Skip to content

নারী নির্যাতন মামলা: করার নিয়ম, প্রধান ধারা, শাস্তি ও খরচ

নারী নির্যাতন মামলা পারিবারিক আইনের সবচেয়ে গুরুতর মামলাগুলোর একটি, নির্যাতনের শিকার নারীর জন্যও, মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্তের জন্যও। আইন কঠোর, জামিন কঠিন, আর প্রথম দিন থেকেই প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ। এখানে আছে মামলা কীভাবে হয়, কোন ধারা প্রযোজ্য, শাস্তি কী, কত টাকা লাগে, আর মিথ্যা মামলায় কী হয়।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (২০২৬ সালে সংশোধিত)যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০
শেয়ার করুন
অভিযোগপত্রের সামনে সুরক্ষার ঢাল ও দাঁড়িপাল্লা — বাংলাদেশে নারী নির্যাতন মামলা করার নিয়ম
এক নজরে
  • থানায় এজাহার, পুলিশ না নিলে ট্রাইব্যুনালে নালিশি মামলা
  • জরুরি ৯৯৯; নারী ও শিশু হেল্পলাইন ১০৯
  • বেশিরভাগ অপরাধ অজামিনযোগ্য
  • মিথ্যা মামলা করাও অনধিক ৭ বছরের কারাদণ্ডযোগ্য অপরাধ

এই গাইডে: নারী নির্যাতন মামলার ধারা ও শাস্তি · নারী নির্যাতন মামলা করার নিয়ম · নারী নির্যাতন মামলা করতে কত টাকা লাগে · যৌতুক মামলা: জামিন, আপস ও প্রত্যাহার · মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত হলে · তদন্ত ও বিচারের সময়সীমা

সংক্ষেপে উত্তর

নারী নির্যাতন মামলা হয় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ অনুযায়ী, যার আওতায় ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, অপহরণ, অ্যাসিড নিক্ষেপ ও যৌতুকের জন্য নির্যাতন। থানায় এজাহার দেওয়া যায়, আর পুলিশ ব্যবস্থা না নিলে সরাসরি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে নালিশি মামলা করা যায়। বিচার করে ট্রাইব্যুনাল। শাস্তি কঠোর, জামিন সীমিত, আর মিথ্যা মামলা নিজেই অপরাধ। মামলা করতে খরচ সামান্য; মূল খরচ আইনজীবীর, আর বিনা খরচে আইনি সহায়তাও পাওয়া যায়।

নারী নির্যাতন মামলার ধারা ও শাস্তি

অপরাধধারাশাস্তি (সংক্ষেপে)
ধর্ষণ; ধর্ষণের পর মৃত্যুধারা ৯মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, এবং অর্থদণ্ড
যৌন নিপীড়নধারা ১০৩ থেকে ১০ বছর কারাদণ্ড, এবং অর্থদণ্ড
নারী বা শিশু অপহরণধারা ৭যাবজ্জীবন বা দীর্ঘ কারাদণ্ড, এবং অর্থদণ্ড
যৌতুকের জন্য মৃত্যু ঘটানোধারা ১১(ক)মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
যৌতুকের জন্য গুরুতর জখমধারা ১১(খ)যাবজ্জীবন বা অনধিক ১২ বছর কারাদণ্ড
যৌতুকের জন্য সাধারণ জখমধারা ১১(গ)১ থেকে ৩ বছর কারাদণ্ড, এবং অর্থদণ্ড
মিথ্যা মামলা করাধারা ১৭অনধিক ৭ বছর কারাদণ্ড, এবং অর্থদণ্ড

নির্যাতন ছাড়া শুধু যৌতুক দাবির শাস্তি যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮ অনুযায়ী: ১ থেকে ৫ বছর কারাদণ্ড এবং অনধিক ৫০,০০০ টাকা অর্থদণ্ড। ২০২৬ সালের সংশোধনী (২০২৬ সালের ৮৫ নম্বর আইন) ধর্ষণের সংজ্ঞা সংশোধন করেছে, বিয়ের প্রলোভনে যৌন সম্পর্ককে ৯খ ধারায় আলাদা অপরাধ করেছে (সর্বোচ্চ ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড), শিশু ধর্ষণ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে এবং ধর্ষণ মামলায় তদন্ত ১৫ দিন ও বিচার ৯০ দিনের সময়সীমা দিয়েছে। ৯খ ধারা নিয়ে হাইকোর্টে রুল বিচারাধীন, তবে ধারাটি এখনো বহাল। প্রতিটি মামলায় বর্তমান আইনের পাঠ মিলিয়ে নিন।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ও যৌতুক নিরোধ আইনের প্রধান ধারা ও শাস্তি

নারী নির্যাতন মামলা করার নিয়ম

  1. আগে নিরাপত্তা। বিপদে ৯৯৯-এ ফোন করুন। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে জাতীয় হেল্পলাইন ১০৯।
  2. চিকিৎসার প্রমাণ। যত দ্রুত সম্ভব সরকারি হাসপাতাল বা ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে যান। যৌন নির্যাতনের পর সম্ভব হলে গোসল বা কাপড় বদলাবেন না।
  3. থানায় এজাহার। তারিখ, স্থান, অভিযুক্ত ও সাক্ষীর নামসহ লিখিত বিবরণ দিন। মামলার নম্বরসহ এজাহারের কপি চেয়ে নিন।
  4. পুলিশ মামলা না নিলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে নালিশি মামলা করুন। ট্রাইব্যুনাল তদন্তের আদেশ দিয়ে মামলা গ্রহণ করতে পারে।
  5. তদন্ত ও অভিযোগপত্র। আইনের সময়সীমার মধ্যে পুলিশ তদন্ত করে অভিযোগপত্র বা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে আপত্তি থাকলে ট্রাইব্যুনালে নারাজি দেওয়া যায়।

নারী নির্যাতন মামলা করতে কত টাকা লাগে

থানায় এজাহার দিতে কোনো খরচ নেই, আর নালিশি মামলায় সামান্য কোর্ট ফি লাগে। প্রকৃত খরচ আইনজীবীর ফি, চিকিৎসা ও যাতায়াত এবং শুনানিতে সময়, যা মামলাভেদে ভিন্ন। আইনজীবী রাখার সামর্থ্য না থাকলে জেলা লিগ্যাল এইড অফিস বা জাতীয় আইনগত সহায়তা হেল্পলাইনের মাধ্যমে বিনা খরচে আইনজীবী পাওয়া যায়। শুরুতেই আইনজীবীর কাছে লিখিত খরচের হিসাব চেয়ে নিন।

যৌতুক মামলা: জামিন, আপস ও প্রত্যাহার

  • জামিন: নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ও যৌতুক নিরোধ আইনের অপরাধ সাধারণত অজামিনযোগ্য। ঘটনা ও মেডিকেল প্রমাণ দেখে ট্রাইব্যুনাল বা আপিলে হাইকোর্ট বিভাগ জামিন দেন।
  • আপস: যৌতুকের কিছু অপরাধ আদালতের অনুমতি নিয়ে আপস করা যায়। শুধু ঘরোয়া মীমাংসায় মামলা শেষ হয় না।
  • প্রত্যাহার: বাদী চাইলেই গুরুতর মামলা প্রত্যাহার করতে পারেন না। আদালত সিদ্ধান্ত নেন, আর মামলা মিথ্যা ছিল বলে হলফ করলে বাদী নিজেই ধারা ১৭-এর ঝুঁকিতে পড়েন।
  • পারিবারিক আদালতে দেনমোহর ও ভরণপোষণের দাবি আলাদাভাবে, একই সময়ে চলতে পারে।

মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত হলে

  • সমন বা ওয়ারেন্ট উপেক্ষা করবেন না। আইনজীবীসহ হাজির হয়ে পটভূমি দেখায় এমন কাগজসহ জামিন চান, যেমন চলমান তালাক বা দেনমোহরের বিরোধ।
  • শুরুতেই প্রমাণ জোগাড় করুন: মেসেজ, কল রেকর্ড, সাক্ষী, ভ্রমণের রেকর্ড।
  • নথিতে মামলার কোনো ভিত্তি না থাকলে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১ক ধারায় হাইকোর্ট বিভাগ মামলা বাতিল করতে পারেন।
  • খালাসের পর মিথ্যা বাদীর বিরুদ্ধে ধারা ১৭ বা যৌতুক আইনে অভিযোগ করা যায়।

দেখুন আমাদের গাইড মিথ্যা মামলা হলে করণীয়।

তদন্ত ও বিচারের সময়সীমা

আইনে পুলিশি তদন্তের সময়সীমা আছে এবং ট্রাইব্যুনালকে ১৮০ দিনে বিচার শেষ করতে বলা হয়েছে; ২০২৬ সালের সংশোধনী ধর্ষণ মামলায় তদন্ত ১৫ দিন ও বিচার ৯০ দিনের সময়সীমা দিয়েছে। হাইকোর্ট বিভাগ বলেছে ১৮০ দিনের বিধান নির্দেশনামূলক: সময় পেরোলেই মামলা শেষ হয় না। দেরি সাধারণ ঘটনা, তাই আইনজীবীর নিয়মিত তদারকি জরুরি।

এটি সাধারণ তথ্য, আপনার মামলার পরামর্শ নয়। এখানে আইন ও প্রচলিত প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আপনার কাগজপত্র, ঘটনা ও সংশ্লিষ্ট জেলার চর্চাই ঠিক করবে আপনার ক্ষেত্রে কী প্রযোজ্য।
নারী নির্যাতন মামলার ধাপ
১

নিরাপত্তা ও চিকিৎসা

৯৯৯ বা ১০৯; হাসপাতাল বা ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার।

২

এজাহার বা নালিশ

থানা, পুলিশ না নিলে ট্রাইব্যুনাল।

৩

প্রমাণ

মেডিকেল রিপোর্ট, মেসেজ, সাক্ষী।

৪

মামলার তদারকি

অভিযোগপত্র, জামিন শুনানি, বিচার।

প্রথম বিবরণ ও মেডিকেল রিপোর্টই পুরো মামলার গতি ঠিক করে। কিছুতে সই করার আগে পরামর্শ নিন।পরামর্শের সময় নিন

সাধারণ জিজ্ঞাসা

নারী নির্যাতন মামলা কিভাবে করতে হয়?

থানায় এজাহার দিন, অথবা পুলিশ না নিলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে নালিশি মামলা করুন। চিকিৎসা নিন ও সব প্রমাণ সংরক্ষণ করুন।

নারী নির্যাতন মামলা করতে কত টাকা লাগে?

এজাহারে কোনো খরচ নেই, নালিশি মামলায় সামান্য কোর্ট ফি। মূল খরচ আইনজীবীর; জেলা লিগ্যাল এইড অফিস থেকে বিনা খরচে আইনি সহায়তা পাওয়া যায়।

নারী নির্যাতন মামলার ধারাগুলো কী কী?

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ধারা ৯ (ধর্ষণ), ১০ (যৌন নিপীড়ন), ৭ (অপহরণ), ১১ (যৌতুকের জন্য নির্যাতন) ও ১৭ (মিথ্যা মামলা)।

নারী নির্যাতন মামলার শাস্তি কি?

ধারাভেদে: ধর্ষণ ও যৌতুকের জন্য মৃত্যুতে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন, যৌন নিপীড়নে ৩ থেকে ১০ বছর, যৌতুকের জন্য সাধারণ জখমে ১ থেকে ৩ বছর।

যৌতুক মামলার শাস্তি কি?

যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮ অনুযায়ী ১ থেকে ৫ বছর কারাদণ্ড এবং অনধিক ৫০,০০০ টাকা অর্থদণ্ড।

যৌতুক মামলার জামিন কি হয়?

অপরাধগুলো সাধারণত অজামিনযোগ্য, তবে ঘটনা ও প্রমাণ দেখে ট্রাইব্যুনাল বা হাইকোর্ট বিভাগ জামিন দিতে পারেন।

যৌতুক মামলা প্রত্যাহার করার নিয়ম কী?

চাইলেই প্রত্যাহার করা যায় না। যৌতুকের কিছু অপরাধ আদালতের অনুমতি নিয়ে আপস করা যায়; গুরুতর অপরাধে যায় না।

মিথ্যা নারী নির্যাতন মামলা করলে কি হয়?

ধারা ১৭ অনুযায়ী মিথ্যা মামলা করা অপরাধ, শাস্তি অনধিক ৭ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড।

পরিবার ও বিয়ে বিষয়ে আরও পড়ুন

তালাক, বিয়ে, সন্তানের হেফাজত, দেনমোহর ও ভরণপোষণ।

এই বিষয়ের সব লেখা →
শেয়ার করুন

মন্তব্য

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।

মন্তব্য লিখুন

সব মন্তব্য প্রকাশের আগে চেম্বার থেকে যাচাই করা হয়। মামলার গোপন তথ্য, ফোন নম্বর বা লিংক দেবেন না। এখানে দেওয়া উত্তর সাধারণ তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়; নির্দিষ্ট বিষয়ে পরামর্শের জন্য চেম্বারে যোগাযোগ করুন।

নির্যাতনের শিকার, নাকি আপনার বিরুদ্ধে মামলা?

আমরা নির্যাতনের শিকার নারীর পক্ষে নারী নির্যাতন ও যৌতুক মামলা করি ও তদারকি করি, আর মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্তের পক্ষে জামিন থেকে বিচার পর্যন্ত লড়ি। লিখিত প্রাথমিক মূল্যায়ন বিনামূল্যে।