দ্বিতীয় বিয়ে: সালিশি পরিষদের অনুমতি, শাস্তি ও স্ত্রীদের অধিকার
বাংলাদেশে একজন মুসলিম পুরুষ চাইলেই দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারেন না। এর জন্য সালিশি পরিষদের লিখিত অনুমতি লাগে, আর অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে তাঁর পরিণতি এবং দুই স্ত্রীরই অধিকার আছে। ২০২৫ সালে হাইকোর্ট বিভাগ এই বিধান বহাল রেখেছে। এখানে আছে অনুমতি কীভাবে মেলে, তা উপেক্ষা করলে কী হয়, আর প্রত্যেক স্ত্রী কী করতে পারেন।
- অনুমতি দেয় সালিশি পরিষদ, শুধু স্ত্রী নন
- কারণ ও ফিসহ চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন
- অনুমতি ছাড়া বিয়ে: বর্তমান স্ত্রীর পুরো দেনমোহর তৎক্ষণাৎ, সঙ্গে ফৌজদারি শাস্তি
- প্রথম স্ত্রী তালাক ও ভরণপোষণ চাইতে পারেন
এই গাইডে: অনুমতি কীভাবে মেলে · দ্বিতীয় বিয়ে করতে কি প্রথম স্ত্রীর অনুমতি লাগে · অনুমতি ছাড়া বিয়ের পরিণতি ও শাস্তি · প্রথম স্ত্রীর অধিকার · গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে
সংক্ষেপে উত্তর
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ধারা ৬ অনুযায়ী বিবাহিত মুসলিম পুরুষ আরেকটি বিয়ে করতে চাইলে চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করবেন, যিনি দুই পক্ষের একজন করে প্রতিনিধি নিয়ে সালিশি পরিষদ গঠন করেন। বর্তমান স্ত্রীর মত বিবেচনা করে নতুন বিয়ে প্রয়োজনীয় ও ন্যায্য মনে হলেই পরিষদ অনুমতি দেয়। অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে বর্তমান সব স্ত্রীর দেনমোহর তৎক্ষণাৎ পরিশোধ করতে হয় এবং অনধিক এক বছর কারাদণ্ড, অনধিক ১০,০০০ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে। ২০২৫ সালে হাইকোর্ট বিভাগ এই প্রক্রিয়াকে সাংবিধানিক বলেছে।
অনুমতি কীভাবে মেলে
- আবেদন যে এলাকায় বর্তমান স্ত্রী থাকেন, সেখানকার চেয়ারম্যান (ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন) বরাবর, নির্ধারিত ফিসহ।
- কারণ এবং বর্তমান স্ত্রী সম্মত কি না।
- সালিশি পরিষদ: চেয়ারম্যান এবং স্বামী ও বর্তমান স্ত্রীর একজন করে প্রতিনিধি।
- পরিষদ যেসব কারণ বিবেচনা করে, যেমন বর্তমান স্ত্রীর বন্ধ্যত্ব, শারীরিক অক্ষমতা, দাম্পত্য সম্পর্কে অক্ষমতা, দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধারের ডিক্রি অমান্য, বা মানসিক অসুস্থতা।
- সিদ্ধান্ত লিখিত। যেকোনো পক্ষ নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের কাছে রিভিশন চাইতে পারেন।
দ্বিতীয় বিয়ে করতে কি প্রথম স্ত্রীর অনুমতি লাগে
আলাদা ভেটো হিসেবে নয়। আইন সিদ্ধান্তের দায়িত্ব দিয়েছে সালিশি পরিষদকে, আর বর্তমান স্ত্রীর মত সেই সিদ্ধান্তের অংশ। আগস্ট ২০২৫-এ (রায় প্রকাশ ডিসেম্বর ২০২৫) হাইকোর্ট বিভাগ ধারা ৬ চ্যালেঞ্জ করা রিট খারিজ করে বলেছে, প্রথম স্ত্রীর সরাসরি সম্মতির বদলে পরিষদের অনুমতির বিধান বৈষম্যমূলক বা স্বেচ্ছাচারী নয়, এবং পরিষদ কোনো পক্ষের ওপর একতরফা সিদ্ধান্ত চাপাতে পারে না। আপিলের ঘোষণা এসেছে, তাই পরবর্তী অগ্রগতি খেয়াল রাখুন।
অনুমতি ছাড়া বিয়ের পরিণতি ও শাস্তি
- দেনমোহর: বর্তমান প্রত্যেক স্ত্রীর তাৎক্ষণিক ও বিলম্বিত পুরো দেনমোহর তৎক্ষণাৎ পরিশোধযোগ্য হয়।
- ফৌজদারি শাস্তি: অভিযোগের ভিত্তিতে অনধিক এক বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অনধিক ১০,০০০ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়।
- নিবন্ধন: সালিশি পরিষদের অনুমতি ছাড়া নিকাহ রেজিস্ট্রার বিয়ে নিবন্ধন করতে পারেন না। করলে কাজীর লাইসেন্স ঝুঁকিতে পড়ে।
- তালাকের কারণ: বর্তমান স্ত্রী মুসলিম বিবাহবিচ্ছেদ আইন ১৯৩৯-এর ধারা ২(২ক) অনুযায়ী পারিবারিক আদালতে বিবাহবিচ্ছেদ চাইতে পারেন।
অনুমতি ছাড়া বিয়ে করা বেআইনি হলেও আদালত সাধারণত মুসলিম আইনে সেই বিয়েকে বৈধ ধরেছেন। নতুন স্ত্রী ও তাঁর সন্তানের দেনমোহর, ভরণপোষণ ও উত্তরাধিকারের অধিকার থাকে।
প্রথম স্ত্রীর অধিকার
- পুরো দেনমোহর তৎক্ষণাৎ দাবি।
- সংসারে থাকুন বা না থাকুন, নিজের ও সন্তানের ভরণপোষণ দাবি।
- ফৌজদারি শাস্তির জন্য অভিযোগ।
- পারিবারিক আদালতে বিবাহবিচ্ছেদ, অথবা কাবিননামার ১৮ নম্বর ঘরে ক্ষমতা থাকলে তা ব্যবহার।
গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে
গোপনে করা দ্বিতীয় বিয়েও ধারা ৬-এর আওতায়। দ্বিতীয় স্ত্রী দেনমোহর বা ভরণপোষণ চাইলে, সন্তানের জন্মনিবন্ধনে বাবার নাম এলে, বা উত্তরাধিকারের প্রশ্ন উঠলে সাধারণত গোপনীয়তা ভাঙে। গোপন বিয়ে প্রথম স্ত্রীর অধিকার কমায় না, বরং প্রায়ই তাঁর মামলা শক্ত করে। বিবাহিত নারী তালাক কার্যকর ও ইদ্দত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আবার বিয়ে করতে পারেন না; করলে তা দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারায় দ্বিবিবাহ।
আবেদন
কারণ ও ফিসহ চেয়ারম্যান বরাবর।
সালিশি পরিষদ
চেয়ারম্যান ও দুই পক্ষের একজন করে প্রতিনিধি।
সিদ্ধান্ত
লিখিত অনুমতি বা প্রত্যাখ্যান।
নিবন্ধন
শুধু অনুমতি থাকলে; কাজী তা দেখে নেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
দ্বিতীয় বিয়ে করতে কি প্রথম স্ত্রীর অনুমতি লাগে?
ধারা ৬ অনুযায়ী সালিশি পরিষদের লিখিত অনুমতি লাগে। প্রথম স্ত্রীর মত সেই সিদ্ধান্তে গুরুত্ব পায়, তবে সিদ্ধান্ত নেয় পরিষদ।
অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ের শাস্তি কী?
বর্তমান সব দেনমোহর তৎক্ষণাৎ পরিশোধযোগ্য হয়, আর অভিযোগের ভিত্তিতে অনধিক এক বছর কারাদণ্ড, অনধিক ১০,০০০ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে ২০২৫ সালে হাইকোর্ট কী বলেছে?
ধারা ৬ বহাল রেখে বলেছে, প্রথম স্ত্রীর সরাসরি সম্মতির বদলে সালিশি পরিষদের অনুমতির বিধান বৈষম্যমূলক বা স্বেচ্ছাচারী নয়।
স্বামী অনুমতি ছাড়া আবার বিয়ে করলে প্রথম স্ত্রী কী করতে পারেন?
পুরো দেনমোহর ও ভরণপোষণ দাবি, অভিযোগ দায়ের এবং ১৯৩৯ সালের আইনে পারিবারিক আদালতে বিবাহবিচ্ছেদ চাওয়া।
অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে কি বৈধ?
আদালত সাধারণত মুসলিম আইনে একে বৈধ ধরেছেন, তবে আইনসম্মতভাবে নিবন্ধন করা যায় না এবং স্বামী শাস্তির মুখে পড়েন।
দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তান কি সম্পত্তি পায়?
হ্যাঁ। বৈধ বিয়ের সন্তান বাবার অন্য একই লিঙ্গের সন্তানের সমান অংশ পায়।
সালিশি পরিষদ কি?
চেয়ারম্যান এবং স্বামী ও স্ত্রীর একজন করে প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত পরিষদ, যা দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতির সিদ্ধান্ত নেয় এবং তালাকে আপসের চেষ্টা করে।
গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে করলে কি হয়?
একই আইন প্রযোজ্য: অনুমতি না থাকলে দেনমোহর তৎক্ষণাৎ পরিশোধযোগ্য, শাস্তির ঝুঁকি, আর প্রথম স্ত্রীর তালাক ও ভরণপোষণের অধিকার।
পরিবার ও বিয়ে বিষয়ে আরও পড়ুন
তালাক, বিয়ে, সন্তানের হেফাজত, দেনমোহর ও ভরণপোষণ।
মেয়েরা কিভাবে ডিভোর্স দেয়: খুলা ও তালাক-ই-তাফউইজের নিয়ম
কাবিননামা: প্রতিটি ঘরের মানে, কপি তোলা ও ভুল সংশোধন
দেনমোহর কি ও কত টাকা: দেনমোহর ও খোরপোষ আদায়ের নিয়ম
নারী নির্যাতন মামলা: করার নিয়ম, ধারা, শাস্তি ও খরচ (২০২৬)
পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন ২০১০: সুরক্ষা আদেশ
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১: ধারা ৪, ৬, ৭ সহজ ভাষায়
ডিভোর্স পেপার ও তালাকনামা: কোথায় পাবেন, কী থাকে
কোর্ট ম্যারেজ করতে কি কি লাগে: নিয়ম, বয়স ও খরচ (২০২৬)
ডিভোর্সের পর সন্তানের হেফাজত ও অভিভাবকত্ব আইন: মা-বাবার অধিকার
তালাক দেওয়ার নিয়ম ও ডিভোর্সের খরচ: নোটিশ, ৯০ দিন, খুলা (২০২৬)
হিন্দু বিবাহ রেজিস্ট্রেশন: নিয়ম, ফি, ফরম ও কাগজপত্র
বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭: বিয়ের বয়স ও শাস্তি
পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩: মামলা, কোর্ট ফি ও আপিল
দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে সমস্যা?
অনুমতি চাওয়া স্বামীর পক্ষে এবং দেনমোহর, ভরণপোষণ ও তালাকের অধিকার আদায়ে স্ত্রীর পক্ষে আমরা কাজ করি। লিখিত প্রাথমিক মূল্যায়ন বিনামূল্যে।

মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম প্রশ্ন বা মতামত আপনিই লিখুন।