর পর্চা কি একই জিনিস? · সিএস, এসএ, আরএস, বিএস খতিয়ান: কোন জরিপ কত সালে · খতিয়ান বোঝার নিয়ম: কোন কলামে কী থাকে · অনলাইনে খতিয়ান বা পর্চা বের করার নিয়ম ও সার্টিফায়েড কপি · কোন খতিয়ানের গুরুত্ব বেশি, খতিয়ান কি মালিকানা প্রমাণ করে?

সংক্ষেপে উত্তর

খতিয়ান (রেকর্ড-অব-রাইটস) হলো মৌজাভিত্তিক সরকারি রেজিস্টারের অংশ, যেখানে লেখা থাকে কে জমি ধারণ করেন, তাঁর অংশ, দাগ নম্বর, জমির শ্রেণি ও পরিমাণ। প্রতিটি বড় জরিপে নতুন খতিয়ান হয়েছে: সিএস (১৮৮৮ থেকে ১৯৪০), এসএ (১৯৫৬ থেকে ১৯৬২), আরএস (ষাটের দশক থেকে) এবং বিএস (নব্বইয়ের দশক থেকে, কিছু জায়গায় এখনো চলছে)। বিক্রি বা উত্তরাধিকারের পর এসি ল্যান্ড নামজারি খতিয়ান খোলেন। ভূমি মন্ত্রণালয়ের পোর্টালে অনলাইনে সার্টিফায়েড কপির আবেদন করা যায়। সর্বশেষ চূড়ান্ত খতিয়ান সঠিক বলে ধরা হয়, কিন্তু খতিয়ান প্রমাণ, মালিকানার দলিল নয়।

খতিয়ান কি, আর পর্চা কি একই জিনিস?

খতিয়ান হলো একটি মৌজার (রাজস্ব গ্রাম) এক বা একাধিক জোতের স্বত্বের রেকর্ড। সরকারি জরিপের সময় রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০-এর ১৪৪ ধারায়, আর পুরোনো সিএস রেকর্ডের ক্ষেত্রে বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন ১৮৮৫ অনুযায়ী এটি তৈরি হয়। মৌজার ভেতরে প্রতিটি খতিয়ানের একটি নম্বর থাকে, আর মৌজার থাকে জে.এল. নম্বর।

খতিয়ান থেকে জানা যায়:

  • মালিকদের নাম (পুরোনো রেকর্ডে তাঁদের ওপরের ভূস্বামীর নামও)
  • জোতে প্রত্যেক মালিকের অংশ
  • কোন কোন দাগ, প্রতিটির জমির শ্রেণি ও পরিমাণ
  • সে সময়ের খাজনা বা রাজস্ব

পর্চা শব্দটি ঢিলেঢালাভাবে ব্যবহৃত হয়। আসলে পর্চা হলো জরিপ চলাকালে মালিককে দেওয়া খসড়া খতিয়ানের অনুলিপি (মাঠ পর্চা), যাতে তসদিকের আগে তিনি তা মিলিয়ে দেখতে পারেন। চলতি কথায় এবং অনলাইন পোর্টালে খতিয়ানের যেকোনো কপিকেই পর্চা বলা হয়। মাঠ পর্চা চূড়ান্ত নয়; রেকর্ড হিসেবে গণ্য হয় কেবল চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত খতিয়ান বা তার সার্টিফায়েড কপি।

সিএস, এসএ, আরএস, বিএস খতিয়ান: কোন জরিপ কত সালে

রেকর্ডআনুমানিক সময়যা জানা দরকার
সিএস (ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে)১৮৮৮ থেকে ১৯৪০বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইনে প্রথম দাগভিত্তিক জরিপ। অংশ প্রায়ই আনা-গণ্ডায় লেখা। পুরোনো পৈতৃক জমির উৎস খুঁজতে জরুরি।
এসএ (স্টেট অ্যাকুইজিশন)১৯৫৬ থেকে ১৯৬২জমিদারি উচ্ছেদের পর তৈরি, মূলত সিএস রেকর্ড হালনাগাদ করে, পূর্ণ মাঠ জরিপ ছাড়াই। ভুল বেশি দেখা যায়।
আরএস (রিভিশনাল সার্ভে)ষাটের দশক থেকেপূর্ণ মাঠ জরিপ, জেলাভিত্তিক বহু বছর ধরে। অনেক এলাকায় এটিই এখনো সর্বশেষ চূড়ান্ত রেকর্ড।
বিএস (বাংলাদেশ সার্ভে) ও সিটি জরিপনব্বইয়ের দশক থেকেঅনেক জেলায় সর্বশেষ সম্পন্ন জরিপ; ঢাকায় আলাদা মহানগর জরিপ। কিছু জায়গায় এখনো চূড়ান্ত হচ্ছে।
দিয়ারা জরিপবিভিন্ন সময়েনদীভাঙন ও চর জাগার কারণে বদলে যাওয়া নদীতীর ও চরের জমির জন্য।
নামজারি খতিয়ানচলমানবিক্রি, হেবা বা উত্তরাধিকারের পর এসি ল্যান্ড খোলেন। এটি জরিপের রেকর্ড নয়।

জেলাভেদে সাল আলাদা, তাই আপনার মৌজায় কোন জরিপ চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত হয়েছে তা উপজেলা ভূমি অফিস বা ডিসি অফিসের রেকর্ড রুমে জেনে নিন। কিছু এলাকায় এখন নতুন ডিজিটাল জরিপ (বিডিএস) চলছে।

বাংলাদেশে সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস খতিয়ান পড়ার নিয়ম

খতিয়ান বোঝার নিয়ম: কোন কলামে কী থাকে

আধুনিক আরএস ও বিএস খতিয়ানের গঠন প্রায় একই রকম। ওপর থেকে নিচে পড়ুন:

অংশকী দেখায়
শিরোনামজেলা, উপজেলা বা থানা, মৌজার নাম, জে.এল. নম্বর, খতিয়ান নম্বর
মালিকের কলামপ্রত্যেক মালিকের নাম, পিতা বা স্বামীর নাম ও ঠিকানা
অংশজোতে প্রত্যেক মালিকের হিস্যা, দশমিকে (.৫০০ মানে অর্ধেক) বা পুরোনো রেকর্ডে আনা-গণ্ডায়
দাগ নম্বরমৌজা নকশায় এই খতিয়ানের প্লট নম্বর
জমির শ্রেণিযেমন নাল, ভিটি, পুকুর, বাড়ি
দাগে মোট জমি ও দাগের মধ্যে অত্র খতিয়ানের অংশপ্লটের মোট পরিমাণ, আর তার কতটুকু এই খতিয়ানের
মন্তব্যদখল, দায় বা পরের সংশোধনের নোট

একজন মালিকের জমি বের করতে প্রতিটি দাগে খতিয়ানের জমিকে ওই মালিকের অংশ দিয়ে গুণ করুন। দাগ নম্বর সবসময় মৌজা নকশা ও দলিলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন। না মিললে কেনাবেচার আগে পরামর্শ নিন। ভুল এন্ট্রি সংশোধন করা যায়, তবে কোথায় যাবেন তা নির্ভর করে রেকর্ড কোন পর্যায়ে আছে তার ওপর।

অনলাইনে খতিয়ান বা পর্চা বের করার নিয়ম ও সার্টিফায়েড কপি

ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনলাইন ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থার ঠিকানা dlrms.land.gov.bd (পুরোনো ই-পর্চা ঠিকানা eporcha.gov.bd-ও এখনো বহুল ব্যবহৃত)। ধাপগুলো হলো:

  1. বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও মৌজা বেছে নিন।
  2. রেকর্ডের ধরন বাছুন: সিএস, এসএ, আরএস, বিএস বা নামজারি খতিয়ান।
  3. খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর বা মালিকের নাম দিয়ে খুঁজুন।
  4. তথ্যের কপি দেখুন, অথবা সার্টিফায়েড কপির আবেদন করে অনলাইনে দেখানো ফি দিন।
  5. অনুমোদনের পর কপি ডাউনলোড করুন, অথবা ডাকযোগে নিন।

সব পুরোনো রেকর্ড এখনো অনলাইনে ওঠেনি। খতিয়ান না পেলে সিএস, এসএ ও আরএস রেকর্ডের জন্য ডিসি অফিসের রেকর্ড রুমে, আর নামজারি রেকর্ডের জন্য উপজেলা ভূমি অফিসে আবেদন করুন। সাহায্যের জন্য ভূমি সেবা হেল্পলাইন ১৬১২২-এ ফোন করুন।

মামলা, রেজিস্ট্রি বা ব্যাংকের কাজে স্ক্রিনশট বা তথ্যের কপি নয়, সার্টিফায়েড কপি ব্যবহার করুন। জমি কেনার আগে দেখুন আমাদের জমি কেনার আগে করণীয় গাইড।

কোন খতিয়ানের গুরুত্ব বেশি, খতিয়ান কি মালিকানা প্রমাণ করে?

দুটি নিয়ম মনে রাখুন।

প্রথমত, সর্বশেষ চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত জরিপ রেকর্ড সঠিক বলে ধরা হয়। ১৪৪ক ধারা অনুযায়ী প্রতিটি এন্ট্রি তাতে লেখা বিষয়ের প্রমাণ এবং ভুল প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সঠিক বলে গণ্য। ভূমি অফিস কাজ করে সর্বশেষ চূড়ান্ত রেকর্ড (প্রায়ই আরএস বা বিএস) এবং তার পরের নামজারি খতিয়ান ধরে। পুরোনো সিএস ও এসএ রেকর্ড তবু জরুরি, কারণ এগুলো দেখায় জমি কীভাবে পরিবারে বা বিক্রেতা থেকে বিক্রেতায় এসেছে।

দ্বিতীয়ত, খতিয়ান মালিকানা তৈরি করে না। মালিকানা আসে রেজিস্টার্ড দলিল, উত্তরাধিকার, আদালতের ডিক্রি বা সরকারি বন্দোবস্ত থেকে। খতিয়ান হলো কে জমি ধারণ করছিলেন তার সরকারি রেকর্ড এবং দখলের জোরালো প্রমাণ, কিন্তু আদালত বহুদিন ধরে বলে আসছেন রেকর্ড-অব-রাইটস স্বত্বের দলিল নয়। বৈধ দলিল ও দখল থাকলে ভুল রেকর্ডের বিরুদ্ধে জেতা যায়, আবার নিজের নামে রেকর্ড থাকলেও জাল দলিলের ধারা টেকে না।

তাই দলিল ও খতিয়ান দুটোই যত্নে রাখুন। কেনা বা উত্তরাধিকারের পর নামজারি করে রেকর্ডকে দলিলের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।

এটি সাধারণ তথ্য, আপনার মামলার পরামর্শ নয়। এখানে আইন ও প্রচলিত প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আপনার কাগজপত্র, ঘটনা ও সংশ্লিষ্ট জেলার চর্চাই ঠিক করবে আপনার ক্ষেত্রে কী প্রযোজ্য।
খতিয়ান তোলা ও যাচাইয়ের ধাপ
১

মৌজা চিহ্নিত করুন

জেলা, উপজেলা, মৌজার নাম ও জে.এল. নম্বর।

২

পোর্টালে খুঁজুন

খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর বা মালিকের নামে।

৩

সার্টিফায়েড কপি নিন

অনলাইনে ফি দিন; মামলা, ব্যাংক বা রেজিস্ট্রিতে কাজে লাগে।

৪

দলিল ও নকশার সঙ্গে মেলান

দাগ, অংশ ও পরিমাণ মিলতে হবে।

দলিলের সঙ্গে না মেলা খতিয়ান সতর্কসংকেত। টাকা দেওয়ার আগেই যাচাই করুন।পরামর্শের সময় নিন

সাধারণ জিজ্ঞাসা

খতিয়ান কি?

খতিয়ান হলো একটি মৌজার জমির স্বত্বের রেকর্ড। এতে মালিকদের নাম, তাঁদের অংশ, দাগ নম্বর, জমির শ্রেণি ও পরিমাণ থাকে। সরকারি জরিপে এটি তৈরি হয় এবং হস্তান্তরের পর নামজারির মাধ্যমে হালনাগাদ হয়।

খতিয়ান কত প্রকার ও কি কি?

জরিপের প্রধান খতিয়ান হলো সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস; কিছু এলাকায় সিটি ও দিয়ারা জরিপও আছে। এর বাইরে বিক্রি, হেবা বা উত্তরাধিকারের পর এসি ল্যান্ডের খোলা নামজারি খতিয়ান আছে।

পর্চা কি?

আসলে পর্চা হলো জরিপ চলাকালে মালিককে মিলিয়ে দেখার জন্য দেওয়া খসড়া খতিয়ানের কপি। চলতি কথায় ও অনলাইন পোর্টালে খতিয়ানের যেকোনো কপিকেই পর্চা বলা হয়।

এস এ খতিয়ান কত সালে হয়?

এসএ (স্টেট অ্যাকুইজিশন) রেকর্ড মূলত ১৯৫৬ থেকে ১৯৬২ সালের মধ্যে তৈরি হয়, রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ জমিদারি প্রথা বিলোপের পর। জেলাভেদে সাল কিছুটা আলাদা।

আর এস খতিয়ান কত সালে হয়?

রিভিশনাল সার্ভে শুরু হয় ষাটের দশকে এবং কয়েক দশক ধরে জেলাভিত্তিক চলে। আপনার মৌজার চূড়ান্ত প্রকাশনার তারিখ ভূমি অফিস বা ডিসি অফিসের রেকর্ড রুমে জেনে নিন।

সিএস খতিয়ান কত সালে হয়?

ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে মোটামুটি ১৮৮৮ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন ১৮৮৫ অনুযায়ী হয়। সিলেটের মতো কিছু এলাকায় জরিপ হয়েছে পরে।

অনলাইনে খতিয়ান দেখার নিয়ম কী?

ভূমি মন্ত্রণালয়ের পোর্টাল dlrms.land.gov.bd-তে যান। জেলা, উপজেলা, মৌজা ও রেকর্ডের ধরন বেছে খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর বা মালিকের নাম দিয়ে খুঁজুন। সার্টিফায়েড কপির জন্য অনলাইনে আবেদন ও ফি পরিশোধ করুন।

খতিয়ান কি জমির মালিকানা প্রমাণ করে?

না। খতিয়ান সঠিক বলে ধরা হয় এবং দখলের জোরালো প্রমাণ, কিন্তু মালিকানা আসে দলিল, উত্তরাধিকার বা আদালতের ডিক্রি থেকে। দলিল যত্নে রাখুন এবং নামজারি করে রেকর্ড মিলিয়ে নিন।

শেয়ার করুন

মন্তব্য

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।

মন্তব্য লিখুন

সব মন্তব্য প্রকাশের আগে চেম্বার থেকে যাচাই করা হয়। মামলার গোপন তথ্য, ফোন নম্বর বা লিংক দেবেন না। এখানে দেওয়া উত্তর সাধারণ তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়; নির্দিষ্ট বিষয়ে পরামর্শের জন্য চেম্বারে যোগাযোগ করুন।

আপনার খতিয়ানে কী লেখা আছে বুঝতে পারছেন না?

আমরা আপনার খতিয়ান ও নকশা পড়ে দলিলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখি, কেনাবেচার আগে কী ঠিক করতে হবে তা জানাই। লিখিত প্রাথমিক মূল্যায়ন বিনামূল্যে।