পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন ২০১০: কিভাবে সুরক্ষা আদেশ পাবেন
নির্যাতনের শিকার প্রত্যেক নারী স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির লোকদের জেলে পাঠাতে চান না। অনেকে চান নির্যাতন বন্ধ হোক, বাড়িতেই থাকতে পারেন, আর সন্তান কাছে থাকুক। পারিবারিক সহিংসতা আইন ২০১০ ঠিক এই জন্য: ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে একটি আবেদন, যা থেকে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সুরক্ষা, বসবাস, ক্ষতিপূরণ ও হেফাজতের আদেশ পাওয়া যায়।
- পরিবারের সদস্যের হাতে নারী বা শিশুর শারীরিক, মানসিক, যৌন ও আর্থিক নির্যাতন এর আওতায়
- ভুক্তভোগী বা তাঁর পক্ষে যে কেউ জুডিশিয়াল বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করতে পারেন
- প্রতিপক্ষ কারণ দর্শাতে ৭ কর্মদিবস পান; নোটিশের ৬০ কর্মদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তি
- সুরক্ষা আদেশ ভঙ্গ অপরাধ: ৬ মাস পর্যন্ত, বারবার হলে ২ বছর পর্যন্ত
এই গাইডে: পারিবারিক সহিংসতা বলতে কি বুঝায় · কে আবেদন করবেন, কোথায় · আদালত যেসব আদেশ দিতে পারেন · সময়সীমা, আদেশ ভঙ্গ ও আপিল · পারিবারিক সহিংসতা আইন, না নারী নির্যাতন মামলা?
সংক্ষেপে উত্তর
পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০ অনুযায়ী পরিবারের কোনো সদস্যের হাতে নির্যাতিত নারী বা শিশু জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (শহরে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট) এর কাছে অন্তর্বর্তী সুরক্ষা আদেশ, সুরক্ষা আদেশ, বসবাস আদেশ, ক্ষতিপূরণ ও সন্তানের অস্থায়ী হেফাজতের আবেদন করতে পারেন। প্রতিপক্ষ কারণ দর্শাতে ৭ কর্মদিবস পান, আর নোটিশ জারির ৬০ কর্মদিবসের মধ্যে আদালতকে নিষ্পত্তি করতে হয়। ভুক্তভোগী যেখানে থাকেন বা সাময়িকভাবে আছেন, প্রতিপক্ষ যেখানে থাকেন, বা যেখানে সহিংসতা হয়েছে, সেখানে আবেদন করা যায়। আদেশ ভঙ্গ করা ফৌজদারি অপরাধ।
পারিবারিক সহিংসতা বলতে কি বুঝায়
ধারা ৩ অনুযায়ী পরিবারের অন্য সদস্যের দ্বারা নারী বা শিশুর ওপর শারীরিক, মানসিক, যৌন বা আর্থিক নির্যাতনই পারিবারিক সহিংসতা। রক্ত, বিয়ে, দত্তক বা যৌথ পরিবারের সূত্রে সম্পর্কিতরা “পরিবার”-এর মধ্যে পড়েন।
- শারীরিক: মারধর, ধাক্কা, শরীরের ক্ষতি করে এমন যেকোনো কাজ।
- মানসিক: গালিগালাজ, অপমান, হুমকি, চলাফেরা বা অন্যের সঙ্গে যোগাযোগে বাধা।
- যৌন: অপমানজনক বা মর্যাদাহানিকর যেকোনো যৌন আচরণ।
- আর্থিক: খাবার বা ওষুধের টাকা না দেওয়া, তাঁর আয় কেড়ে নেওয়া, যৌতুক দাবি, বা সম্পত্তি ও দেনমোহর থেকে বঞ্চিত করা।
কে আবেদন করবেন, কোথায়
আবেদন করতে পারেন ভুক্তভোগী নিজে, পুলিশ কর্মকর্তা, প্রয়োগকারী কর্মকর্তা (সাধারণত উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা), সেবা প্রদানকারী, বা তাঁর পক্ষে যেকোনো ব্যক্তি (ধারা ১১)। আবেদন যায় সেই জুডিশিয়াল বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে, যেখানে:
- ভুক্তভোগী থাকেন বা সাময়িকভাবে অবস্থান করছেন;
- প্রতিপক্ষ থাকেন; অথবা
- সহিংসতা ঘটেছে (ধারা ১২)।
আদালত যেসব আদেশ দিতে পারেন
| আদেশ | কী করে |
|---|---|
| অন্তর্বর্তী সুরক্ষা আদেশ (ধারা ১৩) | প্রতিপক্ষের কথা শোনার আগেই তাৎক্ষণিক আদেশ, ৭ কর্মদিবসের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশসহ |
| সুরক্ষা আদেশ (ধারা ১৪) | সহিংসতা, যোগাযোগ, আর কর্মস্থল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ বন্ধ করে |
| বসবাস আদেশ (ধারা ১৫) | তাঁকে যৌথ বাসায় রাখে, প্রতিপক্ষকে সরায়, বা অন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করে |
| ক্ষতিপূরণ আদেশ (ধারা ১৬) | আঘাত, চিকিৎসা, আয়ের ক্ষতি, মানসিক আঘাত ও সম্পদের ক্ষতির জন্য টাকা |
| হেফাজত আদেশ (ধারা ১৭) | সন্তানের অস্থায়ী হেফাজত ভুক্তভোগীকে |
সময়সীমা, আদেশ ভঙ্গ ও আপিল
- কারণ দর্শানো: নোটিশের জবাব দিতে প্রতিপক্ষ ৭ কর্মদিবস পান (ধারা ১৩)।
- নিষ্পত্তি: নোটিশের ৬০ কর্মদিবসের মধ্যে (ধারা ২০)।
- সুরক্ষা আদেশ ভঙ্গ (ধারা ৩০): ৬ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড, ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা, বা উভয়; বারবার ভঙ্গে ২ বছর পর্যন্ত, ১ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা, বা উভয়।
- মিথ্যা আবেদন (ধারা ৩২): ১ বছর পর্যন্ত, ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা, বা উভয়।
- আপিল (ধারা ২৮): চিফ জুডিশিয়াল বা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে।
পারিবারিক সহিংসতা আইন, না নারী নির্যাতন মামলা?
দুটো একসঙ্গে চলতে পারে। পারিবারিক সহিংসতা আইনের লক্ষ্য সুরক্ষা দেওয়া ও পরিবার টিকিয়ে রাখা; এটি নিজে কাউকে জেলে পাঠায় না। গুরুতর আঘাত, যৌতুকের জন্য নির্যাতন বা যৌন সহিংসতা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ বা দণ্ডবিধির অধীনে ফৌজদারি অপরাধ, যার বিচার হয় ট্রাইব্যুনালে। অনেক নারী আগে সুরক্ষা আদেশ নেন, আর ফৌজদারি মামলার পথ খোলা রাখেন। জরুরি অবস্থায় ৯৯৯ বা ১০৯ হেল্পলাইনে ফোন করুন।
প্রমাণ রাখুন
মেডিকেল কাগজ, ছবি, মেসেজ, সাক্ষী।
আবেদন করুন
ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে, সরাসরি বা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার মাধ্যমে।
অন্তর্বর্তী আদেশ চান
বিপদ জরুরি হলে সেদিনই।
শুনানিতে যান
প্রতিপক্ষের জবাবের ৭ কর্মদিবস পার হলে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
পারিবারিক সহিংসতা আইন ২০১০ কী?
এমন একটি আইন যার মাধ্যমে পরিবারের সদস্যের হাতে নির্যাতিত নারী বা শিশু ম্যাজিস্ট্রেটের কাছ থেকে সুরক্ষা, বসবাস, ক্ষতিপূরণ ও হেফাজতের আদেশ পেতে পারেন।
পারিবারিক সহিংসতা বলতে কি বুঝায়?
পরিবারের অন্য সদস্যের দ্বারা নারী বা শিশুর ওপর শারীরিক, মানসিক, যৌন বা আর্থিক নির্যাতন।
পারিবারিক সহিংসতার মামলা কোথায় করব?
জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা শহরে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে, যেখানে আপনি থাকেন, প্রতিপক্ষ থাকেন, বা সহিংসতা ঘটেছে।
অন্য কেউ কি আমার হয়ে আবেদন করতে পারেন?
হ্যাঁ। পুলিশ, প্রয়োগকারী কর্মকর্তা, সেবা প্রদানকারী বা যেকোনো ব্যক্তি ভুক্তভোগীর পক্ষে আবেদন করতে পারেন।
আদালত কত দ্রুত ব্যবস্থা নেন?
প্রতিপক্ষ কারণ দর্শাতে ৭ কর্মদিবস পান, আর নোটিশের ৬০ কর্মদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হয়। অন্তর্বর্তী আদেশ তাৎক্ষণিক দেওয়া যায়।
স্বামী সুরক্ষা আদেশ ভঙ্গ করলে কী শাস্তি?
৬ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ১০,০০০ টাকা জরিমানা, বারবার ভঙ্গে ২ বছর পর্যন্ত বা ১ লাখ টাকা পর্যন্ত।
আমি কি স্বামীর বাড়িতে থাকতে পারব?
হ্যাঁ। বসবাস আদেশে আপনাকে যৌথ বাসায় রাখা এবং প্রতিপক্ষকে সরে যেতে বা অন্য বাসস্থান দিতে বলা যায়।
এটা কি নারী নির্যাতন মামলার মতো?
না। এই আইন সুরক্ষা ও ক্ষতিপূরণ দেয়; নারী নির্যাতন মামলা ফৌজদারি বিচার। দুটো একসঙ্গে চালানো যায়।
পরিবার ও বিয়ে বিষয়ে আরও পড়ুন
তালাক, বিয়ে, সন্তানের হেফাজত, দেনমোহর ও ভরণপোষণ।
নারী নির্যাতন মামলা: করার নিয়ম, ধারা, শাস্তি ও খরচ (২০২৬)
দেনমোহর কি ও কত টাকা: দেনমোহর ও খোরপোষ আদায়ের নিয়ম
পারিবারিক সহিংসতা থেকে সুরক্ষা
মেয়েরা কিভাবে ডিভোর্স দেয়: খুলা ও তালাক-ই-তাফউইজের নিয়ম
দ্বিতীয় বিয়ের আইন: স্ত্রীর অনুমতি, সালিশি পরিষদ ও শাস্তি
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১: ধারা ৪, ৬, ৭ সহজ ভাষায়
কাবিননামা: প্রতিটি ঘরের মানে, কপি তোলা ও ভুল সংশোধন
ডিভোর্স পেপার ও তালাকনামা: কোথায় পাবেন, কী থাকে
কোর্ট ম্যারেজ করতে কি কি লাগে: নিয়ম, বয়স ও খরচ (২০২৬)
ডিভোর্সের পর সন্তানের হেফাজত ও অভিভাবকত্ব আইন: মা-বাবার অধিকার
তালাক দেওয়ার নিয়ম ও ডিভোর্সের খরচ: নোটিশ, ৯০ দিন, খুলা (২০২৬)
হিন্দু বিবাহ রেজিস্ট্রেশন: নিয়ম, ফি, ফরম ও কাগজপত্র
বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭: বিয়ের বয়স ও শাস্তি
পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩: মামলা, কোর্ট ফি ও আপিল
ঘরে সহিংসতার শিকার?
আমরা দ্রুত সুরক্ষা ও বসবাস আদেশের আবেদন করি এবং ফৌজদারি মামলাও দরকার কি না পরামর্শ দিই। ফোনালাপ গোপন থাকে। লিখিত প্রাথমিক মূল্যায়ন বিনামূল্যে।

মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।