Skip to content

সাফ কবলা দলিল কী, কত প্রকার দলিল ও দলিল পড়ার নিয়ম

দলিল হলো জমির অধিকার হস্তান্তর বা লিপিবদ্ধ করার লিখিত কাগজ। দলিল অনেক রকমের, প্রতিটির কাজ আলাদা। এখানে প্রচলিত দলিলগুলোর মানে, কোনগুলো রেজিস্ট্রি করতেই হয়, আর টাকা দেওয়ার আগে সমস্যা ধরতে কীভাবে লাইন ধরে দলিল পড়বেন তা দেওয়া হলো।

রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮, ধারা ১৭, ১৭ক, ৪৯সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন ২০১২
শেয়ার করুন
বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকার জমির দলিল পাশাপাশি রাখা
এক নজরে
  • সাফ কবলা হলো সাধারণ বিক্রয় দলিল, যা মূল্যের বিনিময়ে পূর্ণ মালিকানা দেয়
  • দান, বিক্রি, বণ্টন, দীর্ঘমেয়াদি লিজ ও বায়না রেজিস্ট্রি বাধ্যতামূলক
  • বায়নানামা সইয়ের ৬০ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রি করতে হয়
  • দলিলের সবচেয়ে জরুরি অংশ তফসিল: মৌজা, খতিয়ান, দাগ, পরিমাণ ও চৌহদ্দি

এই গাইডে: সাফ কবলা দলিল কি? · দলিল কত প্রকার ও কি কি? · কোন দলিল রেজিস্ট্রি করতেই হয়? · দলিল পড়ার নিয়ম: অংশগুলো ক্রমানুসারে · তফসিল পড়ার নিয়ম: মৌজা, খতিয়ান ও দাগ · পৃষ্ঠাঙ্কন, দলিল নম্বর ও দলিলের নকল তোলা

সংক্ষেপে উত্তর

সাফ কবলা দলিল হলো সাধারণ বিক্রয় দলিল: বিক্রেতা মূল্যের বিনিময়ে জমির পূর্ণ মালিকানা ক্রেতাকে হস্তান্তর করেন, আর দলিলটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রি করতে হয়। অন্যান্য প্রচলিত দলিল হলো হেবা (দান), হেবা-বিল-এওয়াজ, বণ্টননামা, এওয়াজ বা বিনিময়, বায়নানামা, আমমোক্তারনামা, বন্ধক, লিজ, উইল, না-দাবি ও বাতিল দলিল। যেকোনো দলিল পড়া শুরু করুন তফসিল থেকে: মৌজা, জেএল নম্বর, খতিয়ান, দাগ, পরিমাণ ও চৌহদ্দি; তারপর পক্ষ, মালিকানার ইতিহাস ও সাব-রেজিস্ট্রারের পৃষ্ঠাঙ্কন মিলিয়ে দেখুন।

সাফ কবলা দলিল কি?

সাফ মানে পরিষ্কার বা নিঃশর্ত, আর কবলা মানে বিক্রয়ের দলিল। সাফ কবলা দলিলে বিক্রেতা পুরো মূল্য বুঝে নিয়ে জমিতে তাঁর সম্পূর্ণ অধিকার ক্রেতাকে হস্তান্তর করেন। রেজিস্ট্রির পর ক্রেতা মালিক হন, এবং এরপর নিজের নামে নামজারির আবেদন করা উচিত।

বিক্রয় দলিল নির্ধারিত ফরমে লিখতে হয়। এতে বিক্রেতা ও ক্রেতার নাম, মূল্য ও তা বুঝে পাওয়ার কথা, বিক্রেতা কীভাবে জমির মালিক হয়েছেন তার বিবরণ, আর তফসিলে জমির বর্ণনা থাকে। রেজিস্ট্রির সময় বিক্রেতাকে খতিয়ান দেখাতে হয়।

সাফ কবলা আর বায়নানামা এক নয়। বায়নানামা শুধু ভবিষ্যতে বিক্রির চুক্তি, এতে ক্রেতা মালিক হন না। চুক্তি কীভাবে কাজ করে দেখুন চুক্তিপত্র লেখার নিয়ম।

দলিল কত প্রকার ও কি কি?

দলিলকী কাজ করেরেজিস্ট্রি
সাফ কবলা (বিক্রয়)মূল্যের বিনিময়ে মালিকানা হস্তান্তরবাধ্যতামূলক
হেবা (দান) ও হেবার ঘোষণাপত্রবিনিময় ছাড়া দান, প্রায়ই পরিবারের মধ্যেবাধ্যতামূলক
হেবা-বিল-এওয়াজকিছুর বিনিময়ে দান; বিক্রির মতো গণ্যবাধ্যতামূলক
বণ্টননামাযৌথ জমি শরিকদের মধ্যে ভাগবাধ্যতামূলক
এওয়াজ বা বিনিময়এক জমির বদলে আরেক জমিবাধ্যতামূলক
বায়নানামানির্দিষ্ট শর্তে বিক্রির প্রতিশ্রুতিবাধ্যতামূলক, ৬০ দিনের মধ্যে
আমমোক্তারনামা (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি)অন্যকে কাজের ক্ষমতা দেওয়া, যেমন বিক্রিবিক্রি, হস্তান্তর বা উন্নয়নের জন্য বাধ্যতামূলক
বন্ধক (রেহেন), খাইখালাসিসহঋণের জামানত হিসেবে জমিবেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক
ইজারা বা লিজনির্দিষ্ট সময় ও ভাড়ায় ব্যবহারের অধিকারএক বছরের বেশি হলে বাধ্যতামূলক
উইল বা অছিয়তনামামৃত্যুর পর কার্যকরঐচ্ছিক
না-দাবি দলিলশরিক তাঁর দাবি ছেড়ে দেনবাধ্যতামূলক
বাতিল বা রদ দলিলচুক্তি বা আমমোক্তারনামা শেষ করারেকর্ডে কার্যকর করতে রেজিস্ট্রি

দানের জন্য দেখুন হেবা দলিলের নিয়ম। আমমোক্তারনামার জন্য দেখুন পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি।

বাংলাদেশে জমির দলিলের তফসিল পড়া

কোন দলিল রেজিস্ট্রি করতেই হয়?

রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮-এর ১৭ ধারা অনুযায়ী জমি দান, মূল্য যা-ই হোক, জমিতে কোনো অধিকার সৃষ্টি, হস্তান্তর বা বিলোপ করে এমন দলিল, এবং বছরওয়ারি বা এক বছরের বেশি মেয়াদের লিজ রেজিস্ট্রি বাধ্যতামূলক। ১৭ক ধারায় যোগ হয়েছে বায়নানামা, যা সইয়ের ৬০ দিনের মধ্যে (২০২৬ সালের আগে ছিল ৩০ দিন) রেজিস্ট্রি করতে হয়। জমি বিক্রি বা উন্নয়নের আমমোক্তারনামা পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন ২০১২ অনুযায়ী রেজিস্ট্রি করতে হয়।

রেজিস্ট্রি ঐচ্ছিক এমন প্রধান দলিল হলো উইল, যা যেকোনো সময় দাখিল করা যায়। অন্য দলিল সইয়ের তিন মাসের মধ্যে দাখিল করা উচিত।

বাধ্যতামূলক দলিল রেজিস্ট্রি না হলে কী হয়? ৪৯ ধারা অনুযায়ী তা জমিতে কোনো অধিকার দেয় না। স্ট্যাম্পে বিক্রির কাগজ করে পুরো টাকা দিলেও রেজিস্ট্রি ছাড়া ক্রেতা মালিক হন না।

দলিল বাতিল: বায়নানামা বা আমমোক্তারনামা রেজিস্টার্ড বাতিল বা প্রত্যাহার দলিলে শেষ করা যায়। কিন্তু মালিকানা চলে যাওয়ার পর রেজিস্টার্ড সাফ কবলা দলিল পক্ষরা নিজেরা বাতিল করতে পারেন না। এর জন্য নতুন দলিলে ফেরত হস্তান্তর বা আদালতের ডিক্রি লাগে।

দলিল পড়ার নিয়ম: অংশগুলো ক্রমানুসারে

  1. শিরোনাম ও দলিলের ধরন: যেমন সাফ কবলা, মূল্য ও স্ট্যাম্পের বিবরণসহ।
  2. পক্ষগণ: দাতা ও গ্রহীতার নাম, পিতা বা স্বামীর নাম, ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ও ছবি।
  3. মালিকানার বিবরণ: বিক্রেতা কীভাবে জমি পেয়েছেন, ওয়ারিশ, ক্রয় বা দানসূত্রে, আগের দলিল নম্বরসহ। নির্ধারিত ফরমে মালিকানার ইতিহাস চাওয়া হয়।
  4. মূল্য: কত টাকা এবং তা বুঝে পাওয়ার কথা।
  5. মূল হস্তান্তরের ভাষা: কী হস্তান্তর হলো ও কোন শর্তে।
  6. তফসিল: জমির বর্ণনা। পরের অংশ দেখুন।
  7. সই ও টিপসই: পক্ষগণের, ঠিকানাসহ সাক্ষীদের, আর দলিল লেখকের নাম ও সনদ নম্বর।
  8. সাব-রেজিস্ট্রারের পৃষ্ঠাঙ্কন: দলিলের পেছনে বা শেষ পৃষ্ঠাগুলোতে।

মালিকানার বিবরণ আগের দলিলগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে পড়ুন। ধারাবাহিকতা ভাঙলে দলিলের ওপর ভরসা করার আগে কারণ জানুন।

তফসিল পড়ার নিয়ম: মৌজা, খতিয়ান ও দাগ

তফসিলই বলে দেয় জমিটা কোনটা। প্রতিটি তথ্য খতিয়ান ও মৌজা নকশার সঙ্গে মেলান।

  • জেলা, উপজেলা বা থানা ও মৌজা, মৌজার জেএল নম্বরসহ।
  • খতিয়ান নম্বর প্রতিটি জরিপের: সিএস, এসএ, আরএস এবং হয়ে থাকলে বিএস বা সিটি জরিপ। নামজারি খতিয়ানও।
  • দাগ নম্বর প্রতিটি জরিপের, আর প্রতিটি দাগের মোট পরিমাণ।
  • হস্তান্তরিত জমির পরিমাণ, সাধারণত শতাংশ বা একরে। খতিয়ানে বিক্রেতার অংশের বেশি হতে পারে না।
  • চৌহদ্দি চার দিকের। মাঠের জমির সঙ্গে মিলতে হবে।
  • জমির শ্রেণি, যেমন ভিটি, নাল বা পুকুর।

ভুল দাগ বা খতিয়ান নম্বর খুব সাধারণ সমস্যা, আর এতে নামজারি আটকে যেতে পারে। সম্ভব হলে রেজিস্ট্রির আগেই ঠিক করুন, না হলে দুই পক্ষের সইয়ে রেজিস্টার্ড সংশোধনী দলিল করুন। পূর্ণ তল্লাশির জন্য দেখুন জমি কেনার আগে করণীয়।

পৃষ্ঠাঙ্কন, দলিল নম্বর ও দলিলের নকল তোলা

রেজিস্ট্রির পর সাব-রেজিস্ট্রার দলিলে পৃষ্ঠাঙ্কন করেন: কখন দাখিল হলো, দাতা সই স্বীকার করেছেন, কে শনাক্ত করেছেন, কত ফি দেওয়া হলো, আর রেজিস্ট্রির সার্টিফিকেট। সার্টিফিকেটে থাকে বালাম বা বই নম্বর (জমির জন্য ১ নম্বর বই), ভলিউম, পৃষ্ঠা এবং সালসহ দলিল নম্বর। পরে দলিল খুঁজতে এগুলো লাগে।

হারানো দলিলের কপি পেতে বা দলিল আসল কি না যাচাই করতে, যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রি হয়েছিল সেখানে, আর পুরোনো দলিলের ক্ষেত্রে জেলা রেকর্ড রুমে, দলিল নম্বর ও সাল দিয়ে সার্টিফায়েড কপি (নকল) চেয়ে আবেদন করুন। আপনাকে দেখানো দলিলের সঙ্গে নকল মিলিয়ে দেখুন। নম্বরে অমিল, ঘষামাজা বা খতিয়ানে বিক্রেতার নাম না থাকা সতর্কসংকেত।

এটি সাধারণ তথ্য, আপনার মামলার পরামর্শ নয়। এখানে আইন ও প্রচলিত প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আপনার কাগজপত্র, ঘটনা ও সংশ্লিষ্ট জেলার চর্চাই ঠিক করবে আপনার ক্ষেত্রে কী প্রযোজ্য।
দলিলের ওপর ভরসা করার আগে যাচাই
১

দলিলের ধরন চিনুন

বিক্রি, দান, বণ্টন না চুক্তি।

২

তফসিল পড়ুন

মৌজা, খতিয়ান, দাগ, পরিমাণ ও চৌহদ্দি।

৩

মালিকানা খুঁজুন

আগের দলিল ও বিক্রেতার নামে খতিয়ান।

৪

নকল তুলুন

সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল নম্বর ও সাল মিলিয়ে নিন।

বেশিরভাগ জমির বিরোধ শুরু হয় খতিয়ানের সঙ্গে না মেলা তফসিল থেকে। টাকা দেওয়ার আগে মিলিয়ে নিন।পরামর্শের সময় নিন

সাধারণ জিজ্ঞাসা

দলিল কত প্রকার ও কি কি?

আইনে নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই, তবে প্রচলিত জমির দলিল হলো সাফ কবলা, হেবা, হেবা-বিল-এওয়াজ, বণ্টননামা, এওয়াজ বা বিনিময়, বায়নানামা, আমমোক্তারনামা, বন্ধক, লিজ, উইল, না-দাবি ও বাতিল দলিল।

সাফ কবলা দলিল কি?

এটি সাধারণ বিক্রয় দলিল। বিক্রেতা পুরো মূল্য বুঝে নিয়ে জমির পূর্ণ মালিকানা ক্রেতাকে হস্তান্তর করেন। দলিলটি রেজিস্ট্রি করতে হয়, এরপর ক্রেতার নামজারির আবেদন করা উচিত।

দলিল পড়ার নিয়ম কী?

তফসিল দিয়ে শুরু করুন: মৌজা, জেএল নম্বর, খতিয়ান, দাগ, পরিমাণ ও চৌহদ্দি। এরপর পক্ষগণ, বিক্রেতা কীভাবে জমি পেয়েছেন তার বিবরণ, মূল্য, সই এবং সাব-রেজিস্ট্রারের পৃষ্ঠাঙ্কন দেখুন।

সাফ কবলা দলিল কি বাতিল করা যায়?

মালিকানা চলে যাওয়ার পর পক্ষরা নিজেরা বাতিল করতে পারেন না। প্রতারণা বা জালিয়াতিতে করা দলিল দেওয়ানি আদালতে দলিল বাতিলের মামলায় বাতিল হতে পারে। নইলে নতুন দলিলে জমি ফেরত দিতে হয়।

রেহেন দলিল কি?

রেহেন বা বন্ধক দলিলে ঋণের জামানত হিসেবে জমি দেওয়া হয়। কৃষিজমির খাইখালাসি বন্ধকে ঋণদাতা আইনে সীমিত মেয়াদ পর্যন্ত জমি ভোগ করেন, এরপর জমি মালিকের কাছে ফিরে যায়।

এওয়াজ দলিল কি?

এওয়াজ দলিল হলো বিনিময়: দুই মালিক নিজেদের জমি অদলবদল করেন। এটি রেজিস্ট্রি করতে হয়, আর ফি হিসাব হয় বেশি মূল্যের সম্পত্তির ওপর।

জমির দলিল বের করার নিয়ম কী?

যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছিল সেখানে, আর পুরোনো দলিলের ক্ষেত্রে জেলা রেকর্ড রুমে, দলিল নম্বর ও সাল দিয়ে সার্টিফায়েড কপি বা নকলের আবেদন করুন।

দলিল যার জমি তার, কথাটা কি ঠিক?

পুরোপুরি নয়। রেজিস্টার্ড দলিল শক্ত প্রমাণ, তবে মালিকানা নির্ভর করে বিক্রেতার বৈধ স্বত্ব, খতিয়ান ও দখলের ওপরও। তাই মালিকানার ধারাবাহিকতা ও খতিয়ানও যাচাই করুন।

জমি ও সম্পত্তি বিষয়ে আরও পড়ুন

নিরাপদে জমি কেনা, নামজারি ও বেদখল জমি উদ্ধার।

এই বিষয়ের সব লেখা →
শেয়ার করুন

মন্তব্য

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।

মন্তব্য লিখুন

সব মন্তব্য প্রকাশের আগে চেম্বার থেকে যাচাই করা হয়। মামলার গোপন তথ্য, ফোন নম্বর বা লিংক দেবেন না। এখানে দেওয়া উত্তর সাধারণ তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়; নির্দিষ্ট বিষয়ে পরামর্শের জন্য চেম্বারে যোগাযোগ করুন।

দলিলে কী লেখা আছে বুঝতে পারছেন না?

আমরা দলিল পড়ি, মালিকানার ধারাবাহিকতা যাচাই করি এবং রেজিস্ট্রির আগে দলিল লিখি বা সংশোধন করি। লিখিত প্রাথমিক মূল্যায়ন বিনামূল্যে।